ত্যাগীদের বিস্মৃত করে কোনো দল দীর্ঘদিন শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারে না

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পুরোনো প্রবণতা যেন ধীরে ধীরে অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে—দল যখন বিরোধী দলে থাকে, তখন ত্যাগী নেতাকর্মীদের প্রয়োজন হয়; আর দল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন সেই ত্যাগীদের একটি বড় অংশই হয়ে পড়েন অপ্রয়োজনীয়। রাজনীতির মাঠে বছরের পর বছর যারা মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতা সহ্য করে দলকে টিকিয়ে রাখেন, ক্ষমতার পালাবদলের পর অনেক সময় তাদের জায়গা দখল করে নেন অপেক্ষাকৃত সুবিধাভোগী, ক্ষমতাকেন্দ্রিক এবং রাজনৈতিকভাবে নতুন মুখেরা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ প্রবণতার বহু উদাহরণ আছে।

বর্তমান বাস্তবতাতেও সেই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। বিএনপি দীর্ঘ ১৭ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিল। এই সময়ে দলটির অসংখ্য নেতাকর্মী মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, হামলা ও নানা ধরনের রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী জানান, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ মামলা করা হয়েছিল। সরকারের কাছে দলভিত্তিক হয়রানির পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও এই সংখ্যাটি গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় চিত্র তুলে ধরে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের বহু নেতাকর্মীর সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিএনপি নেতাকর্মীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বিএনপির বহু নেতাকর্মী জীবন ঝুঁকি নিয়ে অংশ নেন এবং ওই আন্দোলনে নিহতদের মধ্যে দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ছিল।

অতএব, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাদের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটিকে নিছক ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা পদ-পদবি না পাওয়ার হতাশা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ, নেতৃত্বের ধরন এবং ক্ষমতার সঙ্গে দলের সম্পর্কের প্রশ্ন।

বিএনপি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সরকার গঠন করেছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। দলটির বর্তমান কাঠামোয় তারেক রহমান চেয়ারম্যান এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন; নির্বাচন কমিশনের তথ্যেও এই নেতৃত্ব কাঠামো উল্লেখ আছে।

সরকার গঠন করার পর স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততা বাড়বে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, কূটনীতিক—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনাও ক্ষমতাকেন্দ্রে বাড়বে। সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। তাই মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে ত্যাগী নেতাকর্মী নেই—এ কথা বলা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি যারা দীর্ঘদিন রাজপথে ছিলেন তাদের অবদানকে অস্বীকার করাও অন্যায়।

প্রশ্নটি বরং অন্য জায়গায়।

যারা ১৭ বছর দলের জন্য রাস্তায় ছিলেন, যারা শত শত মামলার আসামি হয়েছেন, জেল খেটেছেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটিয়েছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—ক্ষমতার সময় তাদের সঙ্গে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ কতটা দৃশ্যমান? তাদের কথা শোনার জন্য কি নিয়মিত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে? জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত কি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাচ্ছে?

এগুলো শুধু পদ-পদবির প্রশ্ন নয়। এগুলো রাজনৈতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন।

একজন কর্মী যখন বিপদের সময়ে দলের পতাকা হাতে রাস্তায় থাকেন, তখন তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী নন; তিনি দলের সাংগঠনিক অস্তিত্বের অংশ। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর যদি সেই কর্মী দেখেন, গতকাল পর্যন্ত যারা দলের আশপাশে ছিলেন না তারাই আজ ক্ষমতার অলিন্দে সবচেয়ে দৃশ্যমান, তাহলে তার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—দলের জন্য তার দীর্ঘদিনের ত্যাগের মূল্য কোথায় ?

এখানেই ‘হাইব্রিড’ রাজনীতির প্রসঙ্গটি আসে।

ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক দলের চারপাশে নতুন মানুষের ভিড় তৈরি হয়। তাদের সবাইকে হাইব্রিড বলা ঠিক নয়। রাজনীতিতে নতুন মানুষ আসবেন, নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে, পেশাজীবী ও যোগ্য ব্যক্তিরা দলের সঙ্গে যুক্ত হবেন—এটাই স্বাভাবিক। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীদের বাদ দিয়ে কেবল ক্ষমতার সুবিধা নেওয়ার জন্য নতুন করে তৈরি হওয়া একটি গোষ্ঠী দল ও সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

একটি দলকে তখন বাইরে থেকে মনে হয়, ক্ষমতা যেন দলের কাছে আসেনি; বরং কিছু মানুষ দলের কাছে এসে ক্ষমতার মালিক হয়ে গেছে।

এই জায়গাটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

কারণ রাজনৈতিক দলের শক্তি মন্ত্রী, এমপি কিংবা সরকারি পদে নয়; দলের প্রকৃত শক্তি মাঠের কর্মী, সাংগঠনিক কাঠামো এবং মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যায় নির্বাচনের মাধ্যমে, কিন্তু রাজনৈতিক দলের স্থায়ী শক্তি তৈরি হয় দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সম্পর্ক দিয়ে।

বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—সরকার এবং দলকে কীভাবে আলাদা অথচ সমন্বিত রাখা যায়।

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, আর রাজনৈতিক দল জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে। সরকার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেবে, দল রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। কিন্তু যখন সরকার ও দল একাকার হয়ে যায়, তখন দল ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক রাজনৈতিক চরিত্র হারাতে শুরু করে। দলের পরিবর্তে সরকারি ক্ষমতাই হয়ে ওঠে প্রধান আকর্ষণ।

এর ভয়াবহ উদাহরণ আমরা সাম্প্রতিক অতীতেই দেখেছি।

আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্র, সরকার এবং দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ কমে গিয়েছিল। শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অনেক ক্ষেত্রেই ‘দলের সিদ্ধান্ত’ এবং ‘শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত’ প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে আলোচনা ছিল। দলের বিভিন্ন কমিটি ও সাংগঠনিক কাঠামো থাকলেও কার্যকর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্র ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সঙ্গে দলটির সাংগঠনিক বিপর্যয়ও প্রকাশ্যে আসে।

এই অভিজ্ঞতা বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা হতে পারে।

কোনো রাজনৈতিক দল একজন নেতার জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা কিংবা নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করতে পারে। কিন্তু দল যদি পুরোপুরি একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্তনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে সেই দলের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। নেতা শক্তিশালী থাকলে দল শক্তিশালী মনে হয়, কিন্তু সংকটের মুহূর্তে বোঝা যায়—দলের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী।

গণতান্ত্রিক দলের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, বিষয়ভিত্তিক কমিটি, জেলা ও মহানগর কমিটি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন—এসব কেবল কাগজে-কলমে থাকা কাঠামো হলে কোনো লাভ নেই। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের মতামত, আলোচনা ও বিতর্কের বাস্তব মূল্য থাকতে হবে।

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক নিয়মিত হচ্ছে এবং দলীয় সূত্রে প্রকাশিত সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোতে দেখা যায়, দলীয় নেতৃত্ব সরকার পরিচালনার বিভিন্ন অগ্রাধিকার নিয়েও আলোচনা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কতটা নিচের সারির কর্মীদের সঙ্গে যুক্ত? সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা অংশগ্রহণমূলক? তৃণমূলের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কতটা কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছায়?

একটি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক কয়েকজন নেতা, মন্ত্রী, এমপি ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর কাছ থেকে তথ্য নেয়, তাহলে মাঠের বাস্তবতা তাদের কাছে ধরা পড়বে না।

ক্ষমতার আশপাশে থাকা মানুষ সাধারণত ক্ষমতার ভালো দিকগুলোই দেখায়। তারা সমস্যার গভীরে যেতে চায় না। কারণ ক্ষমতার কাছে থাকার একটি স্বার্থ থাকে। কিন্তু মাঠের কর্মী জানেন কোথায় সংগঠন দুর্বল, কোথায় মানুষের ক্ষোভ, কোথায় দলের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব, কোথায় নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে এবং কোথায় পুরোনো কর্মীরা অভিমান করে ঘরে বসে আছেন।

আজ বিএনপির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই মাঠের কণ্ঠস্বর।

আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো অভ্যন্তরীণ কোন্দল। ২০২৬ সালের জুনে একটি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার বড় অংশকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; সেখানে স্থানীয় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রভাব, কমিটি গঠন এবং ব্যবসায়িক স্বার্থকে সংঘাতের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এই তথ্যকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ অনেক সময় আন্দোলনের বৃহত্তর স্বার্থে চাপা পড়ে থাকে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে পদ, প্রভাব, মনোনয়ন, ব্যবসা, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং স্থানীয় কর্তৃত্বকে কেন্দ্র করে সেই বিরোধ প্রকাশ্য হতে পারে। তখন ত্যাগী বনাম সুবিধাভোগী, পুরোনো বনাম নতুন, মাঠের কর্মী বনাম ক্ষমতার কাছের মানুষ—এ ধরনের বিভাজন তৈরি হয়।

একটি দলকে তখন বাইরে থেকে যত শক্তিশালী দেখায়, ভেতরে ভেতরে ততটাই দুর্বল হতে পারে।

ক্ষমতা মানুষের রাজনৈতিক চরিত্রও পরীক্ষা করে। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় একজন নেতা যতটা গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও জনগণের অধিকারের কথা বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর তার নিজের আচরণে সেই মূল্যবোধ কতটা থাকে—সেটিই আসল পরীক্ষা।

বিএনপির জন্য সেই পরীক্ষা এখন শুরু হয়েছে।

দলের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের সবাইকে মন্ত্রী-এমপি করা সম্ভব নয়। সবাইকে সরকারি পদ দেওয়াও সম্ভব নয়। এমনকি সবাইকে বড় সাংগঠনিক পদ দেওয়ার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু তাদের সম্মান দেওয়া সম্ভব। তাদের কথা শোনা সম্ভব। তাদের পরিবারকে মূল্যায়ন করা সম্ভব। রাজনৈতিক ইতিহাসে তাদের অবদান নথিভুক্ত করা সম্ভব। নিয়মিত তৃণমূল বৈঠক করা সম্ভব। দীর্ঘদিনের মামলা ও নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের বিষয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন করা সম্ভব।

সবচেয়ে বড় কথা, দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার জায়গা তৈরি করা সম্ভব।

একজন ত্যাগী কর্মী সবসময় পদ চান না; তিনি চান তার ত্যাগটি যেন ভুলে যাওয়া না হয়।

তিনি চান, ক্ষমতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে দল যেন মনে রাখে—এই ক্ষমতা একদিনে আসেনি। এর পেছনে আছে অসংখ্য মানুষের শ্রম, ঘাম, কারাবাস, চোখের জল এবং কখনো কখনো জীবন।

তাই এখন যদি ক্ষমতার ভেতরে ‘রাজ-উৎসব’ চলে আর বাইরে রাজপথের কর্মীরা বিস্মিত চোখে সেই উৎসব দেখেন, তাহলে সেটি দলের জন্য সুখবর নয়। ক্ষমতার আনন্দ ক্ষণস্থায়ী; সাংগঠনিক শক্তি দীর্ঘস্থায়ী।

একটি রাজনৈতিক দলকে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতে হয় তখন, যখন তার কর্মীরা দলের ভেতরে থেকেও নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করেন।

কারণ অসন্তুষ্ট কর্মী সবসময় দল ছেড়ে চলে যাবেন এমন নয়। তিনি হয়তো দলেই থাকবেন, কিন্তু আর আগের মতো মাঠে নামবেন না। সভায় যাবেন না। মানুষের বাড়িতে যাবেন না। পোস্টার লাগাবেন না। পুলিশের ভয় উপেক্ষা করে মিছিল করবেন না। ভোটের সময় রাত জেগে কেন্দ্র পাহারা দেবেন না। অর্থাৎ দলের দৃশ্যমান সদস্য থাকবেন, কিন্তু দলের প্রাণশক্তি আর থাকবেন না।

এই নীরব বিচ্ছিন্নতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

বিএনপি এখন এমন একটি অবস্থানে আছে, যেখানে তার সামনে শুধু সরকার পরিচালনার চ্যালেঞ্জ নয়, দল পরিচালনারও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারের সাফল্য যেমন জরুরি, তেমনি দলের সাংগঠনিক স্বাস্থ্যও জরুরি। কারণ সরকার পাঁচ বছর বা দশ বছর থাকতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক দলকে টিকে থাকতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

আজকের ক্ষমতা আগামী দিনের নিশ্চয়তা নয়।

একটি সরকার জনপ্রিয়তা হারালে দলকে রক্ষা করে তার সংগঠন। কিন্তু সংগঠন যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সরকার ও দল—দুটিই সংকটে পড়ে।

তাই বিএনপির উচিত ক্ষমতার কেন্দ্রকে আরও গণতান্ত্রিক, অংশগ্রহণমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক করা। সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেন্দ্রীয় কমিটি ও স্থায়ী কমিটির ভূমিকা দৃশ্যমান করা দরকার। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়ের ব্যবস্থা করতে হবে। দীর্ঘদিনের নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক মূল্যায়নের জন্য একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। দলীয় পদ, মনোনয়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে রাজনৈতিক অবদান, সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনসম্পৃক্ততা ও সততাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

কারণ একটি দলকে কেবল ক্ষমতার লোকজন দিয়ে চালানো যায়, কিন্তু দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায় না।

ত্যাগী নেতাকর্মীরা দলের শিকড়। নতুন মানুষ দলের ডালপালা হতে পারেন, দক্ষ পেশাজীবীরা দলের ফুল-ফল হতে পারেন, সরকার দলের রাষ্ট্রীয় শক্তি হতে পারে; কিন্তু শিকড় দুর্বল হলে গাছ যত বড়ই হোক, ঝড়ের সামনে দাঁড়াতে পারবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, ক্ষমতায় থাকার সময় দলগুলো নিজেদের শক্তিকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করেছে এবং তৃণমূলের ক্ষয়কে অবমূল্যায়ন করেছে। পরে সংকট এলে বোঝা গেছে, ক্ষমতার কাঠামো আর রাজনৈতিক সংগঠন এক জিনিস নয়।

বিএনপির সামনে এখন সেই ভুল পুনরাবৃত্তি না করার সুযোগ রয়েছে।

দলটির নেতৃত্ব যদি এখনই উপলব্ধি করে যে ক্ষমতা দলের শেষ গন্তব্য নয়, বরং জনগণের সেবা ও রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নের একটি সাময়িক দায়িত্ব, তাহলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব। আর যদি ক্ষমতার চারপাশে নতুন একটি বলয় তৈরি হয়, দলের সিদ্ধান্ত ক্রমশ এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তৃণমূলের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় এবং পুরোনো কর্মীরা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ভাবতে শুরু করেন, তাহলে বিপদ অনিবার্য।

তখন ঝড়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।

দলের ভিত যদি ভেতর থেকেই ফাঁপা হয়ে যায়, তাহলে তুফান নয়—একটি দমকা বাতাসই যথেষ্ট হতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কেবল কে ক্ষমতায় আছে তার ওপর নয়; নির্ভর করবে ক্ষমতায় গিয়ে কে নিজের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে তার ওপর। বিএনপির জন্য আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই কে মন্ত্রী হলেন, কে এমপি হলেন, কে কোন পদ পেলেন—শুধু তা নয়।

প্রশ্ন হলো, যারা দুঃসময়ে দলকে ধরে রেখেছিলেন, সুসময়ে দল কি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর যত দ্রুত ও যত আন্তরিকভাবে দেওয়া যাবে, বিএনপির সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ তত বেশি নিরাপদ হবে।

কারণ ক্ষমতার সময় পাশে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক হতে পারে; কিন্তু দুঃসময়ে পাশে থাকা মানুষই একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত সম্পদ।

আর সেই সম্পদকে অবহেলা করে কোনো দলই দীর্ঘদিন শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.