মোহাম্মদ শাহিন আহমেদ রিয়াদ:১৯৫৭ সাল।জনতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ তার দরদী কন্ঠে ভাষণ দিচ্ছেন।লক্ষ লক্ষ লোক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই বৃদ্ধের দিকে।সেই বৃদ্ধ কি বলেন,সেই বৃদ্ধ কি করেন,সেই বৃদ্ধ কি করান।দরদী যেই বৃদ্ধ নিজের হাতে মুসলিমদের জন্য যে দেশ তৈরি করেছিলেন,সেই দেশের একটি অংশ চরমভাবে অবহেলিত হওয়ার কারণেই সেই দেশকে সেই বৃদ্ধ সেই সম্মেলনে “আসসালামু আলাইকুম” জানিয়ে দিলেন।তারপরে্র অংশ ইতিহাস নিজেই তৈরি করেছে।একসময়ের “আসসালামু আলাইকুম” শব্দ বাঙালীদের জানিয়ে দিয়েছে যেকোনোসময় শোষণকারী পাকিস্তানকে বিদায় জানানো হতে পারে,তোমরা তৈরি হয়ে যাও।সেই উচ্চারণের জেদ ধরেই বাঙালীরা একটি স্বাধীন দেশ তৈরি করে সেই দেশের নাম বাংলাদেশ করে তারা বাংলাদেশী হয়ে গেছে।
১৯৬৯ সাল।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ অনেককে ফাঁসি দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের কারাগার তৈরি হচ্ছে।কিন্তু রাজনীতির এই দুঃসময়ে সেই বৃদ্ধকে কেউ খুঁজে পাচ্ছে না।খুঁজবেই বা কোথায়,তার যে কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই।কিন্তু শেখ মুজিব সহ প্রায় সব আসামীই জানতেন,সেই মাওলানা সময়মতো ঠিকই তাদের বাঁচিয়ে নিবেন।
বৃদ্ধের কানে গেল পাকিস্তানীদের রাজনৈতিক জুলুমের কথা।তা শুনে তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারলেন না।কিন্তু একি!বৃদ্ধ যেদিকে যাচ্ছে সেদিকে লাইন ধরে কেন শত শত লোক যাচ্ছে?বৃদ্ধ যখন ঢাকায়,তখন তার পিছনে হিসাব করে দেখা গেল লক্ষ লক্ষ মানুষ।হ্যামিলিওনের বাশিওয়ালার গল্প সবাই জানে,কিন্তু পৃথিবী কি চিনে সেই যাদুকরের কথা?যিনি কোনো গল্পের নায়ক ছিলেন না,পৃথিবীর ইতিহাসে আর কেউ জন্ম নিতে পারে নি যে সেই বৃদ্ধ যাদুকরের মতো।কি ছাত্র,কি শ্রমিক,কি কৃষক,সবাই দাঁড়িয়ে গেল মাওলানা ভাসানীর পিছনে।বৃদ্ধ মাওলানা তখন তার আসল অস্ত্র বের করলেন,অস্ত্রের নাম “হরতাল”।সেই অস্ত্রের এতোই ক্ষমতা ছিল যে পাকিস্তান সরকার এক বৃদ্ধ মাওলানা’র কাছে হেরে সব ফাঁসির আসামীদের মুক্তি দিতে বাধ্য হল।পৃথিবীর সেরা ম্যাগাজিন হিসেবে খ্যাত ‘টাইম ম্যাগাজিন” নিউজ করলো, “৮৬ বছরের বৃদ্ধ মাওলানার কাছে পরাস্ত হলো পাকিস্তানের লৌহমানব হিসেবে খ্যাত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান।“
মাওলানা আব্দুল খান ভাসানী ছিল সেই বৃদ্ধের নাম।যিনি এমনই একজন ব্যক্তি,তিনি একজীবনে তিনটি দেশে বড় বড় আন্দোলনে প্রথম সারীর নেতা ছিলেন।যিনি সরাসরি দুটি দেশ তৈরিতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন।দেশদ্বয়ের নাম বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
শেষ একটি প্যারা দিয়ে লেখা শেষ করছি।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে কারণেই হোক,দেশে অভাব-অনটন বেড়েই চললো।দেশ চলে গেল দুর্ভিক্ষের পর্যায়ে।ভাসানী বুঝলেন এই বয়সেও তাকে একবার ঘর থেকে বের হওয়ার বড় প্রয়োজন।মাওলানা ভাসানী তখন একটি ভুখামিছিলের নেতৃত্ব দিলেন,হাজার হাজার মানুষ তার পেছনে দাঁড়িয়ে গেল।তিনি সবাইকে রেখে বঙ্গভবনে গেলেন, বঙ্গভবনের গেইটে তখন দাঁড়িয়ে ছিলেন জাতীয় চার নেতাদের মধ্যে অন্যতম দুজন,মনসুর আলী সাহেব ও তাজউদ্দীন আহমেদ।তারা মাওলানা ভাসানীকে দেখেই সালাম দিলেন।তারপর ভাসানী সাহেব তাদের ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করার পর দেশের বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুললেন।তখন সেই নেতাদের উত্তর ছিল, “হুজুর,আপনি দেশের চালকের আসনে বসেন।দেশে অনেক সমস্যা,আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি দেশের সবকিছু ভালোভাবে চালাতে।“
মাওলানা ভাসানী তখন উত্তর দিয়েছিলেন , “আমি চালাবো না বলেই তো তোমাদের হাতে দিলাম,দেশের ভালোর দায়িত্ব যেমন তোমাদের,খারাপের দায়ভারও তোমাদের।“
আজ আমার সেই দরদী মাওলানা বেঁচে নেই।১৯৭৬ সালের এমনই এক দিনে অসীম সাহসের বাতিঘর,যার সারাজীবন কেটেছে আন্দোলন-সংগ্রামে,সেই মাওলানা আব্দুল হামিদ ভাসানী ইন্তেকাল করেছিলেন।তাকে সবাই “রেড মাওলানা” ডাকতো।একমাত্র ভাসানীই বলেছিলেন যে “কমিউনিজম যা চায়,তা ইসলাম হাজার বছর আগেই চেয়ে বসে আছে।ইসলাম মানেই সাম্যতা,তা যেদিন মুসলিমরা বুঝতে পারবে সেদিন থেকেই পৃথিবী পরিবর্তন হয়ে যাবে।“

