“সবাই চেয়ে চেয়ে দেখল, একটা মানুষকে কীভাবে মারছে! কেউ একটু সাহায্য করল না। আমি তো সারাজীবন চোখের জল ফেলেই কাটাব।” — এই কথাগুলো বলার সময় গলা ধরে আসছিল লাকী বেগমের।
শনিবার (১২ জুলাই) বরগুনায় নিহত ব্যবসায়ী সোহাগের বাড়িতে গিয়ে কথা বলেন সংবাদকর্মীরা। স্বামী হারানো লাকী বেগম তখন বারবার প্রশ্ন করছিলেন, “এভাবে কি একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে মারতে পারে?”
মামলায় বাধা, ময়নাতদন্তেও বিলম্বের অভিযোগ
লাকীর দাবি, থানায় মামলা দিতে গিয়ে বারবার বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। পুলিশ একাধিকবার ডেকে নিয়ে এজাহারে পরিবর্তন করেছে। এমনকি ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার অনেক পরে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়, যা তাদের আরও যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে।
তিনি বলেন, “একটুও কাপড় ছিল না তার (সোহাগের) শরীরে। ওরা কি মানুষ! যারা আমার স্বামীকে এমনভাবে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
শুধু এক ব্যক্তি নয়, শেষ হয়ে গেছে একটি পরিবার
বুক ভরা কান্না নিয়ে লাকী বলেন, “একটা মানুষকে মেরে ফেললে শুধু সে না, একটা পরিবার শেষ হয়ে যায়। সন্তানরা বাবা হারায়, স্ত্রী স্বামী হারায়। আমি এখন এতিম হয়ে গেছি আমার সন্তানদের নিয়ে।”
সোহাগের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত লাকী বেগম বলেন, “আমাদের জন্য কিছু রেখে যেতে পারেনি সে। এখন আমি কীভাবে সন্তানদের মানুষ করব? কোথায় যাব?”
বাবার কবরের পাশে নির্বাক দুই শিশু
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সোহাগের দুই সন্তান বাবার কবরের পাশে কখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে, আবার কখনো বসে সময় পার করছে। চোখে-মুখে শোক, বিস্ময় আর নিরব কান্না।
ভাইরাল সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড গত ৯ জুলাই রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় প্রকাশ্যে ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে বিবস্ত্র করে ভারি পাথর দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। সেই ভয়ংকর দৃশ্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়, ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ মানুষ।
গ্রেপ্তার ও অতীত সম্পর্ক ঘটনার পর আলমগীর হোসেন, মনির হোসেন, মাহমুদুল হাসান মাহিন, তারেক রহমান রবিন ও মো. টিটন গাজীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
নিহত সোহাগের পরিবার জানিয়েছে, প্রধান অভিযুক্ত মাহিন ছিলেন সোহাগের খুবই ঘনিষ্ঠ। এমনকি তার পরিবারের খরচও চালাতেন সোহাগ। কিন্তু মাহিনসহ অন্যান্য আসামিরা মাসে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করত। চাঁদা না দেওয়ায় মোবাইলে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে দোকানে মারধর করা হয়, পরে রাস্তায় পাথর দিয়ে হত্যা করা হয়।
লাকী বেগমের শেষ আবেদন “আমি কোনো রাজনীতি জানি না, মামলা-মোকদ্দমাও না। আমি শুধু চাই, যারা আমার স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তারা যেন এমন শাস্তি পায়—যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন করার সাহস না পায়।”
এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে কি না, তা সময় বলবে। কিন্তু আজ একজন স্ত্রী, দু’টি শিশু আর একটি পরিবার দাঁড়িয়ে আছে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে—ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায়।

