ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা কেটে গেছে। বিষয়টি নিয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট মহলে তৎপরতা শুরু হয়। সর্বশেষ বাংলাদেশের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জনাব মুহাম্মদ জুলকারনাইনের মধ্যে টেলিফোনে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনার পর ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আগামী দিনে এ অংশগ্রহণকে আরও অর্থবহ ও কার্যকর করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত।
রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ জুলকারনাইন আজ টেলিফোনে শুদ্ধস্বর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ও জার্মানিভিত্তিক সাংবাদিক হাবিব বাবুলকে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সংস্কৃতিমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর টেলিফোন আলাপে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা শিল্পকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার জন্য ভবিষ্যতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উপস্থিতির ক্ষেত্রে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী এই বইমেলায় অংশগ্রহণ শুধু বই প্রদর্শন বা বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে একটি দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সৃজনশীল শিল্প, অনুবাদ, প্রকাশনা এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।
আলোচনায় আগামী বছর ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় অংশগ্রহণকে আরও পরিকল্পিত ও অর্থবহ করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। রাষ্ট্রদূত জুলকারনাইন সংস্কৃতিমন্ত্রীকে আগামী বছরের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলেও জানান। সংশ্লিষ্টদের মতে, মন্ত্রী পর্যায়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকলে বাংলাদেশের জাতীয় স্টল, প্রকাশকদের অংশগ্রহণ, লেখক ও সাহিত্যিকদের উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সুসংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তার পেছনে মূলত প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতিকে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব জটিলতার কারণে শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বইমেলায় নিয়মিত ও পরিকল্পিত উপস্থিতির গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে জার্মানির মতো ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও প্রকাশনা বাজারে বাংলাদেশের লেখক, প্রকাশক ও সাহিত্যকে তুলে ধরার সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অনুবাদ, কপিরাইট বিনিময়, আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং লেখক-প্রকাশকদের নেটওয়ার্ক তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা এসব ক্ষেত্রে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।
এ কারণে প্রতি বছর বইমেলায় অংশগ্রহণের আগে মন্ত্রণালয়, দূতাবাস, বাংলা একাডেমি, প্রকাশক এবং সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রস্তুতি থাকা জরুরি। শেষ মুহূর্তের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা যোগাযোগের জটিলতা যেন দেশের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উপস্থিতিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে না ফেলে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে আরও পেশাদার ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার জন্য আগেভাগে পরিকল্পনা, বাজেট, প্রকাশনা নির্বাচন, অনুবাদ এবং আন্তর্জাতিক প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির অবসান তাই শুধু একটি বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ার ঘটনা নয়; এটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকে কীভাবে আরও সুসংগঠিত করা যায়, সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিকেও সামনে এনেছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও জার্মানিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ এবং সমন্বয় বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের জটিলতা এড়ানোর পাশাপাশি ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বাংলাদেশের উপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে।
সংস্কৃতিমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক আলোচনার মধ্য দিয়ে আপাতত সেই অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে। এখন মূল প্রত্যাশা, বাংলাদেশের অংশগ্রহণ যেন শুধু আনুষ্ঠানিক উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা শিল্পকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগে পরিণত হয়।

