যে গল্প হারিয়ে যেতে পারত, তা-ই লিখছেন নারীরা

যে গল্প কেউ লেখেনি, তা একসময় হারিয়ে যেতে পারে। থেকে যায় কয়েকটি ছবি, কিছু নাম কিংবা অন্যের মুখে শোনা অসম্পূর্ণ স্মৃতি। সেই মানুষটি কী চেয়েছিলেন, কীসের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, আর কীভাবে নিজের জীবন গড়ে তুলেছিলেন, তার অনেকটাই অজানা রয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের নিউ বেডফোর্ড শহরে পলা রবিনসন ডিয়ার এমন গল্পগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির নারীদের তিনি শেখাচ্ছেন কীভাবে নিজের জীবনের কথা নিজের হাতে লিখতে হয় এবং সেই লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে হয়।

৪ অক্টোবর ২০২৬ ডব্লিউবিএসএমে প্রকাশিত সাংবাদিক জিম ফিলিপসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্যোগের কথা। ডিয়ার প্রায় চল্লিশ বছর ধরে নারীদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের কাজে যুক্ত। শিক্ষা ও সম্প্রচারমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর এই প্রচেষ্টার ভিত্তি। নিউ বেডফোর্ডে তিনি আছেন দশ বছর ধরে। গত দুই বছর ধরে পরিচালনা করছেন ‘বহুসাংস্কৃতিক নারী লেখক আসর’, যার ইংরেজি নাম ‘মাল্টিকালচারাল উইমেন রাইটার্স স্যালন’।

এই আসরের বড় শক্তি হলো, এখানে নারীরা কারও গল্পের চরিত্র নন, তাঁরা নিজেরাই লেখক। কোন অভিজ্ঞতার কথা বলবেন, কোন স্মৃতি ধরে রাখবেন এবং নিজের জীবনকে কীভাবে তুলে ধরবেন, সেই কাজে তাঁদের নিজেদের কণ্ঠই গুরুত্ব পাচ্ছে।

উদ্যোগটির পেছনে রয়েছে ডিয়ারের দীর্ঘদিনের একটি পর্যবেক্ষণ। তাঁর মতে, অশ্বেতাঙ্গ মানুষের গল্প ইতিহাসে অনেক সময় নেতিবাচক ছাঁচে উপস্থাপিত হয়েছে অথবা বাদ পড়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির নারীদের জন্য নিজেদের অভিজ্ঞতা জনসমক্ষে আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার সুযোগও সহজে তৈরি হয় না।

সেই ভাবনা থেকে তিনি স্থানীয় অশ্বেতাঙ্গ নারীদের লেখা নিয়ে একটি সাময়িকী প্রকাশের প্রস্তাব দেন। উদ্দেশ্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সাউথকোস্ট অঞ্চলের নারীদের জীবন ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস তাঁদের নিজের বর্ণনায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

নিউ বেডফোর্ড ক্রিয়েটিভের ‘আর্ট ইজ এভরিহোয়্যার’ কর্মসূচি থেকে পরপর দুই বছর সহায়তা পাওয়ার কথা তিনি জানিয়েছেন। অনুদানদাতা সংস্থার প্রকাশিত তথ্যেও এই সহায়তার উল্লেখ রয়েছে। নিউ বেডফোর্ড ক্রিয়েটিভের তালিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইওয়ার্কস্টাইল ইনস্টিটিউটের পলা রবিনসন ডিয়ারের ‘মাল্টিকালচারাল উইমেন রাইটার্স স্যালন’ প্রকল্পকে ৭ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়া হয়। ‘আর্ট ইজ এভরিহোয়্যার’ কর্মসূচি শিল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন ও সমস্যা মোকাবিলায় সহায়ক উদ্যোগকে সমর্থন করে।

নিজের অভিজ্ঞতা থাকলেই তা লিখে ফেলা সহজ হয় না। কোথা থেকে শুরু করতে হবে, কোন ঘটনাটি কীভাবে বলতে হবে কিংবা কঠিন কোনো স্মৃতির মুখোমুখি হয়ে লেখা চালিয়ে যেতে হবে কীভাবে, এসব প্রশ্নও সামনে আসে।

ডিয়ার জানিয়েছেন, তিনি ছয় মাস ধরে নারীদের নিজেদের গল্প লেখার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। শুরুতে বড় একটি দল যোগ দিলেও শেষ পর্যন্ত সবাই থাকেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই লেখালেখিতে পারিশ্রমিক নেই এবং নিয়মিত সময় দিয়ে কাজটি চালিয়ে যাওয়াও কঠিন। যাঁরা পুরো কর্মসূচিতে থাকেন, তাঁদের লেখা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।

এ বছরের গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা। একজন নারী লিখেছেন, পরিবারে তিন প্রজন্ম ধরে চলে আসা কিশোরী বয়সে মা হওয়ার ধারায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়ে। আরেকজন তুলে ধরেছেন বাবার হত্যাকাণ্ড এবং মায়ের বেঁচে ফেরার পর জীবন আবার গুছিয়ে নেওয়ার কথা।

অন্য একজন লিখেছেন তাঁর কেপ ভার্দীয় পূর্বসূরি নারীর ন্যানটাকেটে যাওয়ার পারিবারিক ইতিহাস। ডিয়ার নিজেও লিখেছেন ইতিহাসের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া নিজের এক পূর্বসূরি নারীকে খুঁজে পাওয়া এবং তাঁর পরিচয় উদ্ধার করার কথা।

গল্পগুলো আলাদা। তবে ডিয়ারের মতে, এগুলোর মধ্যে মিল রয়েছে প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগোনোর শক্তি, নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং যে পরিস্থিতিতেই থাকুন, তার মধ্যে আনন্দের জায়গা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টায়।

ডিয়ারের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিবরণে এই কাজের আরও বিস্তৃত ভাবনা পাওয়া যায়। ইওয়ার্কস্টাইল ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে তিনি জানিয়েছেন, বাবা-মায়ের নাগরিক অধিকার ও ন্যায়ের পক্ষে সক্রিয়তা তাঁর চিন্তাকে প্রভাবিত করেছে। দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এমন একটি শিক্ষাপদ্ধতি গড়ে তুলেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত লেখা, ইতিহাস ও মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয় একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির বর্ণনা অনুযায়ী, লেখক আসরে গোপনীয়তার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে নারীদের নিজেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাবার পরিবেশ তৈরি করা হয়। তাঁরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে যেতে চান, সেটিও এই ভাবনার অংশ। ‘পাওয়ার অব ভয়েস’ পাঠ্যবই এবং প্রকাশিত সাময়িকীগুলো লেখালেখির সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশি পাঠকদের জন্য এই উদ্যোগ একটি পরিচিত অথচ গভীর প্রশ্ন সামনে আনে: আমাদের পরিবারের নারীদের জীবন সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?

মা, নানি কিংবা দাদির দৈনন্দিন কাজ আমাদের পরিচিত। কিন্তু তাঁদের শৈশবের স্বপ্ন, কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের কারণ, নিজের মতো করে কিছু করার ইচ্ছা কিংবা কোনো ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করার কথা কি আমরা কখনো মন দিয়ে শুনেছি?

একটি পরিবারের ইতিহাস লিখতে গেলে জন্ম, বিয়ে, মৃত্যু বা বাসস্থান বদলের তারিখ পাওয়া যেতে পারে। সেই ঘটনার ভেতরে থাকা মানুষের অনুভব ও সিদ্ধান্ত জানতে হলে তাঁর কথাও প্রয়োজন।

কেন একটি পরিবার গ্রাম ছেড়েছিল, কীভাবে নতুন জায়গায় মানিয়ে নিয়েছিল, কিংবা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে কোন বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল, এসব অভিজ্ঞতা পরিবারের মানুষই সবচেয়ে কাছ থেকে বলতে পারেন।

নিউ বেডফোর্ডের উদ্যোগ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশেও ছোট পরিসরে এমন কাজের কথা ভাবা যায়। পরিবারের কোনো প্রবীণ নারীর স্মৃতি লিখে রাখা, তাঁর অনুমতি নিয়ে কথোপকথন রেকর্ড করা অথবা পুরোনো ছবির মানুষগুলোর পরিচয় সংরক্ষণ করা হতে পারে একটি শুরু। পাঠাগার, স্থানীয় সাহিত্যগোষ্ঠী কিংবা নারী সংগঠনও চাইলে নিজেদের উপযোগী লেখালেখির আসর আয়োজনের কথা ভাবতে পারে। এগুলো সম্ভাব্য উদ্যোগের প্রস্তাব, বাংলাদেশে এই প্রকল্প চালু থাকার তথ্য নয়।

এ ধরনের কাজে সবচেয়ে জরুরি হলো যাঁর গল্প, তাঁর ইচ্ছাকে সম্মান করা। তিনি কোন কথা প্রকাশ করতে চান এবং কোনটি ব্যক্তিগত রাখতে চান, সেই সিদ্ধান্ত তাঁরই। অন্য কেউ লিখতে সাহায্য করলে লেখাটি তাঁকে পড়ে শোনানো বা দেখিয়ে নেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাঁর বক্তব্যের অর্থ বদলে না যায়।

আশাবাদী লেখা তৈরির জন্য প্রতিটি জীবনের শেষে অসাধারণ সাফল্যের দাবি যোগ করারও প্রয়োজন নেই। একটি কঠিন সময় পার করা, অসমাপ্ত পড়াশোনায় ফেরার ইচ্ছা কিংবা পরিবারের কোনো পুরোনো অভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন তোলার মধ্যেও একটি মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা আছে। সেসব অভিজ্ঞতার মূল্য প্রকাশের জন্য তা অতিরঞ্জিত করতে হয় না।

ডিয়ারের উদ্যোগ সম্পর্কে পাওয়া তথ্য থেকে অংশগ্রহণকারীদের আয়, পেশা কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যে কতটা পরিবর্তন এসেছে, তা বলা যায় না। তবে তাঁদের লেখার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, লেখা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং কাজটির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাওয়া গেছে। আশার ভিত্তি হিসেবে এই দৃশ্যমান কাজগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।

একজন নারী যখন নিজের অভিজ্ঞতা লিখে রাখেন, তখন পরবর্তী প্রজন্ম তাঁকে কেবল একটি ছবি বা পারিবারিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে জানার সীমা পেরোতে পারে। তাঁর নিজের ভাষায় জানা যায় তিনি কী ভেবেছিলেন, কী চেয়েছিলেন এবং জীবনের ঘটনাগুলোকে কীভাবে দেখেছিলেন।

এই সুযোগের মধ্যেই নিউ বেডফোর্ডের লেখক আসরের তাৎপর্য। কারও কথা মন দিয়ে শোনা, তাঁকে লিখতে সহায়তা করা এবং তাঁর সম্মতিতে সেই অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করা, ছোট মনে হলেও যত্নের কাজ।

আর সেই যত্নের শুরু হতে পারে আমাদের নিজের পরিবারেই, একটি সহজ প্রশ্ন দিয়ে : তোমার জীবনের গল্পটি কি আমাদের বলবে ?

তথ্যসূত্র: জিম ফিলিপসের প্রতিবেদন, ডব্লিউবিএসএম, ৪ অক্টোবর ২০২৬; ইওয়ার্কস্টাইল ইনস্টিটিউটের নিজস্ব ওয়েবসাইট; নিউ বেডফোর্ড ক্রিয়েটিভের অনুদানতালিকা।

লেখক: আইরিন পারভিন
যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.