অ্যাডভোকেট আনসার খান :বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার গণআন্দোলনের বিজয়ের মধ্যদিয়ে স্বৈরাচারী শাসকের পতন পরবর্তীতে ড. মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের একটি উদ্যোগ নিয়েছে এবং এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের সংস্কারের লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করেছে।
আমরা দেখে নিতে পারি সংবিধান কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানে সরকারের চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও কাঠামোগত বিধানাবলির অর্থাৎ রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ, তথা নির্বাহী, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের গঠনপ্রকৃতি, কার্যপদ্ধতি, দায়িত্ব ও ক্ষমতার পরিধি ও সীমার বিবরণ লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ইয়াস ঘাইয়ের মতে সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতীয় ঐক্যকে সুদৃঢ় করা, জনগণকে দেশ পরিচালনায় অংশগ্রহণের অংশীদারত্ব এবং অধিকার দেওয়া, তাদের মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, জাতীয় লক্ষ্য ও মূল্যবোধকে ব্যাখ্যা করা, প্রয়োজনীয় কোনো পরিবর্তনের বৈধতা নিশ্চিত করা এবং সাংবিধানিক শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের প্রসার করা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের জন্য ১৯৭২ সালে একটি সংবিধান প্রণয়ন, প্রবর্তন ও কার্যকর করা হয়েছিলো। পরবর্তী পাঁচ দশকে ওই সংবিধানের অনেকগুলো পরিবর্তন ও সংশোধন হয়েছে এবং এতে করে আদি সংবিধানের মূল চরিত্রই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, যার কারণে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানে বলতে গেলে অনেক অগণতান্ত্রিক এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের উপাদান যুক্ত করে একব্যক্তির একনায়কতান্ত্রিক সংবিধানে রূপান্তরিত করা হয়েছে। প্রতিটি সংশোধনীতে একজন ব্যক্তির ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যেমন চতুর্থ সংশোধনীর বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির শাসন উপড়ে ফেলে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির শাসন ব্যবস্হা প্রবর্তন করে রাষ্ট্রপতির হাতে রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের সর্বময় ক্ষমতা তোলে দেয়া হয়েছিলো অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি একজন সার্বভৌম রাজার ন্যায় একচ্ছত্র এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন। তখন বঙ্গবন্ধু দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং এটি বলা সঙ্গত হবে যে বঙ্গবন্ধুকে ফোকাস ধরেই চতুর্থ সংশোধনী আনয়ণ করার কারণে রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর হাতকে শক্তিশালী ও ক্ষমতায়িত করার জন্য ওই সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছিলো। ৪র্থ সংশোধনীতে মূলত একজন ব্যক্তির কর্তৃত্ববাদী স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা হয়েছিলো এবং পরবর্তী দশকগুলোতে যত সংশোধনী আনয়ণ করা হয়েছে তার সবগুলোই একব্যক্তির ক্ষমতাকে একচেটিয়াত্ব দিয়েছে এবং এর ফলে জনগণকে ক্ষমতাহীন করেছে, গণতান্ত্রিক সব অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে জনগণের নিকট থেকে।
মূলত পরবর্তী প্রায় প্রতিটি সংশোধনীতে এমনসব অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করা হয়েছে যে দেশে পুরোপুরি কর্তৃত্ববাদী স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পথ সুগম করেছিলো। এব ফলে গত পাঁচ দশকে যারা শাসক হয়ে এসেছিলেন তাদের সবাই কমবেশি স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ শাসন করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন এবং তাদের দ্বারা সংশোধিত সংবিধানের অনুচ্ছেদ, ধারা-উপধারাগুলোতে স্বৈরশাসনের বিধান সংযুক্ত করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। বিশেষকরে গত ষোল বছরে সাংবিধানিক সংশোধনীগুলোর লক্ষ্যই ছিলো শাসকের ক্ষমতায়ন করা অর্থাৎ সংশোধনীগুলো ছিলো প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রী অর্থাৎ -“অল রোডস টু লিড টু প্রাইম মিনিস্টার” যার দ্বারা দেশের প্রধানমন্ত্রীর একক ও কর্তৃত্ববাদী ব্যক্তিগত ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিলো, যেমন- নির্বাহী বিভাগ, আইন, সংসদ, বিচার বিভাগ, অর্থাৎ রাষ্ট্রের সবগুলো প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার হাত প্রসারিত হয়েছিলো, প্রধানমন্ত্রীর ইশারা বা অনুমোদন ব্যতিত রাষ্ট্রের কোনো একটি অঙ্গও নড়াচড়া করতে বা গাছের একটি পাতাও নড়তে সক্ষম ছিলো না।
প্রধানমন্ত্রীর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, সংসদে দলের তথা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বিরুদ্ধে দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটপ্রদানের অধিকার না থাকা, বিচার বিভাগের দলীয়করণ, সংবিধান ও সাংবিধানিক আকাঙ্ক্ষার বিচ্যুতি, অবাধ মতপ্রকাশের অধিকার, অবাধ ও সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অভাব, ক্ষমতার সুষম বন্টন-বিভাজনের স্পষ্টীকরণ ব্যবস্হার অভাবের কারণেই দেশে ক্ষমতার ব্যক্তিগতকরণ, পরিবারকরণ, আত্মীয়করণ ও দলীয়করণের সাংবিধানিক ভিত্তি ও ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছিলো বিগত বছরগুলোতে, এবং সংবিধানের দোহাই তোলে এভাবেই দেশের জনগণকে শাসকগোষ্ঠীর তথা প্রধানমন্ত্রীর হুকুমের দাসে পরিণত করা হয়েছিলো গণতান্ত্রিক শাসনের নামে। রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ,-এই আপ্তবাক্যটি একটি কাগুজে বাঘে পরিণত হয়ে আছে।
গত ৫০-বছরে কাটাছেঁড়া করে একক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতার অভূতপূর্ব কেন্দ্রীকরণের কারণে দেশে সত্যিকারঅর্থে গণতন্ত্রের চর্চা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক উপাদান যৌথ নেতৃত্ব এবং যৌথ দায়িত্বশীল সংসদীয় সরকার ব্যবস্হাও গড়ে ওঠতে পারেনি বা গড়ে তোলার সূযোগ দেওয়া হয়নি। বরং দেশে ব্যক্তিভক্তির শাসন তথা প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করা হয়েছিলো এবং প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রী কমবেশি স্বৈরাচারী শাসকের ক্ষমতা চর্চা করার কারণে পর্যায়ক্রমে দেশে প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ববাদী সর্বগ্রাসী স্বৈরতান্ত্রিক শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন সংবিধানের ৫৫, ৭০, ৭২ অনুচ্ছেদগুলো সংবিধানে থাকার কারণে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্হার মধ্যমণি তথা একক এবং অবিসংবাদী কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেছেন, যা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিকভাবে কোনো প্রধানমন্ত্রী এমনতরো প্রভূত্ববাদী স্বৈর ক্ষমতা ভোগ করেন না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে -প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশে একটি মন্ত্রীসভা থাকবে এবং ৫৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তার কর্তৃত্বে এই সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হবে। এই অনুচ্ছেদ দেশের সকল নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তথা একজনমাত্র ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে, অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত বা জাপানের সংবিধানে এমনকোনো অনুচ্ছেদ দেখতে পাওয়া যায়নি। ভারতের সংবিধানের ৫৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারতের সকল নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এবং ৭৪(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতিকে তার কার্য সম্পাদনে সাহায্য করার ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য একটি মন্ত্রীসভা থাকবে, যার শীর্ষে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি তার কার্যসম্পাদনে মন্ত্রীসভার সেই পরামর্শ অনুসারে কাজ করবেন। তবে রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীসভাকে সেই পরামর্শ সাধারণভাবে বা অন্যভাবে পুনর্বিবেচনা করার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন এবং সেই পুনর্বিবেচনার পর যে পরামর্শ দেওয়া হবে সেই পরামর্শ অনুসারেই রাষ্ট্রপতি কাজ করবেন। অন্যদিকে, জাপানের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল নির্বাহী ক্ষমতা মন্ত্রীসভার নিকট ন্যস্ত করা হয়েছে।
ভারত ও জাপানের সাথে অসীম পার্থক্য বাংলাদেশের সংবিধানের।বাংলাদেশে রাষ্ট্রের সকল নির্বাহী ক্ষমতা একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর হস্তে ন্যস্ত করা হয়েছে। তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণে ও তত্ত্বাবধানে অধীনস্হদের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন, কীভাবে তিনি সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন, সেটি তার একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এখানে মন্ত্রীসভার কিছু করার নেই। বরং প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে মন্ত্রীসভার মেনে নিতে হয়। ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই কিন্তু আপনাআপনি হয়ে যায় মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত হিসেবে। অর্থাৎ একজনের নেওয়া সিদ্ধান্তের দায় কিন্তু নিতে হয় মন্ত্রীসভার সকল সদস্যকে এবং সংসদে জবাবদিহি করতে হয় সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার কারণে। কি অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী বিষয় যে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক ক্ষমতা একজনের, কিন্তু দায় নিতে হয় মন্ত্রীসভার সকল সদস্যকে।
শুধু যে সংশোধনের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক বিষয় যুক্ত করা হয়েছে তা-ই নয়, বাহাত্তরের আদি সংবিধানেও এমন অগণতান্ত্রিক ব্যবস্হা রাখা হয়েছিলো। যেমন: সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।” দেখা যায়, ক্ষমতার মালিকানা জনগণের হলেও প্রয়োগের মালিকানা থেকে জনগণকে বঞ্চিত করে প্রয়োগের এখতিয়ার একজন ব্যক্তি বা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ওপর ন্যাস্ত করা হয়েছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে। সংবিধানের ৪৮(৩), অনুচ্ছেদ ৪৯, অনুচ্ছেদ ৬১, ১১৮, ১১৭, ১৩৭, ৪৮(৩), ৫৫, ৫৮, ৫৬(৩) ইত্যাদি মিলিয়ে পড়লে দেখা যায় সব ক্ষমতাই প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রধানমন্ত্রীকে বিশাল ক্ষমতার অধিকারী করেছে সংসদের ওপর। অর্থাৎ গোটা সংসদই দলীয় প্রধানের নিকট দায়বদ্ধই নয় কেবল, একান্ত অনুগত ও বাধ্যগত হতে সংবিধান অনুযায়ীই বাধ্য। কারণ,৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য যদি তার নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে তার সংসদ সদস্যপদ বিলুপ্ত হবে। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হলে দেশের আইনপ্রণয়নের ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা ভোগ করার সূযোগ পেয়ে থাকেন। এতো ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী ভোগ করেন না। বাহাত্তরের সংবিধানে প্রদানমন্ত্রীর হাতে যে ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে তা নজিরবিহীন, অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী সেনা শাসকের কাছেও এত বিশাল পরিমাণে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত আছে বলে জানা নেই।
রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা চর্চার ক্ষেত্রে কিছুটা ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাহাত্তরের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির হাতে অল্পবিস্তর ক্ষমতা রাখা হয়েছিলো, যেমন: বাহাত্তরের সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের অধিবেশন আহবান, স্হগিত ও ভঙ্গ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির, যা তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে প্রয়োগ করতেন। কিন্তু সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে আরও সীমিত করা হয়। সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী আদি সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে যুক্ত করে বলা হয়, ৭২(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতা ও দায়িত্বপালনে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুসারে কার্য সম্পাদনা করবেন। সংসদ অধিবেশন আহবান, স্থগিত বা ভঙ্গ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে সংকোচিত ও সীমাবদ্ধ করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে একক ও নিরঙ্কুশ করার জন্যই সংবিধানে এমন স্বৈরাচারী সংশোধনী আনা হয়েছিলো, যে কার্যকর সংসদীয় পদ্ধতির শাসনে এমনটি গ্রহনীয় নয়।
২০২৪ সালে আবারও সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার বা বাতিল করে পূনর্লিখনের বিষয়টিীর সামনে আসে জোরালোভাবে। এই আলোচনার প্রেক্ষিতে অর্থাৎ সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যমান ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের সংশোধন না-কি বিদ্যমান সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা। এই বিষয়ে ৩-টি মতামত এসেছে। একদল সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ৭২ সালের সংবিধান বহাল রাখার পক্ষে এবং অন্যদিকে একদল সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অপরদিকে, তৃতীয় পক্ষের বক্তব্য হলো ড. ইউনুসের সরকার নয়, একটি নির্বাচিত সরকারই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংবিধানের বিষয়ে কী করা বা না করা সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে চলমান বিতর্কের মধ্যে আমরা জানার বা দেখার চেষ্টা করবো আমাদের সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত সংবিধানের জনকরা কীভাবে, কখন এবং কী উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সামনে রেখে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন এবং পরবর্তী দশকগুলোতে ক্ষমতাসীন শাসকেরা মূল সংবিধানটি কাটাছেঁড়া করে আদি সংবিধানের লক্ষ্যকে বিসর্জন দিয়েছিলেন, যার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের জনগণকে।
বাহাত্তরের ভূরাজনীতি ও বিশ্বব্যবস্হার প্রেক্ষাপটে আমাদের আদি সংবিধানটি ছিলো বেশ উন্নত, মোটামুটি উদার গণতান্ত্রিক একটি সংবিধান। সংবিধান প্রণয়নকারীগণের ওপর সদ্য স্বাধীন দেশের জনগণের চাওয়া একটি প্রকৃত উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের, মূল্যবোধ ও অভীষ্টে পৌঁছাতে যা কিছুর প্রয়োজন তার অনেক কিছুই ছিলো ওই সংবিধানে। যেমন: রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের ওপর প্রয়োজনীয় ক্ষমতা অর্পণ করা হয় এবং ওই বিভাগগুলোর গঠনপ্রণালী, কার্যপদ্ধতি, দায়িত্ব ও ক্ষমতার বিধান সহ নাগরিকদের মানবাধিকার ও রাষ্ট্রের মূলনীতিগুলো সন্নিবেশিত করা হয়।
সংবিধানকে দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে অভিহিত করে সংবিধানে ৭ অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করা হয়েছে। কেননা, সংবিধানকে রাষ্ট্রের আইনগত ভিত্তি বা রাষ্ট্র গঠনকারী দলিলও বলা হয়ে থাকে। আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিলো এই সংবিধানের সাথে অসামঞ্জ্যপূর্ণ অন্য যেকোনো ধরনের আইন অবৈধ এবং এটি আদালত কর্তৃক বাতিলযোগ্য। এই সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে মোট সংসদ সদস্যদের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতি বা ভোট লাগবে।
মোটের ওপর এটি বলা সঙ্গত হবে যে বিশ্বের ওপরাপর গণতান্ত্রিক সংবিধানের সাথে তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশের সংবিধানটিও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের বিচারে ভূলএুটি থাকাস্বত্বেও একটি ভালো সংবিধান হিসেবে সেই সময়ে বেশ গ্রহণীয়তা পেয়েছিলো। বিশেষকরে, সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, -এই চার নীতি সংবিধানে লিপিবদ্ধ হওয়ার মধ্যদিয়ে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়েছিলো, যদিও মূলনীতিগুলো কাগুজে ছিলো, কেননা মূলনীতিগুলো বাস্তবায়নযোগ্য ছিলো না, তবু মানুষ তাদের প্রত্যাশার পূরণের সিঁড়ি হিসেবে গ্রহন করেছিলেন বাহাত্তরের সংবিধানেকে।
দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এখনোঅবধি বাহাত্তরের আদি সংবিধানের পূণর্বহালের দাবি করে আসছেন। কিন্তু এটি পূণর্বহাল করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অনেকেই। কারণ বিগত পাঁচ দশকে সংবিধানে এতোবেশি কাঁটাছেড়া করা হয়েছে যে তার জোড়াতালিতে জনগণের ভাগ্য এবং অধিকার নিশ্চিত করার কোনো সূযোগ বাহাত্তরের সংবিধানে রয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।
একটি সূযোগ এসেছে সংবিধানের পর্যালোচনা করা দরকার এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করে একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক সংবিধানেে রূপায়ন করা অথবা নতুন করে সংবিধান প্রণয়ন করা, যা-ই করা হোক তার জন্য জাতীয় ঐক্যমত সৃষ্টি করতে হবে।
সূত্র :
১. সংবিধান বিতর্ক ১৯৭২, ড. আসিফ নজরুল।
২:বাংলাদেশের সংবিধান পর্যালোচনা: গণতান্ত্রিক আইন ও সংবিধান আন্দোলন
৩. অ্যাডভোকেট গোলাম সোবহান চৌধুরী দীপন, সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিশরত।
৪. বাংলাদেশের সংবিধান।

