লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানলে বাড়ি হারিয়ে দেশীয় ফুলের বীজ ছড়াতে শুরু করেছিলেন এক মা ও তাঁর কিশোর ছেলে। সেই পারিবারিক উদ্যোগে এখন যুক্ত হয়েছে স্কুল, প্রতিবেশী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। প্রায় ১০ হাজার বীজ-বল পৌঁছেছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে।
যেখানে একসময় বাড়ি ছিল, সেখানে এখন ফুল ফুটছে। সূর্যমুখীর পাশে মাথা তুলেছে কমলা রঙের ক্যালিফোর্নিয়া পপি। আগুনে হারিয়ে যাওয়া বাড়িটি তাতে ফিরে আসেনি। কিন্তু সেই জমিতে ফিরে যাওয়ার একটি নতুন কারণ খুঁজে পেয়েছে গুডইয়ার পরিবার।
২০২৫ সালের জানুয়ারির দাবানলে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের প্যাসিফিক প্যালিসেডসে নিজেদের বাড়ি হারান লেখক ও কবি ডানা গুডইয়ার এবং তাঁর পরিবার। সেই বিপর্যয়ের পর ডানা ও তাঁর কিশোর ছেলে রামি দেশীয় ফুলের বীজ দিয়ে ছোট ছোট মাটির বল বানাতে শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল, পোড়া জমিতে আবার কিছু ফুটুক, বেড়ে উঠুক।
সেই ছোট উদ্যোগই পরে পরিচিত হয় ‘দ্য সিড বম্ব প্রজেক্ট’ নামে। ১ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত রিজনস টু বি চিয়ারফুলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পটি থেকে প্রায় ১০ হাজার বীজ-বল বিতরণ করা হয়েছে প্যালিসেডস, অল্টাডেনা ও মালিবুর দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে। এক পরিবারের শোক সামলানোর চেষ্টা এভাবেই অন্য অনেকের পাশে দাঁড়ানোর পথ হয়ে উঠেছে। (reasonstobecheerful.world)
২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি শুরু হওয়া দাবানল লস অ্যাঞ্জেলেসের বহু মানুষের জীবন ওলটপালট করে দেয়। ক্যালিফোর্নিয়ার অগ্নিনির্বাপণ কর্তৃপক্ষের হিসাবে, শুধু প্যালিসেডসের আগুনেই পুড়ে যায় ২৩ হাজার ৪৪৮ একর এলাকা। ধ্বংস হয় ছয় হাজারের বেশি স্থাপনা। (fire.ca.gov)
গুডইয়ারদের কাছে সেই ক্ষতি জড়িয়ে ছিল প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে। পরিচিত বাড়ি, পাড়া আর সেখানে কাটানো সময়ের স্মৃতি হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে যন্ত্রণার কারণ। ডানা ভাবছিলেন, এই গভীর শোক আর দিশাহীনতার মধ্যে এমন কিছু করা যায় কি না, যা তাঁদের আবার কাজে ফিরিয়ে আনবে। বিপদের সময় তাঁরা অনেকের সাহায্য পেয়েছিলেন। এবার নিজেরাও মানুষ ও নিজেদের পরিচিত ভূখণ্ডকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
সেখান থেকেই ফুলের বীজ ছড়ানোর চিন্তা। তখন ১৪ বছর বয়সী রামির সঙ্গে কাজে যোগ দেয় তার ১২ বছরের বোন উইলাও। পরিবারের সদস্যরা মিলে কাদামাটি, কম্পোস্ট ও বীজ মিশিয়ে বল তৈরি করতে থাকেন।
পরবর্তী শরতে তাঁদের পোড়া জমিতে সূর্যমুখী ও পপি ফুটে ওঠে। রামির কাছে দৃশ্যটি ছিল আনন্দের। যে জায়গায় ফিরলেই আগুনের ক্ষতির কথা মনে পড়ত, সেখানে এখন নতুন কিছু দেখার ছিল। পুরোনো দুঃখের পাশাপাশি নতুন ভালো লাগার স্মৃতিও তৈরি হচ্ছিল। ডানারও মনে হয়েছে, এই কাজটি না থাকলে হয়তো প্যালিসেডসে ফিরে যাওয়াই এড়িয়ে চলতেন। ফুলের অপেক্ষা তাঁদের সেই জায়গার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। (reasonstobecheerful.world)
তাঁদের ব্যবহৃত ‘সিড বম্ব’ নামটি শুনতে অচেনা লাগলেও জিনিসটি সহজ। কাদামাটি ও কম্পোস্টের সঙ্গে বীজ মিশিয়ে ছোট গোল বল তৈরি করা হয়। বাংলায় একে বীজ-বল বললেই বোঝা সহজ। মাটির আবরণ বীজকে বাতাসে উড়ে যাওয়া বা প্রাণীর খেয়ে ফেলা থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। বৃষ্টিতে আবরণ ভেঙে গেলে উপযুক্ত পরিবেশে বীজ অঙ্কুরিত হতে পারে। তবে বল ছড়িয়ে দিলেই প্রতিটি বীজ থেকে গাছ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বৃষ্টি, মাটির অবস্থা, আলো ও বীজের প্রজাতির ওপর ফল নির্ভর করে। (nationalgeographic.com)
গুডইয়াররা বীজ বাছাইয়ে সহায়তা নেন ক্যালিফোর্নিয়ার দেশীয় উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করা থিওডর পেইন ফাউন্ডেশনের। তাঁদের মিশ্রণে রাখা হয় ক্যালিফোর্নিয়া পপি, দেশীয় সূর্যমুখী, বাকহুইট ও ইভনিং প্রিমরোজের মতো উদ্ভিদ। এখানে দেশীয় বলতে ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় প্রজাতিকেই বোঝানো হচ্ছে। ভাবনাটি ছিল, ফুল ফুটবে, স্থানীয় উদ্ভিদ ফিরে আসবে এবং মৌমাছি-প্রজাপতির মতো পরাগায়ণকারী প্রাণীর জন্য খাবারের সুযোগ তৈরি হবে।
মূল প্রতিবেদনে সূর্যমুখীর মাধ্যমে মাটি থেকে সীসাসহ কিছু দূষক শোষণের সম্ভাবনার কথাও এসেছে। তবে গুডইয়ারদের জমিতে এই পদ্ধতিতে কতটা দূষণ কমেছে, তার পরীক্ষালব্ধ হিসাব দেওয়া হয়নি। তাই সেখানে ফুল ফোটাকে মাটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার বা নিরাপদ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না। (reasonstobecheerful.world)
প্রথমে কাজটি পরিবারের মধ্যেই সীমিত ছিল। পরে রামির স্কুল, সান্তা মনিকার ক্রসরোডস, গোটা স্কুলকে বীজ-বল তৈরিতে যুক্ত করে। শিক্ষার্থীদের হাতে তৈরি হতে থাকে হাজার হাজার ছোট বল। অন্য স্কুল, স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অলাভজনক সংগঠনও এগিয়ে আসে।
মালিবু কম্পোস্ট দেয় কম্পোস্ট সার। আনাওয়াল্ট লাম্বার সরঞ্জাম দিয়ে এবং দোকানের ক্রেতাদের ছোট ছোট অনুদান সংগ্রহ করে সহায়তা করে। জনসন ট্রি কোম্পানির এক কর্মী শুষ্ক গ্রীষ্মে গুডইয়ারদের জমিতে পানি দেন, যাতে নতুন গাছগুলো টিকে থাকতে পারে।
শুরুতে পরিবারটি নিজের অর্থেই কাজ চালাত। প্রতিবেদনে প্রতিটি বীজ-বলের খরচ প্রায় পাঁচ ডলার বলা হয়েছে। পরে অলাভজনক সংস্থা ক্রিয়েটিভ ভিশনসের সহায়তায় প্রকল্পটির জন্য অনুদান ও সহায়তা গ্রহণের ব্যবস্থা হয়। (reasonstobecheerful.world)
কাজ বাড়তে থাকলে ডানা খেয়াল করেন, বীজ-বল তৈরির আয়োজন মানুষকে পরস্পরের কাছে আসার সুযোগও করে দিচ্ছে। একসঙ্গে বসে বীজ, কাদা আর কম্পোস্ট মেশানোর সময় মানুষ কথা বলে। কেউ বলে হারানো বাড়ির কথা, কেউ পুরোনো বাগানের কথা, কেউ জানায় কীভাবে দিন কাটছে। একই বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষ একে অন্যের অভিজ্ঞতা শোনার সুযোগ পায়।
শিশুরা আনন্দ পায় কাদা নিয়ে কাজ করতে। প্রবীণদের আগ্রহ বেশি ফুল আর গাছের প্রজাতি নিয়ে। বয়স ও আগ্রহের পার্থক্য থাকলেও কাজের টেবিলে সবাই অংশ নিতে পারে। ডানার অভিজ্ঞতায়, এই একত্র হওয়াটিও বীজ থেকে ফুল ফোটার মতোই মূল্যবান। ছড়িয়ে পড়া একটি পাড়ার মানুষ আবার কিছু সময়ের জন্য এক জায়গায় বসতে পারে। (reasonstobecheerful.world)
এই উৎসাহের মধ্যেই গুডইয়াররা শিখেছেন, চোখে কোনো জমি পোড়া ও বিবর্ণ দেখালেই সেখানে নতুন বীজ ছড়ানো দরকার হয় না। থিওডর পেইন ফাউন্ডেশন তাঁদের পার্ক ও সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকায় বীজ না ছড়ানোর পরামর্শ দেয়। তাই তাঁরা মূলত বসতিপূর্ণ এলাকার জমিতে কাজ করেছেন, মালিক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে। অধিকাংশ বীজ-বল তুলে দিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হাতে, যাতে নিজের জমি নিয়ে সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই নিতে পারে।
এর পেছনে পরিবেশগত কারণও আছে। অনেক উদ্ভিদ আগুনের পর মাটিতে থাকা বীজ থেকে ফিরে আসে। কোনো কোনো গাছের বেঁচে থাকা গোড়া বা শিকড় থেকে নতুন কুঁড়ি বের হয়। বাইরে থেকে বীজ ছড়ালে সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধাও পড়তে পারে।
ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা হলো, প্রাকৃতিক এলাকায় অনেক ক্ষেত্রে জমিকে সময় দেওয়াই ভালো। ঘন ঘন আগুন, আগ্রাসী উদ্ভিদ বা অন্য সমস্যার কারণে বিশেষ ব্যবস্থা দরকার হলে তা বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত। বাড়ির বাগান পুনরুদ্ধার এবং প্রাকৃতিক বন ফেরানোর কাজ তাই একভাবে করা যায় না। (reasonstobecheerful.world, theodorepayne.org)
একইভাবে দেশীয় গাছ মানেই আগুনে পুড়বে না, এমন নিশ্চয়তাও নেই। গাছের ধরন, অবস্থান, দূরত্ব ও পরিচর্যা আগুনের ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলে। থিওডর পেইন ফাউন্ডেশনও স্পষ্ট করেছে, কোনো উদ্ভিদই পুরোপুরি অগ্নিরোধী নয়। (theodorepayne.org)
গুডইয়ারদের মতো আশপাশের আরও কিছু মানুষ নিজেদের ক্ষতি সামলে প্রতিবেশীদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন। অল্টাডেনায় ইটন দাবানলে নিজের বাড়ি হারানো রেনে অ্যামিও বেছে নিয়েছেন ফুলের বীজ। তাঁর উদ্যোগের নাম ‘দ্য গ্রেট অল্টাডেনা পপি প্রজেক্ট’।
পাসাডেনা নাউয়ের ৫ মার্চ ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যামি জানিয়েছেন, তিনি ৭৫০টির বেশি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তিতে প্রায় ২৫ কোটি ক্যালিফোর্নিয়া পপির বীজ ছড়িয়েছেন। কাজটির বড় অংশ করেছেন নিজে, নিজের অর্থ খরচ করে। ব্যবহার করেছেন হাতে ঘোরানো বীজ ছড়ানোর যন্ত্র। এই সংখ্যা বোনা বীজের, জন্মানো গাছের নয়। কতগুলো ফুল ফুটবে, তা বৃষ্টি ও অন্যান্য পরিবেশগত অবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
তাঁর উদ্যোগের প্রথম পপি ফুটেছিল নিজের বাড়ির পোড়া জমিতেই। পরে অন্য জমিতেও ফুল দেখা যেতে থাকে। প্রতিবেশীদের জীবনে সামান্য আনন্দ ও সৌন্দর্য ফেরানোই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। (pasadenanow.com)
অল্টাডেনার বাসিন্দা লরি স্কটও ‘রিগ্রো অল্টাডেনা’ নামে বিনামূল্যে গাছ ও বীজ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছেন। নিজের বাড়ির সামনে থেকে তিনি প্রতিবেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন নতুন করে বাগান গড়ার উপকরণ। আগুনে হারানো সবকিছু ফেরানো সম্ভব নয়, কিন্তু একটি গাছ দিয়ে আবার শুরু করা যায়। (kqed.org)
মানুষের এই চেষ্টার পাশাপাশি প্রকৃতির নিজের ফিরে আসার ক্ষমতাও বিস্ময় জাগায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েলোস্টোনে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ দাবানলের পর বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাকৃতিকভাবেই নতুন গাছ জন্মায়। এই বনে প্রচুর লজপোল পাইন রয়েছে। এদের কিছু গাছের বীজবাহী শঙ্কু আঠালো রজনের আবরণে বন্ধ থাকে। আগুনের তাপে সেই আবরণ খুলে গেলে বীজ মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত আলো ও আর্দ্রতা পেলে সেখান থেকে নতুন চারা গজায়। (home.nps.gov)
তবে সব জমি একইভাবে ফিরে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের গবেষণাভিত্তিক বিবরণে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালে পোড়া এলাকার প্রায় ১৬ শতাংশ তিন দশকের বেশি সময় পরও আগের মতো বনে পরিণত হয়নি। কিছু এলাকায় নতুন গাছ জন্মানোর মতো বীজের জোগান ছিল কম।
আবার ২০১৬ সালের আগুনে আগের দাবানলের পর জন্মানো কিছু তরুণ বন পুড়ে যায়। অনেক গাছ তখনো যথেষ্ট বীজ উৎপাদনের বয়সে পৌঁছায়নি। ফলে আরেকবার ফিরে আসা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। প্রকৃতির পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেই ক্ষমতা কাজ করার জন্য সময়ও দরকার। (nps.gov)
অস্ট্রেলিয়ার ২০১৯–২০ সালের ‘ব্ল্যাক সামার’ দাবানলের পরও ফিরে আসার চিহ্ন দেখা গেছে। ভিক্টোরিয়ার আর্থার রাইলাহ ইনস্টিটিউটের নেতৃত্বে পরিচালিত মূল্যায়নে ২৮৭টি স্থানে জরিপ করে দেখা যায়, পর্যবেক্ষণ করা ১২৬টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে ১০৮টি চারা বা নতুন কুঁড়ির মাধ্যমে পুনরায় বেড়ে উঠছিল।
কিন্তু নতুন পাতা দেখা মানেই পুরো বন আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে, তা নয়। গবেষকেরা প্রাণীর আশ্রয়ের উপযোগী গাছের কোটরের ঘাটতি, আগ্রাসী প্রজাতি এবং আবার আগুন লাগার ঝুঁকির কথাও বলেছেন। (ari.vic.gov.au)
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচারের হিসাবে, ওই দাবানলে প্রায় ৩০০ কোটি প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সংখ্যাটি শুধু মৃত প্রাণীর হিসাব নয়; আগুনের প্রভাবের মুখে পড়া প্রাণীর আনুমানিক সংখ্যা। নিউ সাউথ ওয়েলসের গবেষণায় আবার দেখা গেছে, তীব্রভাবে পোড়া কিছু এলাকা থেকে সাময়িকভাবে হারিয়ে যাওয়া কোয়ালা এক বছরের মধ্যে ফিরতে শুরু করেছিল। এমন প্রত্যাবর্তন আশার খবর, যদিও পূর্ণ পুনরুদ্ধারের পথ অনেক দীর্ঘ। (wwf.nl, nsw.gov.au)
এই অভিজ্ঞতাগুলো বীজ ছড়ানোর মতো উদ্যোগের সম্ভাবনা ও সীমা দুটোই বুঝতে সাহায্য করে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের বনে দাবানলের পর বীজ ছড়ানো নিয়ে একটি গবেষণা-পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মাটিক্ষয় পরীক্ষা করা ২৭টি গবেষণার মধ্যে ২০টিতে বীজ ছড়িয়ে মাটিক্ষয় কমানোর সুফল মেলেনি। নিউ মেক্সিকোর আরেক গবেষণায় কিছু বীজ ছড়ানোর ব্যবস্থার কারণে স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসা উদ্ভিদের আচ্ছাদনে নেতিবাচক প্রভাব পাওয়া গেছে। (research.fs.usda.gov, onlinelibrary.wiley.com)
এসব গবেষণার পরিবেশ, ব্যবহৃত বীজ ও উদ্দেশ্য গুডইয়ারদের ফুলের প্রকল্পের সঙ্গে এক নয়। তাই এগুলো দিয়ে এই উদ্যোগকে সরাসরি সফল বা ব্যর্থ ঘোষণা করা যায় না। তবে বোঝা যায়, বীজ ছড়ানোকে সব পোড়া জমির জন্য একই সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
গুডইয়ারদের কাজের একটি বড় দিক মানুষের অভিজ্ঞতা। নিজেদের জমিতে আবার ফুল দেখা, কিছু করার সুযোগ পাওয়া, প্রতিবেশীর সঙ্গে সময় কাটানো তাঁদের জন্য অর্থবহ হয়েছে। এটিকে বন পুনরুদ্ধার বা দূষিত মাটি পরিশোধনের পরীক্ষিত বিকল্প হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন নেই। একটি ফুল বাড়ি হারানোর কষ্ট মুছে দিতে পারে না। কিন্তু সেই ফুলের যত্ন নিতে গিয়ে কেউ হয়তো আবার পরদিনের কথা ভাবতে পারেন।
সেই অনুভূতির জায়গা থেকে দেখলে লস অ্যাঞ্জেলেসের ঘটনাটি বাংলাদেশের পাঠকের কাছেও খুব দূরের থাকে না। এখানে দুর্যোগের চেহারা আলাদা। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারানোর অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। বিপর্যয়ের পর ঘর তোলার পাশাপাশি পাড়া, বাগান ও পরিচিত জীবনটাকেও নতুন করে গড়তে হয়।
স্কুলের শিক্ষার্থী, তরুণ, প্রবীণ ও প্রতিবেশীদের একসঙ্গে কোনো কাজে যুক্ত করা গেলে মানুষ নিজের এলাকার পুনর্গঠনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। কোথাও সেটি বাগান করা হতে পারে, কোথাও উপযুক্ত গাছের চারা তৈরি বা পরিচর্যা। কাজের মধ্য দিয়েই পরস্পরের খোঁজ নেওয়া এবং পাশে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বৃক্ষরোপণ উদ্যোগগুলোর ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা ভাবার সুযোগ দেয়। ১৩ জুন ২০২৬ দেশে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়। ঘোষিত প্রথম ধাপে ৪৯ জেলার ১৪৯ উপজেলায় দেড় কোটি চারা লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। (bdnews24.com)
এমন উদ্যোগে কত চারা লাগানো হলো, তার পাশাপাশি কোন গাছ কোথায় লাগানো হচ্ছে, কে পরিচর্যা করবে এবং কয়েক বছর পর কতগুলো টিকে থাকবে, সেই প্রশ্নগুলোও সামনে রাখা দরকার। ক্যালিফোর্নিয়ার জন্য উপযুক্ত ফুল বাংলাদেশের কোনো পাহাড় বা চরের জন্য উপযুক্ত হবে, এমন ধরে নেওয়া যায় না।
ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের উধমপুরে পায়ে পৌঁছানো কঠিন এলাকায় কেবল কার থেকে বীজ-বল ছড়ানোর উদ্যোগের খবরও পাওয়া গেছে। তবে কোনো পদ্ধতি ব্যবহার হয়েছে এবং সেই পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদে বন গড়ে উঠেছে, এ দুটি আলাদা বিষয়। (english.publictv.in)
বাংলাদেশে এমন পদ্ধতি বিবেচনা করা হলে স্থানীয় মাটি, পানি, ঋতু ও উদ্ভিদের ধরন বুঝে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ছোট পরিসরে পরীক্ষা করা যেতে পারে। কোথাও বীজ ছড়ানো কাজে আসতে পারে, কোথাও চারা লাগানো ভালো হতে পারে, আবার কোথাও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা গাছগুলো রক্ষা করাই বেশি জরুরি।
যে পরিবারটিকে ঘিরে এই উদ্যোগের শুরু, তাদের জীবনও এর মধ্যে নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। গুডইয়াররা প্রথমে প্যালিসেডসে নিজেদের বাড়ি আবার নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়ার কথা বিবেচনা করে পরে জমি বিক্রি করে সান্তা মনিকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবু বীজ-বলের কাজ বন্ধ করার ইচ্ছা নেই। বরং অন্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছেও উদ্যোগটি পৌঁছে দিতে চান তাঁরা। (reasonstobecheerful.world)
যে জমিতে তাঁদের বাড়ি ছিল, সেখানে ফিরে যাওয়ার অর্থ এখন কিছুটা বদলেছে। আগুনের স্মৃতি আছে, হারানোর কষ্টও আছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বীজ থেকে চারা ওঠা দেখা, পানি দেওয়া এবং ফুল ফোটার অপেক্ষা।
পোড়া মাটির সব ক্ষত একসঙ্গে সারে না। মানুষেরও সারে না। তবু ওই জমিতে ফুটে ওঠা ফুলগুলো গুডইয়ারদের এমন কিছু দিয়েছে, যার জন্য তাঁরা আবার সেখানে ফিরতে চেয়েছেন।
তথ্যসূত্র: রিজনস টু বি চিয়ারফুল, দ্য সিড বম্ব প্রজেক্ট, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও সরকারি প্রকাশনা এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যম।
লেখক: আইরিন পারভিন খান
যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

