বর্তমানে কাশ্মীর বেশ আলোচিত বিষয় । কিছুদিন পূর্বেই ছিলো রোহিঙ্গা , তার পূর্বে ছিলো সিরিয়া। এভাবে ক্রমানুসারে অনেকদূর যাওয়া যাবে। তবে একটি ঘটনা আর একটিকে মাটি চাপা দিয়ে দেয়, এটাই নির্মোহ সত্য । তারপরেও নিজ ঘরের আগুনই আমাদের বড় সমস্যা, আর সেটা হলো রোহিঙ্গা । কাশ্মীর নিয়ে আমাদের দেশ থেকেও অনেক বলা হচ্ছে, লেখা হচ্ছে এবং আরো হবে, সেটা ঠিক আছে। কেউ কেউ তো রীতিমতো জান দিয়ে দিবে, প্রাণ দিয়ে দিবে, পারলে এখনই কাশ্মীরের পক্ষে যুদ্ধে চলে যায় । ভাবটা এমন যে, কাশ্মীর এক্কেবারে ঘরের পাশে! বেশ ছুটেই চলে যাবে ঈমানী আকিকাদ নিয়ে । অথচ এদের কাশ্মীরের হাজার বছরের ইতিহাস কতটুকু জানা আছে, সেটা অনেক বড় প্রশ্ন বটে। তাদের মূল চিন্তাধারা কাশ্মীরিরা মুসলমান, বেশ সাতখুন মাপ। এই কাশ্মীর যে ৭১ এ আমাদের স্বাধীনতা বিরোধী ছিলো, সেটা এখন কোনো বিষয়ই না ! অথচ এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের অন্য প্রান্তে সিরিয়ায় , ইয়েমেনে লাখো লাখো মুসলমানদের মুসলমান ভাইয়েরাই হত্যা করছে ! সেই বিষয়ে এদের ঈমানী আকিকাদ উগলে পড়ে না। কেননা সেখানে যে মুসলিম বিশ্বের পাক পবিত্র দেশ, স্বয়ং আরাবারা জড়িয়ে আছে। সুতরাং সব হালাল! এই কাশ্মীরে যখন মানুষ হত্যা ( প্রথমেই বলে নেই মানুষ হত্যা, মুসলমান দ্বিতীয় অধ্যায় ) চলছে, ঠিক সেই সময়েই মুসলমানদের পবিত্র ভূমি থেকে রাষ্ট্রিয় সম্মাননা মোদির হাতে তুলে দিচ্ছে! অথচ সেই কথিত জান দেওয়া ওয়ালারা এটা নিয়ে টুশব্দ করছে না। কেননা তাতে যে নিজেদের অর্থনৈতিক ঘরে বাজ পরবে। তাছাড়া পবিত্র মাটি থেকে যা হয়, সেটা নিশ্চয়ই সঠিক বলেই ধরে নেওয়া ছোয়াব নিশ্চয়ই !! কাশ্মীর প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে, আর আরাবারা তো প্রায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার দূরে, সেখানেও সেই সব প্রাণ দেওয়া ওয়ালারা যুদ্ধে যাবে কিনা ? সেই প্রশ্ন তোলাই অবান্তর মাত্র ।
কাশ্মীর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সংবিধানের আলোকে কি হওয়া উচিত সেটা একবার লিখেছিলাম বলে সেই দিকে আর যাচ্ছি না। তবে আমরা কথায় কথায় একটা কথা বেশ বলে থাকি, ” মন্দের ভালো ” ! যদিও এটা একটা বাজে আদর্শের কথা। সেই মন্দের ভালো তো দেখছি মোদি নিজেই! আমার এই ব্যাখ্যা আবার কেউ নিজের মত করে ইন্টারপ্রিটেশন করবেন না, প্লিজ। মোদি কিন্তু তার নির্বাচনী ইস্তাহারে ঘোষণা দিয়েছিলো, জয়ী হলে সে কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল করবে এবং স্পষ্ট করে বলেছিলো, কাশ্মীর নিয়ে তার কর্ম কি হবে। তারপরেও সে কাশ্মীরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জয়ী দল! বলাই যায়,মোদি তার নির্বাচনী ওয়াদা পালন করছে। এখন প্রশ্ন হলো সে কিভাবে পালন করছে ? এই ওয়াদার দিক দিয়ে তো সে এককাট্টা রাজনীতিবিদ বলা যায় । আন্তত রাজনীতিবিদরাও যে ওয়াদা পালন করে ! মন্দের ভালো তো মোদিকেই বলতে হয়। কেন কথাটি বললাম, কাশ্মীরে কিন্তু পাকিস্তানও কম অত্যাচার করে নি! আজকে লিখতে গিয়ে কথা প্রসঙ্গে কাশ্মীর চলে এসেছে, মূলত বলতে চাচ্ছি আমাদের ঘরের আগুন নিয়ে, রহিঙ্গা নিয়ে । কাশ্মীরে কি হচ্ছে, তার চেয়েও আমাদের সমস্যাই আমাদের জন্য প্রথম।
গত দুদিন পূর্বে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে অনেক ব্যবস্থা সরকার করেছিলো। অথচ একজন রোহিঙ্গাও ফেরত পাঠানো সম্ভব হলো না। এদিকে আবার গতকালই পত্রিকায় দেখলাম প্রায় চারলাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে এক বিরাট সমাবেশ করেছে! প্রথম প্রশ্ন হলো , এই সমাবেশ তারা করতে পারে কিনা ? দ্বিতীয়, সরকার নাকি জানেই না রোহিঙ্গারা সমাবেশ করবে!( পররাষ্ট্র মন্ত্রী)। তৃতীয়, ওদের এত সাহস হলো কি করে ? জানি, এই সব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মিলবে না । তবে একটু দেখার চেষ্টা করি, রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থান । পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাষ্যেনুযায়ী এই রোহিঙ্গাদের জন্য কতগুলো এনজিও কাজ করছে। তারা ইতিমধ্যেই নয় হাজার কোটি টাকার উপর অনুদান এনেছে এবং এনজিও গুলো নিজেরা রাজার হালে হোটেল/মোটেলে আছে। ভাসানচড়ে সরকার যে ২৩ হাজার ফ্যামিলির থাকার বন্দবস্ত করতে চেয়েছিলো , এই সকল এনজিওদের কারণেই সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারে নি! তাহলে প্রশ্ন চলে আসে, এই সকল এনজিওদের পিছনে কোন শক্তি কাজ করছে যে, সরকারও এদের সাথে পারছে না ! আবার শোনা যায় বা পত্র-পত্রিকায় এসেছে, এখানে তথাকথিত ইসলামীক দলগুলোর বেশ আনাগোনা চলছে। যারা এই স্বাধীন দেশে অনেকবার জঙ্গি তৎপরতা চালিয়েছে। বড় ভাবনার বিষয় হলো, এই রোহিঙ্গারা না আবার জঙ্গি তৈরির কারখানা হয়ে যায় , যা ইতিমধ্যেই অনেকটা আচরণ লক্ষণীয় । আজকের পত্রিকায় দেখলাম, পাঁচ হাজারের উপরে চাপাতি ধরা পড়েছে, যা রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি হয়েছে , সাপ্লাই দেবার জন্য ! এই রোহিঙ্গারা ইতিমধ্যেই অনেক দেশিও লোকদের হত্যা করেছে, যেখানে ডাক্তার থেকে রাজনীতির মানুষ আছে। গত তিনদিন পূর্বেই ছাত্রলীগের আঞ্চলিক এক সভাপতি কে কুপিয়ে হত্যা করেছে! তাহলে বুঝাই যাচ্ছে আগামীতে কি হতে যাচ্ছে! সরকার নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে নেই, তবে এদের রশি এখনই শক্ত হাতে টেনে না ধরতে পারলে , সামনে বড় বিপদ আসবেই।
উপরে যা বললাম, সেখানে রোহিঙ্গাদের সমাবেশ আর চাপাতি কাহিনী ছাড়া তেমন কিছু নতুন বিষয় নাই বা এগুলোও সবাই জেনে গেছে নিশ্চয়ই । এখন যা লিখবো, তা হলো ক্ষেত্র বিশেষে অতি আদর্শের কিছু বাজে ফলাফলের কথা । কথায় বলে “যেমন কুকুর তেমন মুগুর” প্রয়োজন । রোহিঙ্গাদের বিপদের সময় আমাদের আশ্রয় পেয়েছে। এটা ওরা যেহেতু মাথায় রাখছে না! সুতরাং আমাদেরকে এখন সেরকমটাই ব্যবস্থা গ্রহণের চুড়ান্ত সময় হয়েছে। সেটা যদি বল প্রয়োগ করতে হয়, ধারণা করি দেশের জনমানুষ তার বিপরীতে কোনো আপত্তি করবে না । কেননা পরিবেশ তো পুরোটাই গেছে, সামনে না আবার জঙ্গির আখড়া হয়ে উঠে। এদিকে শোনা যাচ্ছে বা ঘোষণা এসেছে, মার্কিন মূল্লুকের প্রেসিডেনট আফগানিস্তানে তালেবানদের সাথে সমঝোতায় এসেছে। মার্কিন মূল্লুকের সব সেনা ফেরত নিবে। তাহলে যে ভবিষ্যতে জঙ্গির কি অবস্থা হবে, তা অদূর ভবিষ্যতেই টের পাওয়া যাবে বলেই মনে হচ্ছে। বলছিলাম অতি আদর্শের কথা । ২০১৭ সালে যখন দেশে রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করলো, তখন নাফ নদীতে সরকার বেশ জোড়ালো পাহারাই বসিয়েছিলো। এমনকি সেখানে গুলি বিনিময় করে রোহিঙ্গাদের দু-চারদিন প্রবেশের বাঁধাও দিয়েছিলো বা ঠেকিয়ে রেখেছিলো। আজকে সেই সময়কার দেশের বামদের কিছু ভাষ্যে বেশ মনে পড়ছে। নাম ধরে ধরে বলতে পারবো সেই সকল বাম নেতাদের কথা ( তারপরেও নাম বললাম না), সেই সময়ে বাম নেতারা কি কঠিন ভাষায় সরকারের সমালোচনা করেছিলেন। এমনকি ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ টেনে এনে কি তাত্ত্বিক কথাই না বাম নেতারা বলেছিলেন! বাম আদর্শ আমার নিজের হৃদয়কেও আঁকড়িয়ে আছে। তবে এই বামদের শুধু আদর্শের বাহাবা ছাড়া কর্মের কোনো ফলাফলই নাই। সেই সময়ের বাম নেতারা আজকে রোহিঙ্গা বিষয়ে তেমন জোরালো কথা বলেন না বা তত্ব ফলান না ! অনেকেই ভাবছেন , আমি হঠাত্ কেন বামদের উপর চড়াও হচ্ছি ? চড়াও হচ্ছি না, তবে এখন রোহিঙ্গাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বামদের তত্ব মার্কা কথাবার্তা দেখিনা বলেই এই প্রশ্ন মনে জাগছে। কিছু কিছু বাম নেতা এখনও মাঝে মাঝে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ উঠলে কথা বলেন বটে। তখন ওনারা কূটনীতিক বিষয়ে জোর দেবার কথা বলেন। কোন কোন দেশকে সাথে নিয়ে কাজ করতে হবে ? তা বলেন বটে। তবে সেই সকল দেশকে যে সাথে নিয়ে কাজ হচ্ছে না ব তাদের আগ্রহ নেই, সেটা বুঝতে চান না । বরং এখনও সরকারকেই দোষারোপে ব্যস্ত । সরকার কূটনীতি বুঝে না বা পারে না ! আমি সরকারে থাকলে ঘোষণা দিয়ে বড় বড় বাম নেতাদের ডেকে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য কূটনীতি তৎপরতায় তাদের দায়িত্ব দিয়ে দিতাম। দেখতাম , তারা তত্বের সাথে কর্মের কি মিল ঘটাতে পারে। কথা বলা যেমন সহজ , কর্ম যে তারচেয়ে কঠিন, এটা বামদের বুঝাবার ক্ষমতা কারো আছে বলে মনে হয় না। কেননা , অতি তাত্ত্বিকেরা তত্বেই ডুবে থাকে, কর্মের বেলায় শূন্য । নাফ নদীতে যখন সরকার গুলি চালিয়েছিলো, সেই সময়ের বাম নেতাদের ভাষ্য আর আজকের রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বাম নেতাদের স্পষ্ট ভাষ্য কি ? হৃদয়ে বাম আদর্শ যাদের বহমান, তারা নিশ্চয়ই এই প্রশ্ন করার অধিকার রাখে। এমনকি একজন সাধারণ জনগণ হিসেবে কি প্রশ্ন করা যাবে, বামদের সেই সময়ের ভাষ্য নিয়ে এবং আজকে তাদের কার্যক্রম নিয়ে । আরো স্পষ্ট করে বলি, সেই সময়ে সরকারকে বাম নেতারা অনেকটা অতিষ্ঠ করে ফেলেছিলো , রোহিঙ্গা নিয়ে অতি আহ্লাদি কথাবার্তা দিয়ে । সরকার কেন গুলি চালালো? এই প্রশ্ন নিয়ে অনেক কথা এই বামেরাই তখন বলেছিলেন। এখন রোহিঙ্গাদের কর্ম নিয়ে একেবারেই চুপ! এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, এই রোহিঙ্গারা যদি আরোও উগ্র হয়ে দেখা দেয়, এই অতি তত্বের বামেরা তখনও নানা অজুহাতে সরকারকেই দোষারোপ করে যাবে। সরকারের কূটনীতির সমালোচনা করে যাবে। নিজেদের আদর্শের চোরাবালির দোষ নিশ্চিত দেখবে না। তাই বলছিলাম কুকুর/মুগুরের কথা। শুধু আদর্শ অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। সময়ের সাথে আদর্শেরও রিপিয়ার কখনো কখনো অতি জরুরী হয়ে দেখা দেয়।
আর একটি কথা , কিছু বাম নেতা সেই সময়ে মাননীয় শেখ হাসিনার নোবেল লোভের কথা ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছেন, আজকে তাদের ভাষ্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন নিশ্চয়ই । কেননা তত্বের রাজনীতি করা মানুষদের নিজেদের ভাষ্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা উচিত নিশ্চয়ই । আওয়ামী লীগের নেতারা সরাসরি বলতেন শেখ হাসিনার এই মানবিকতার জন্য নোবেল পাওয়া উচিত । একজন আওয়ামী লীগার হিসেবে সেটা বলতেই পারেন। তবে রহিঙ্গাদের আশ্রয় সরকার যে চাপে পরেই দিয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই এতদিনে স্পষ্ট । এখন সেই চাপকে যে করেই হোক উপেক্ষা করেই অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবার চুড়ান্ত সময় । আমি নিশ্চিত যে, রোহিঙ্গাদের কর্মে জনমানুষ অতিষ্ঠ, সরকার নিজেও অতিষ্ঠ, সুতরাং এখনই সময় কঠিন হবার।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম।

