দিঘলিয়া দেয়াড়া গণহত্যা দিবস

কাজী সালমা সুলতানা :১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা যে গণহত্যা চালিয়েছিলো তা ইতিহাসে বিরল ।  মাত্র নয় মাসে ত্রিশ লক্ষ মানুষ কোন যুদ্ধে হত্যা হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। শৃধু তাই নয় হত্যার সাথে নির্যা করা হয়েছে ছয় লক্ষেরও  বেশি নারীকে। এছাড়া নিপীড়িত হয়েছে অসংখ্য মানুষ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় দোসররা কত ঘরবাড়ি ভস্মীভূত করেছিল তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কত যে নারকীয় হত্যাকান্ড ঘটেছে তারও হিসাব পাওয়া কঠিন ছিল। এসব হত্যাকান্ডের অধিকাংশই ঘটেছে রাজাকার, আল-বদর, আল-সামসদের সহায়তায়। এক রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও পাকিস্তানিদের পক্ষে সম্ভব ছিল না দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে হত্যাকান্ড ঘটানো। এমনি একটি নারকীয় হত্যাকান্ড ঘটে ১৯৭১ সালের ২৭ আগস্ট খুলনা থেকে ৫ কি মি দুরে দিঘলিয়ার দেয়াড়া গ্রামে। 

 ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। গোটা দেশে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ যুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের  হটিয়ে দিতে শুরু করেছে। দেশীয় দালাল রাজাকার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে ফিরছে। 

২৭ আগস্ট ভোরবেলা। সবে দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। এমনি সময় দেয়াড়া গ্রামে রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা  পাকিস্তানী সেনাদের নিয়ে হামলে পড়ে। পাকিস্তানী সেনা ও তাদের সহযোগী রাজাকাররা পিপলস্ জুটমিলের খেয়াঘাট পার হয়ে এপারে আসে। সেনহাটি পার হয়ে তারা দেয়াড়ায় এসে পৌছায়। ভোর রাতেই কয়েকশ রাজাকার,  বিহারী ও পাকিস্তানী সেনা সদস্যরা  গোটা দেয়াড়া গ্রামটি ঘিরে ফেলে । তারা মুক্তিযোদ্ধা আবদারের  নাম ধরে খুঁজতে থাকে । কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হতাস আক্রমনকারীরা প্রতিশোধের নেশায় মেতে ওঠে।  প্রথমে তারা মুক্তিযোদ্ধা আবদারের বাবা ডাঃ মতিয়ার রহমানকে ধরে নেয়। তারপর একে একে সেই পরিবারের আরো ছয় জনকে ধরে। 

সে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন। আক্রমনকারীরা  ডাঃ মতিয়ার রহমান , তার চাচাতো ভাই পিরু ও আলী, ভাগ্নে ইসমাঈল হোসেন ছোট খোকা, জামাই আব্দুল জলিল, সহোদর আব্দুল বারিক, হোসেন সরদার, মোঃ আজিম হোসেন, সাত্তার শেখ ও পরে মানিককে ধরে নিয়ে যায়। তার চাচাতো ভাই,ভাগ্নে,জামাই ও তার সহোদরকে  রাস্তায় এনে সেখানেই তাদেরকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। এরপর তারা গ্রামের যুবকদের কে ধরা শুরু করে। সেদিন মোট ৬১ জন  যুবক ও বয়স্কমানুষকে গুলি ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে একজন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। গোটা গ্রামে মানুষের আর্তনাত চিৎকার গুলির শব্দে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরী হয়।

পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকারদের  হাতে ধৃত ৬১ জনের মধ্যে ৬০ জন ঘটনাস্থলেই মৃত্যু বরণ করে। এদের ৩৮ জনের লাশ ভৈরব নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।  বাকি ২২জনকে তিনটি গণকবরে চাপা দেওয়া হয়। বাকি একজন সারা শরীরে ১৯টি আঘাত নিয়েও বেঁচে যান। আজও তিনি সেই ভয়ঙ্কর দিনকে স্মরণ করে শিউরে উঠেন। 

শরীরে ধারালো  অস্ত্রের ১৯টি ক্ষত যন্ত্রনা নিয়ে আজো বেঁচে আছেন সৈয়দ আবুল বাসার। রাজাকাররা তাকে হত্যার জন্য অন্যদের সাথে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়েছিলো। কিন্তু গুলি তার গায়ে লাগেনি।  তিনি মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে ছিলেন। হঠাৎ করে একজন রাজাকারের চোখে পড়ে তার শরীর থেকে কোন রক্ত বের হয় নি। তখন সে অস্ত্র নিয়ে কুপিয়ে তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়।

 সৈয়দ আবুল বাসারের কিশোর ছেলে মৃত ভেবে তার বাবাকে উদ্ধার করে। পরে যখন বুঝতে পারে তার বাবা বেঁচে আছে তখন  আহত বাবাকে সে লুকিয়ে রাখে এবং এক সহৃয়বান ব্যক্তির সহায়তায় তাকে খুলনা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সুস্থ হবার পরও তাকে অনেক দিন লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো কারন যদি রাজকাররা জানতে পারতো তিনি বেঁচে আছেন তবে আবার আক্রমনের সম্ভাবনা ছিলো । স্বাধীনতা পরবর্তী ৩৮ বছর পর ২০১১ সালের প্রথম দিকে একটি কারখানা গড়ার সময় এই কবরটি চিহ্নিত হয়। পরবর্তীতে কবরকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থানন্তর করা হয়। খুলনা সার্কেট হাউজের পিছনে হেলি প্যাডের বিশ্রামগারটি  ছিলো পাকিস্তানী বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র, তার স্মৃতিচিহ্ন এখন আর নেই। 

স্বজন হারানোর বেদনা  কখনো ভোলা যায় না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা স্বজন সম্পদ হারিয়েছেন তাদের দুঃখ যন্ত্রণা কখনো ভুলে যাবার নয়।  এমন অসংখ্য হত্যাকান্ড ঘটেছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে। অসংখ্য প্রাণের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের মহান স্বাধীনতা। আজকের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি দেয়াড়া গণহত্যার শিকার সেসব শহীদকে। শ্রদ্ধা জানাই খুলনা ও দেয়াড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি।

কৃতজ্ঞতা:১৯৭১ গণহত্যা ও নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট।

কাজী সালমা সুলতানা

গণমাধ্যমকর্মী ।

 

     

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.