কলকাতা: পারস্যের প্রখ্যাত কবি হাফিজের স্মরণে পালিত হাফিজ দিবস উপলক্ষে গত ১২ অক্টোবর কলকাতার ইরান সোসাইটিতে আয়োজিত হল এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ছায়ানট (কলকাতা)-র উদ্যোগে এবং সোমঋতা মল্লিকের ভাবনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘তরুণ ইরান-কবি কাঁদে নিরজনে’। কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সঙ্গীতে ইরানীয় সংস্কৃতি, পারস্যের কবিতা এবং সুফি দর্শনের প্রভাবকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছিল দু’ঘণ্টার এই অনুষ্ঠান।
সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে আলোচনা, কবিতা পাঠ ও সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয় বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পারস্যের ঐতিহ্যের নিবিড় সম্পর্ক। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইরান সোসাইটির সভাপতি মোহাম্মদ মানসুর আলম এবং ছায়ানট (কলকাতা)-র সভাপতি সোমঋতা মল্লিক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘পুবের কলম’ পত্রিকার সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আহমদ হাসান ইমরান, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াএজুল হক এবং লেখক ও সঞ্চালক মনিরুল ইসলাম। তাঁদের বক্তব্যে নজরুলের সৃষ্টিতে ইরানীয় প্রভাবের বিভিন্ন দিক উঠে আসে। ছায়ানটের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের প্রশংসাও করেন অতিথিরা।
নজরুলের অনুবাদে হাফিজ ও ওমর খৈয়াম
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল কাজী নজরুল ইসলামের অনূদিত ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ এবং ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ থেকে কবিতা পাঠ। ছায়ানট (কলকাতা)-র বাচিকশিল্পী তিস্তা দে, সোমা রায়, অন্বেষা মুখার্জী, দেবলীনা চৌধুরী, শর্মিষ্ঠা রায়, পারমিতা চৌধুরী, পিয়ালী ঘোষ, মৌমিতা ঘোষ ও অনিন্দিতা ঘোষ আবৃত্তির মাধ্যমে পারস্যের কবিতার ভাব ও দর্শন শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন।
প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর পর নজরুলের অনূদিত ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ প্রকাশিত হয়। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর প্রিয় পুত্রকে। গ্রন্থটির মুখবন্ধে হাফিজকে নিজের ‘প্রিয়তম ইরানী কবি’ বলে উল্লেখ করে নজরুল লিখেছিলেন, “যে পথ দিয়ে আমার পুত্রের ‘জানাজা’ (শব-যান) চ’লে গেল, সেই পথ দিয়ে আমার বন্ধু, আমার প্রিয়তম ইরানী কবি আমার দ্বারে এলেন। আমার চোখের জলে তাঁর চরণ অভিষিক্ত হ’ল।”
এই মর্মস্পর্শী বক্তব্যে ব্যক্তিগত শোকের সঙ্গে কবিতার আশ্রয়ে সান্ত্বনা খোঁজার এক অনন্য অভিজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে। নজরুল মূল ফার্সি থেকেই হাফিজের রুবাইয়াৎ অনুবাদ করেছিলেন। হাফিজের কবিতায় প্রেম, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার যে বহুমাত্রিক প্রকাশ, তা নিয়েও নিজের মতামত জানিয়েছিলেন তিনি।
নজরুলের মতে, হাফিজের রুবাইয়াৎ তাঁর কাব্যজগতের ক্ষুদ্র পরিসর হলেও তার মধ্যে বৃহত্তর ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে। ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’-এর মুখবন্ধে তিনি রুবাইয়াতকে এমন এক ক্ষুদ্র বিম্বের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, যার মধ্যে সমগ্র আকাশের গ্রহ-তারার প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে। তাঁর এই উপলব্ধি থেকে বোঝা যায়, পারস্যের কবিতার প্রতি নজরুলের আকর্ষণ নিছক অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ছিল গভীর সাহিত্যিক ও মননশীল সংযোগের প্রকাশ।
নজরুল-সঙ্গীতে পারস্যের সুর ও অনুষঙ্গ
কবিতা পাঠের পাশাপাশি সঙ্গীতের আয়োজনও ছিল অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সোমঋতা মল্লিকের পরিচালনায় সমবেতভাবে পরিবেশিত হয় দুটি নজরুল-সঙ্গীত, যেখানে ইরানের প্রসঙ্গ এসেছে অথবা পারস্যের সুরের প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। ‘পরি’ জাফরানি ঘাগরি’ এবং ‘বুলবুলি নীরব নার্গিস-বনে’ গান দুটি পরিবেশন করেন চম্পা মিত্র, বিচিত্রা ঘোষ, নন্দিনী নন্দী, স্বাতী ভট্টাচার্য, সোমা রায় বর্মণ, গৌরী ধর, চন্দ্রা মজুমদার ও সুরূপা মল্লিক।
এ ছাড়াও সোমঋতা মল্লিকের কণ্ঠে শোনা যায় একাধিক নজরুল-সঙ্গীত। ‘নাচে ইরানী মেয়ে’, ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’ এবং ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি’—গানগুলির নির্বাচনে অনুষ্ঠানের মূল ভাবনার প্রতিফলন ঘটে। পারস্যের সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ, প্রেম, প্রকৃতি ও কাব্যিক আবহের মধ্য দিয়ে নজরুলের সঙ্গীতজগতের বৈচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা ছিল এই পরিবেশনায়।
‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে নজরুলের অনুবাদকর্মের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে আলোচিত হয় ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’। গ্রন্থটির সচিত্র প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। এর ভূমিকা লিখেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী এবং চিত্রায়ণ করেছিলেন খালেদ চৌধুরী। ১৩৭০ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণে নজরুলের লেখা ‘ওমরের কাব্য ও দর্শন’ শীর্ষক রচনাটি প্রথমবার ভূমিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিদের হাতে ছায়ানট (কলকাতা)-র পক্ষ থেকে নজরুল-অনূদিত ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ তুলে দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে নজরুলের অনুবাদসাহিত্য ও পারস্যের কবিদের প্রতি তাঁর অনুরাগকে নতুন করে স্মরণ করার প্রয়াস নেওয়া হয়।
নজরুলের সৃষ্টিতে ইরানীয় সংস্কৃতির ঐতিহাসিক সংযোগ
নজরুলের সৃষ্টিতে পারস্যের প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী ছিল, তার ঐতিহাসিক প্রমাণও রয়েছে। আসাদুল হকের লেখা ‘নজরুল যখন বেতারে’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯৪০ সালের ১৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে বেতারে প্রচারিত হয়েছিল ‘ইরানের স্বপ্ন’ নামে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান। পারস্যের সুরের ওপর রচিত গান নিয়ে সাজানো ওই অনুষ্ঠানের রচনা ও সংগঠন করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং বর্ণনায় ছিলেন অনিল দাস।
এ ছাড়াও ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে—বর্তমান কফি হাউসে—নজরুলকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল বাংলার হিন্দু-মুসলমানের পক্ষ থেকে। সভার সভাপতি ছিলেন বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। ওই অনুষ্ঠানে কবির হাতে তুলে দেওয়া মানপত্রে বাংলা ও ইরানীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে নজরুলের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
মানপত্রে বলা হয়েছিল, “তুমি বাঙলার মধুবনের শ্যামা কোয়েলার কণ্ঠে ইরানের গুলবাগিচার বুলবুলের বুলি দিয়াছ।” এই কাব্যিক অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে নজরুলের সৃষ্টিতে বাংলার প্রকৃতি ও সংগীতের সঙ্গে পারস্যের কাব্যিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধনকে তুলে ধরা হয়েছিল।
নজরুলের সাহিত্য ও সঙ্গীতে ইরানীয় সংস্কৃতির প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এই ঐতিহাসিক পর্বগুলি নতুন তাৎপর্য পায়। হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের কবিতার অনুবাদ থেকে শুরু করে পারস্যের সুরে গান রচনা—নজরুলের সৃষ্টিশীলতার এই বিশেষ দিক বাংলা সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
দীর্ঘ ১৯ বছরের সাংস্কৃতিক পথচলায় ছায়ানট (কলকাতা)-র এই আয়োজন তাই ছিল নজরুলের সৃষ্টির এক বিশেষ অধ্যায়কে নতুন করে সামনে আনার প্রয়াস। হাফিজ দিবসকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান কবিতা, সঙ্গীত ও আলোচনার মাধ্যমে বাংলা ও ইরানীয় সংস্কৃতির ঐতিহাসিক সম্পর্ককে স্মরণ করিয়ে দিল।

