ফ্রান্সের মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নতুন প্রজন্মের অগ্রযাত্রা এবার আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ল প্যারিসে। মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে বিজয়ী পাঁচ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনপ্রতিনিধিকে সংবর্ধনা দিয়েছে প্যারিস-বাংলা প্রেসক্লাব ফ্রান্স। রোববার স্থানীয় সময় বিকেলে প্যারিসের বটতলা মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপস্থিতিতে এক আবেগঘন, গর্বের ও উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
সংবর্ধিত জনপ্রতিনিধিরা হলেন কৌশিক রাব্বানী, নাহিদুল মোহাম্মদ, ফাহিম মোহাম্মদ, জুবায়েদ আহমেদ এবং তানিয়া টুনু। কৌশিক রাব্বানী স্তার কাউন্সিলর, নাহিদুল মোহাম্মদ সাঁ-দেনির কাউন্সিলর, ফাহিম মোহাম্মদ ক্রেতেইয়ের কাউন্সিলর, জুবায়েদ আহমেদ ইভরি-সুর-সেনের কাউন্সিলর এবং তানিয়া টুনু গার্জ-লে-গোনেসের কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। গত ২২ মার্চের মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে তাঁরা জয়ী হন।
কৌশিক রাব্বানী স্থানীয় তরুণ সমাজকে নাগরিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। বহু সাংস্কৃতিক সামাজিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিবাচক প্রতিনিধিত্ব গড়ে তুলতেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
নাহিদুল মোহাম্মদ স্থানীয় সামাজিক উন্নয়ন, কমিউনিটি সংযোগ এবং অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজের মাধ্যমে এলাকায় পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
ফাহিম মোহাম্মদ তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ, শিক্ষা ও সামাজিক সংহতি নিয়ে কাজ করে স্থানীয়দের আস্থা অর্জন করেছেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় ছিল বহুজাতিক সমাজে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা।
জুবায়েদ আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
তানিয়া টুনু নারী নেতৃত্ব, সামাজিক সম্প্রীতি এবং প্রবাসী নারীদের অংশগ্রহণমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ফ্রান্সের স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর বিজয়কে অনেকেই অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে দেখছেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে ক্লাব নেতারা ফুল দিয়ে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরণ করে নেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন প্যারিস-বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এনায়েত হোসেন সোহেল, আর সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক রাসেল আহমেদ। প্রধান অতিথি ছিলেন ফ্রান্স-বাংলাদেশ বিজনেস ফেডারেশনের সভাপতি ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব সাত্তার আলী সুমন শাহ আলম।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্যারিস-বাংলা প্রেসক্লাবের গবেষণা ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফ্রান্সের সভাপতি চৌধুরী ছালেহ আহমেদ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ফ্রান্স সংসদের সভাপতি কিরণময় মন্ডল, সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন হাওলাদার, ‘প্রবাসে বাংলা’-এর সম্পাদক অধ্যাপক অপু আলম, বাংলাদেশ সাংবাদিক ইউনিয়ন ফ্রান্সের সভাপতি মান্নান আজাদ এবং ফ্রান্স-বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি দেবেশ বড়ুয়া।
এর পাশাপাশি বক্তব্য রাখেন ফরাসি মঞ্চাভিনেতা সোয়েব মোজাম্মেল, দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার ফ্রান্স প্রতিনিধি এম.সি রুমেল এবং ইউরো-বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি তাজউদ্দীন। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন প্যারিস-বাংলা প্রেসক্লাবের সহসভাপতি শিব্বির আহমদ, যুগ্ম সম্পাদক আবু তাহের রাজু, সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুর রহমান, দপ্তর সম্পাদক ফখরুজ্জামান এবং তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইকবাল মারুফ।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিকশিত নারী সংঘের সভানেত্রী সৈয়দা তৌফিকা সাহেদ, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন ফ্রান্সের সভাপতি নুরুল আবেদীন, জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মাহবুবুল আলম কয়েস, বৃহত্তর কুমিল্লা জনকল্যাণ সমিতির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম মিলন এবং এসএ ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান সাব্বির আহমদ। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে লেখক ও সাংবাদিক শাহাবুদ্দিন শুভকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। পরে অতিথিদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

বক্তারা বলেন, এই বিজয় কেবল পাঁচজন ব্যক্তির অর্জন নয়; এটি ফ্রান্সের মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের শক্ত অবস্থানের প্রতীক। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, নবনির্বাচিত এই জনপ্রতিনিধিরা স্থানীয় সরকারে বাংলাদেশি কমিউনিটির অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। সংবর্ধিত জনপ্রতিনিধিরাও অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, বিদেশের মাটিতে রাজনীতি করা এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করা সহজ ছিল না; তবে ফরাসি জনগণ, বাংলাদেশি কমিউনিটির সমর্থন, দোয়া ও নিরলস পরিশ্রমই তাঁদের এই সাফল্যে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁরা এই বিজয়কে বাংলাদেশের লাল-সবুজেরও বিজয় বলে অভিহিত করেন।

সভাপতির বক্তব্যে এনায়েত হোসেন সোহেল বলেন, প্যারিস-বাংলা প্রেসক্লাব প্রবাসে বাংলাদেশিদের সাফল্যের গল্প তুলে ধরতে সব সময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজন্ম যত বেশি মূলধারার রাজনীতিতে এগিয়ে যাবে, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ততই উজ্জ্বল হবে। আয়োজনে প্যারিস-বাংলা প্রেসক্লাবের ভূমিকাকে উপস্থিত বক্তারা প্রশংসা করেন; তাঁরা বলেন, শুধু এ ধরনের সংবর্ধনা আয়োজনই নয়, প্রবাসে বাংলাদেশিদের গঠনমূলক কাজ, সামাজিক সংহতি, সাংস্কৃতিক পরিচর্যা এবং নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রেও সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
রাকিবুল ইসলাম, শুদ্ধস্বর ডটকমের ফ্রান্স প্রতিনিধি।

