সাম্রাজ্যের স্বপ্ন থেকে সমাধির মাটি : আলেকজান্ডারকে জৈনদের শিক্ষা

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে বিশ্বের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর নাম হিসেবে আবির্ভূত হন ম্যাসিডোনিয়ার যুবরাজ আলেকজান্ডার। ইতিহাস তাকে “মহান আলেকজান্ডার” নামে স্মরণ করে। মাত্র ত্রিশ বছরের জীবনে তিনি গ্রিস থেকে শুরু করে মিশর, পারস্য, মধ্য এশিয়া অতিক্রম করে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু তার এই বিজয় অভিযানের মধ্যেই এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল যা সাম্রাজ্যবাদী অহংকারকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ভারত পরিক্রমার সময় জৈন দার্শনিকদের সঙ্গে আলেকজান্ডারের কথোপকথন তার অন্যতম একটি উদাহরণ।

ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভারত অভিযানের সময় আলেকজান্ডার ভারতীয় তপস্বী, দার্শনিক ও জ্ঞানীদের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। গ্রিক লেখক স্ট্র্যাবো, আরিয়ান ও প্লুটার্ক ভারতীয় “জিমনোসফিস্ট” বা নগ্ন দার্শনিকদের কথা উল্লেখ করেছেন। এরা মূলত ছিলেন তপস্বী, যাদের অনেকেই জৈন বা আজীবিক দর্শনের অনুসারী বলে মনে করা হয়। তারা বস্তুজগত, ক্ষমতা, ভোগ এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের ধারণাকে গভীর সংশয়ের চোখে দেখতেন।

একটি বহুল প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, আলেকজান্ডার একদল জৈন দার্শনিককে প্রশ্ন করেছিলেন— কেন তারা তার মতো বিশ্বজয়ীর প্রতি এত কম গুরুত্ব দিচ্ছেন? উত্তরে তারা বলেছিলেন, “রাজা আলেকজান্ডার, প্রতিটি মানুষের অধিকারে ততটুকু ভূমিই থাকে যতটুকুর উপর সে দাঁড়িয়ে আছে। তুমিও আমাদের মতোই একজন মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নও। তুমি নিজের দেশ ছেড়ে বহু পথ পাড়ি দিয়ে এসেছ, অথচ তোমার দ্বারা মানুষের মঙ্গল হয় না। তুমি নিজের কাছেও এক আপদ, অন্যের কাছেও। মৃত্যুর পরে তোমার প্রয়োজন হবে কেবল সেইটুকু জমি, যতটুকু তোমাকে সমাধিস্থ করার জন্য দরকার।”

এই বক্তব্য শুধু একজন সম্রাটকে উদ্দেশ করে বলা দার্শনিক উক্তি ছিল না; এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদ, ভূমি দখল এবং ক্ষমতার অহংকারের বিরুদ্ধে এক গভীর মানবিক প্রতিবাদ। জৈন দর্শনের মূল ভিত্তি অহিংসা, অনাসক্তি ও সীমিত ভোগ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বজয়ের ধারণা ছিল এক ধরনের আত্মবিনাশী লোভ। জৈন দার্শনিকরা বুঝেছিলেন, যে মানুষ সীমাহীন ক্ষমতার নেশায় আক্রান্ত হয়, সে শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরের শান্তিকেও ধ্বংস করে।

আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ সালে। পারস্য সাম্রাজ্য ধ্বংস করার পর তার লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর “অজানা পূর্বাঞ্চল” জয় করা। আফগানিস্তান অতিক্রম করে তিনি হিন্দুকুশ পর্বতমালা পেরিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রবেশ করেন। সে সময় এই অঞ্চলটি ছিল অসংখ্য ক্ষুদ্র রাজ্য ও গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। তক্ষশীলার রাজা অম্ভি আলেকজান্ডারের সঙ্গে মিত্রতা করেন। কিন্তু সবাই তার কাছে আত্মসমর্পণ করেনি।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ সালে হাইডাসপিস বা ঝিলম নদীর তীরে আলেকজান্ডারের সঙ্গে রাজা পুরুর ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। গ্রিকদের কাছে তিনি ছিলেন “পোরাস” নামে পরিচিত। পুরু ছিলেন সাহসী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শাসক। তার বিশাল হাতির বাহিনী ম্যাসিডোনীয় সেনাদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পুরু পরাজিত হলেও তার বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে আলেকজান্ডার তাকে পুনরায় রাজত্ব ফিরিয়ে দেন। এই ঘটনাকে অনেকে আলেকজান্ডারের উদারতার নিদর্শন হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এটি ছিল রাজনৈতিক কৌশল। ভারতীয় ভূখণ্ডে স্থায়ী কর্তৃত্ব বজায় রাখতে স্থানীয় রাজাদের সহযোগিতা তার প্রয়োজন ছিল।

ভারত অভিযানের সময় আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী ক্রমশ ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে পড়েছিল। বছরের পর বছর যুদ্ধ, দীর্ঘ পথযাত্রা, অচেনা জলবায়ু এবং অবিরাম রক্তপাত সৈন্যদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। যখন তারা শুনতে পেল সামনে আরও বিশাল সাম্রাজ্য, আরও শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং গঙ্গা অববাহিকার অসীম ভূখণ্ড অপেক্ষা করছে, তখন তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বিয়াস নদীর তীরে এসে আলেকজান্ডার বাধ্য হন ফিরে যেতে।

এই প্রত্যাবর্তন ছিল ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। যে মানুষ নিজেকে বিশ্বের অপ্রতিরোধ্য বিজেতা ভাবতেন, তাকেও শেষ পর্যন্ত নিজের সৈন্যদের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছিল। এখানেই জৈন দার্শনিকদের কথার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষ যত বড় সাম্রাজ্যই গড়ে তুলুক, তার ক্ষমতার সীমা রয়েছে। ইতিহাসের প্রতিটি সাম্রাজ্য একসময় ভেঙে পড়ে, কিন্তু মানুষের লোভ ও দখলদারিত্বের মানসিকতা বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে।

ভারত থেকে ফেরার পথে আলেকজান্ডার সিন্ধু নদ হয়ে আরব সাগরের দিকে অগ্রসর হন। তার সেনাবাহিনীর একটি অংশ নৌপথে যায়, অন্য অংশ ভয়াবহ গেদ্রোসিয়ান মরুভূমি অতিক্রম করে। এই পথে অসংখ্য সৈন্য মারা যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ সালে ব্যাবিলনে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়। তখন তার বয়স মাত্র বত্রিশ বছর। মৃত্যুর পর তার বিশাল সাম্রাজ্য দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং তার সেনাপতিদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়।

এই পরিণতি জৈন দার্শনিকদের কথাকেই যেন সত্য প্রমাণ করে। মানুষ শেষ পর্যন্ত যতটুকু ভূমি নিয়ে যেতে পারে, তা তার কবরের মাপের বেশি নয়। অথচ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যুগে যুগে মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও সভ্যতাকে ধ্বংস করেছে আরও বেশি জমি, সম্পদ ও আধিপত্যের লোভে।

আজকের পৃথিবীতেও সেই বাস্তবতা বদলায়নি। আধুনিক রাষ্ট্র, কর্পোরেট শক্তি কিংবা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলোর অনেকের মধ্যেই আমরা একই দখলদার মনোভাব দেখতে পাই। ভূমি দস্যুতা, নদী দখল, বন উজাড়, আদিবাসী উচ্ছেদ কিংবা দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন— সবকিছুর পেছনেই রয়েছে সীমাহীন ক্ষমতা ও সম্পদের লালসা। জৈন দার্শনিকদের সেই সতর্কবাণী তাই আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে ক্ষমতা ও ভূমি দখলের রাজনীতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রভাবশালী গোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জমি দখল করছে, নদী ভরাট করছে, বন কেটে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ও মানুষের অস্তিত্বকে বিপন্ন করা হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস শেখায়, দখলদারিত্ব কখনও স্থায়ী হয় না। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি শেষ পর্যন্ত নিজেদের ভেতরকার লোভের কারণেই ধ্বংস হয়।

আলেকজান্ডারের ভারত পরিক্রমা শুধু সামরিক অভিযানের ইতিহাস নয়; এটি মানবসভ্যতার আত্মজিজ্ঞাসারও একটি অধ্যায়। একদিকে ছিল বিশ্বজয়ের উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে ছিল জৈন দার্শনিকদের সংযম, অনাসক্তি ও মানবিক বোধ। এই দ্বন্দ্ব আজও বিদ্যমান। পৃথিবী আজ প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও ক্ষমতার লিপ্সা, যুদ্ধ এবং দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হতে পারেনি।

সম্ভবত এ কারণেই আলেকজান্ডারের চেয়ে সেই নামহীন জৈন দার্শনিকদের কথাই ইতিহাসে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ তারা আমাদের মনে করিয়ে দেন, মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব দখলে নয়, বরং সংযমে; আধিপত্যে নয়, বরং মানবকল্যাণে। সাম্রাজ্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানবিক সত্য চিরস্থায়ী।

ইতিহাসের দীর্ঘ পথে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন জাগে— মানুষ কি এখনও সেই প্রাচীন সতর্কবাণী শুনতে প্রস্তুত? নাকি আমরা এখনও নতুন নতুন সাম্রাজ্যের মোহে নিজেদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে চলেছি? আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান আমাদের সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, এবং জৈন দার্শনিকদের কণ্ঠ আজও সময়ের ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়— মানুষের প্রয়োজন শেষ পর্যন্ত খুব সামান্য, কিন্তু তার লোভ সীমাহীন।

হাবিব বাবুল

প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.