জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে পবিত্র ঈদ উপলক্ষে প্রবাসী বাংলাদেশি ও অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্যোগে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মুসল্লির উপস্থিতিতে ঈদের জামাতগুলো পরিণত হয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মিলনমেলায়। শহরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত তিনটি বড় জামাতের আয়োজন করা হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে আয়োজিত জামাতগুলো ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এর মধ্যে অন্যতম ছিল Ronneburg Saalbau হলে অনুষ্ঠিত ঈদের জামাত। সকাল থেকেই নানা বয়সী প্রবাসী বাংলাদেশিরা পরিবার-পরিজন নিয়ে নামাজে অংশ নিতে হলে ভিড় জমাতে থাকেন। ঈদের নামাজ শেষে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং প্রবাস জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। দীর্ঘদিন পর অনেকেই পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ পান, যা প্রবাসের একাকীত্বের মধ্যে এনে দেয় স্বস্তি ও আনন্দ।
ঈদের নামাজের আগে প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক কামাল হোসেন ভুঁইয়া। বক্তব্যে তিনি ফ্রাঙ্কফুর্টে -এ একটি সার্বজনীন বাংলাদেশি মসজিদ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “ফ্রাঙ্কফুর্টে বাংলাদেশিদের বসবাসের ইতিহাস প্রায় ৫০ বছরের। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনও এখানে বাংলাদেশিদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী মসজিদ নেই। এটি শুধু ধর্মীয় প্রয়োজন নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িত।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন ভাড়া করা হল কিংবা অস্থায়ী স্থানে নামাজ ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু মুসলিম কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় এসব ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে ঈদ, জুমা কিংবা রমজানের সময় জায়গার সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। অনেক সময় পরিবার-পরিজন নিয়ে অংশ নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হয় প্রবাসীদের।
কামাল হোসেন ভুঁইয়া জানান, একটি স্থায়ী ও সার্বজনীন বাংলাদেশি মসজিদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও উদ্যোগ চলছে। তিনি বলেন, “যে কেউ যদি আন্তরিকভাবে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়, আমরা তাদের পাশে থাকব। আমরা চাই এমন একটি মসজিদ, যা হবে সব বাংলাদেশির জন্য উন্মুক্ত, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক কার্যক্রম এবং নতুন প্রজন্মের জন্য ধর্মীয় সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ থাকবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ধরে রাখতে একটি কমিউনিটি মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু নামাজের স্থান নয়, একটি মসজিদ হতে পারে প্রবাসীদের সামাজিক বন্ধনের কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে শিশু-কিশোরদের জন্য কোরআন শিক্ষা, বাংলা শিক্ষা, নৈতিক প্রশিক্ষণ এবং কমিউনিটির বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে পরামর্শমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজেদের উদ্যোগে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে কমিউনিটিকে সুসংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু ফ্রাঙ্কফুর্টের -এর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে এখনও বাংলাদেশিদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী মসজিদ না থাকা সত্যিই বিস্ময়ের বিষয়। অথচ এই শহরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ বসবাস করছেন ।
প্রবাসীদের অনেকেই মনে করেন, একটি সার্বজনীন মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা শুধু ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণ করবে না, বরং প্রবাসে বাংলাদেশিদের ঐক্য ও পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও কাজ করবে। বর্তমানে কমিউনিটি বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক উদ্যোগে বিভক্ত থাকলেও একটি স্থায়ী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে সহায়ক হতে পারে।
ঈদের জামাতে অংশ নেওয়া অনেক প্রবাসীই মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থেকেও নিজেদের একটি স্থায়ী ধর্মীয় কেন্দ্র না থাকা কষ্টের বিষয়। অনেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার আশ্বাসও দেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে।
নামাজে আগত প্রবাসীদের স্বাগত জানান কমিউনিটির বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শামসুল করিম পল, ফরিদ হোসেন শিহাব, মুরাদ আহমেদ, আব্দুল মান্নান খান বাবুল, তামজিদুল ইসলাম, দোলন খান ও আসাদুজ্জামান রানা প্রমুখ।
সামগ্রিকভাবে এবারের ঈদের আয়োজন শুধু ধর্মীয় উৎসবেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করেছে। বিশেষ করে সার্বজনীন বাংলাদেশি মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয় এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে আসেন।

