ফ্রান্সের উবারভিলিয়েতে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে ঘিরে এক বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো উদীচী ফ্রান্স সংসদের বৈশাখী মেলা। প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও গান, নৃত্য, শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে প্রবাসের মাটিতে যেন ফুটে উঠেছিল এক টুকরো বাংলার আবহ।
দিনব্যাপী এই আয়োজনের সূচনা হয় ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে। সঙ্গে ছিল এদেশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। রঙ-তুলির আঁচড়ে তাদের কল্পনায় ধরা পড়ে বৈশাখ, প্রকৃতি ও বাংলার নানা অনুষঙ্গ।

মূল আয়োজন শুরুর আগে উদীচী ফ্রান্স সংসদের সভাপতি কিরন্ময় মন্ডল ও সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন হাওলাদারের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা পর্ব। এতে উপস্থিত ছিলেন উবারভিলিয়ে মেরির প্রথম সহকারী মেয়র নাবিলা জেব্বারি, দ্বিতীয় সহকারী মেয়র গুইয়োম লেস্কা, তৃতীয় সহকারী মেয়র উইলফিল্ড, ‘মিউজিক দ্যু মন্ড’-এর পরিচালক কামেল দাফ্রি এবং বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক কার্লোস সামেদুসহ স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
আলোচনা পর্বের শুরুতেই শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা করা হয়। পরে অতিথিদের হাত দিয়ে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার।
এরপর যাদুশিল্পী জাহাঙ্গীর হোসাইনের একক জাদু প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন। তার পরিবেশনায় মুগ্ধ হয়ে ওঠেন উপস্থিত দর্শকরা।

এরপর মঞ্চে আসে উদীচী পরিচালিত বাংলা স্কুল—বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিশু-কিশোররা। তাদের পরিবেশনায় গান ও নৃত্যের মনোমুগ্ধকর আয়োজন দর্শকদের মুগ্ধ করে। এ পর্ব যৌথভাবে পরিচালনা করেন উদীচীর কোষাধ্যক্ষ রোমানা আফরোজ ও সংগীত বিভাগের সম্পাদক সুস্মিতা বড়ুয়া। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন সহসভাপতি রোজী মজুমদার এবং নৃত্য পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিলেন নৃত্য বিভাগের সম্পাদক জি এম শরিফুল ইসলাম।
শিশুদের পরিবেশনার পর মঞ্চস্থ হয় একটি শ্রুতি নাটক। এতে অংশ নেন সাইফুল ইসলাম, শম্পা বড়ুয়া, শর্মিষ্ঠা বড়ুয়া, মেরী হাওলাদার, আবু বকর আলামিন ও মিতু পাল।

পরে উদীচী ফ্রান্স সংসদের শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় সঙ্গীত ও নৃত্যানুষ্ঠান। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন রোজী মজুমদার এবং নৃত্য পরিকল্পনা ও পরিচালনায় জি এম শরিফুল ইসলাম। সঙ্গতে ছিলেন কিবোর্ডে সাগর বড়ুয়া ও তবলায় শিপন প্লাসিড রিবারিও। অনুষ্ঠানটির এই পর্ব যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন আবু বকর আলামিন ও সাইফুল ইসলাম।
দিনের শেষ আয়োজন ছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘জলের গান’-এর শিল্পী রাহুল আনন্দের সঙ্গীত পরিবেশনা। তার গানে গানে বৈশাখী সন্ধ্যা পায় এক ভিন্ন মাত্রা, আর প্রবাসের বুকে জমে ওঠে উৎসবের উচ্ছ্বাস।
জাঁকজমকপূর্ণ এ আয়োজনের মঞ্চসজ্জায় দায়িত্ব পালন করেন সহসাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ মিশেল। প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন প্রচার সম্পাদক শিমুল রায়। অতিথি আপ্যায়নে ছিলেন অভ্যর্থনা বিষয়ক সম্পাদক সুশীল সিংহ। অনুষ্ঠানস্থলের সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন কিরন্ময় মন্ডল, পলাশ বড়ুয়া, নির্মল দে, শফিকুল ইসলাম রায়হান, সাখাওয়াত হোসেন হাওলাদারসহ আরও অনেকে।
প্রবাসের মাটিতে এমন আয়োজন শুধু নববর্ষ উদযাপন নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতি ও শেকড়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক প্রাণবন্ত প্রয়াস—এমনটাই মনে করেন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া দর্শনার্থীরা।
রাকিবুল ইসলাম, শুদ্ধস্বর ডটকমের ফ্রান্স প্রতিনিধি।

