বাংলাদেশ যখন তার দশম জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, তখন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘ভারত ফ্যাক্টর’ ক্রমেই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ কার্যত “ইন্ডিয়া-লকড”। দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ড ছাড়া বাংলাদেশ চারদিক থেকেই ভারতের দ্বারা পরিবেষ্টিত—পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তরে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত। দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো বড় কোনো সামুদ্রিক শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি; ফলে এই ভৌগোলিক ‘সুযোগের জানালা’ পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
ইতিহাসবিদরা অবশ্য বর্তমান বাংলাদেশের জন্য এক ভিন্ন রাজনৈতিক ভূগোলের কথা উল্লেখ করে থাকেন। বলা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং দিল্লিকেন্দ্রিক কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রতিরোধের ইতিহাস। ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তারা প্রায় আড়াই হাজার বছরের লিখিত ইতিহাসে চারবার বা মোটামুটি এক শতাব্দী বাংলার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। বাকি সময়জুড়ে বাংলাদেশ—এবং বিস্তৃত অর্থে পূর্ব ভারত—উত্তর ভারতীয় শাসন থেকে প্রায় স্বাধীনই ছিল।
উল্টোভাবে বলা যায়, বুদ্ধ ও খ্রিস্টের জন্মেরও আগে ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্র ছিল পূর্ব ভারতে, যা বর্তমান বাংলাদেশের অংশবিশেষ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বাংলাদেশের বগুড়ায় প্রাপ্ত অশোক স্তম্ভের দুটি নিদর্শন এই অঞ্চলের মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকার সাক্ষ্য দেয়। পাটলিপুত্র (বর্তমান বিহারের পাটনা), ছিল সেই সাম্রাজ্যের রাজধানী।
এই রাজনৈতিক কাঠামো অব্যাহত ছিল ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত, যখন ইংরেজরা পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করে। সে সময়ের বাংলা সাম্রাজ্য ভারতের মোট জিডিপির প্রায় অর্ধেক উৎপাদন করত। এই সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল নেপালের কাপিলাবস্তু পর্যন্ত এবং অন্তর্ভুক্ত করেছিল বর্তমান ভারতের বারাণসী, মথুরা, এলাহাবাদ, লক্ষ্ণৌ, নাগপুর ও ছোটনাগপুর অঞ্চল। বিহার ও উড়িষ্যাও ছিল এই সাম্রাজ্যের অংশ। তৎকালীন নথিপত্রে অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গ—আজকের আসাম, বাংলা ও উড়িষ্যার—উল্লেখ পাওয়া যায়। পূর্বদিকে এই সাম্রাজ্যের বিস্তার ছিল বর্তমান আসাম পর্যন্ত।
ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের প্রায় দুই শতকে প্রশাসনিক সুবিধার কথা বলে নতুন করে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়। তবে ইউরোপীয় নন-ইউরোপীয় বহু গবেষকের মতে, ব্রিটিশরা মনে করত বাংলা ছিল উপমহাদেশ শাসনের চাবিকাঠি; তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতোই বাংলাকেও খণ্ড-বিখণ্ড করা প্রয়োজন ছিল।
বিষয়টি আরও জটিল হয় যখন দেখা যায়, উত্তর বাংলাদেশের বড় অংশ এবং আসামের কিছু এলাকা—যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল—ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যদিও উপমহাদেশ ভাগের মূল নীতি ছিল ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা। লর্ড মাউন্টব্যাটেন সাংবাদিক লাপিয়ের ও কলিন্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ এবং ভারতের ভৌগোলিক সংযুক্ততা রক্ষার জন্যই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক জটিলতা আজও রয়ে গেছে। ভারত দাবি করে, ওইসব অঞ্চলে বসবাসকারী বহু মানুষ বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে আগত। এই ইস্যুটি দিল্লির ক্ষমতার রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশ এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে এবং অভিন্ন নদীগুলোর ন্যায্য হিস্যার দাবি জানিয়ে আসছে।
চীন এই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিব্বতের সাংপো নদীতে (যা ভারতে ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশে যমুনা ও মেঘনা নামে পরিচিত) চীনের চলমান প্রকল্প এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এরই মধ্যে অভিবাসন ইস্যু নতুন চরমে পৌঁছেছে। চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ যুক্ত থাকার কারণে ভারত বাংলাদেশে একটি এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে ভেটো দেয়। এর জবাবে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি তিনটি সামরিক গ্যারিসন মোতায়েন করে।
এ অবস্থায় দুই দেশই একে অপরের রাজধানী ও প্রধান শহরগুলোতে কিছু কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। স্থলবন্দরগুলো প্রায় অচল। কেবল সমুদ্রপথে বাণিজ্য কিছুটা সচল থাকাই একমাত্র ইতিবাচক দিক।
সবচেয়ে বড় সমসাময়িক উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনা ওয়াজেদ ও তার সহযোগীদের উসকানিমূলক বক্তব্য। তারা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে গণমাধ্যমের মাধ্যমে লাগাতার বিদ্বেষমূলক প্রচারে লিপ্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে, যার অনেকগুলোই জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণে সমর্থন পেয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক যে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা বলাই বাহুল্য।
লেখক:
আলি সানয়োর
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

