‘আমারে দেব না ভুলিতে’ — নজরুল-স্মৃতি ও দুর্লভ সংগ্রহে সাত দিনের বিশেষ প্রদর্শনী কলকাতায়

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য নাম। তাঁর পরিচয় শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’তেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ছিলেন মানবতার কবি, সাম্যের কবি, প্রেম ও প্রতিবাদের অকুতোভয় কণ্ঠস্বর। সমগ্র জীবনজুড়ে তিনি ধর্ম, জাতি ও বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। তাই বিশ্বায়নের বহু আগেই তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন—
“আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির!”

এ এক গর্বের বিষয় যে জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছেন বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র কলকাতায়। নানা সময়ে ঠিকানা বদল করলেও শহরের অলিগলি আজও বহন করে তাঁর স্মৃতি। সেই স্মৃতিকেই নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে নজরুল-গবেষণা ও চর্চার অন্যতম সংগঠন ছায়ানট (কলকাতা) আয়োজন করেছে সাত দিনব্যাপী বিশেষ প্রদর্শনী — ‘আমারে দেব না ভুলিতে’।

আগামী ২৩ মে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস-এর সুনয়নী চিত্রশালা ও চিত্তপ্রসাদ গ্যালারিতে এই প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। চলবে ৩০ মে পর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর ২টো থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা উপভোগ করতে পারবেন নজরুল-সংক্রান্ত বিরল ও দুষ্প্রাপ্য সামগ্রীর এক অনন্য সমাহার।

প্রদর্শনীর ভাবনায় রয়েছেন নজরুল গবেষক ও ছায়ানট (কলকাতা)-এর সভাপতি সোমঋতা মল্লিক। দুই বাংলার বিশিষ্ট সংগ্রাহকদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে সাজানো হচ্ছে এই বিশেষ আয়োজন। প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে থাকছে কলকাতার বিশিষ্ট অটোগ্রাফ সংগ্রাহক মলয় সরকারের সংগ্রহে থাকা নজরুলের স্বাক্ষর। বাংলাদেশের আলোকচিত্রী সাহাদাত পারভেজের সংগ্রহ থেকে প্রদর্শিত হবে কবির একাধিক দুর্লভ আলোকচিত্র। পাশাপাশি প্রয়াত আলোকচিত্রী অলক মিত্রের তোলা ছবিও স্থান পাবে এই প্রদর্শনীতে।

গৌতম ব্যানার্জী, স্বাগত গুপ্ত ও আশিক মিঞার সংগ্রহ থেকে দেখা যাবে নজরুল-সংক্রান্ত নানা বিরল ছবি। বিশিষ্ট নজরুল-সঙ্গীত শিল্পী সত্য চৌধুরীর ভ্রাতুষ্পুত্র পরমানন্দ চৌধুরীর সংগ্রহ থেকে শোনানো হবে কবির স্বকণ্ঠে গান ও কবিতার গ্রামোফোন রেকর্ড। এছাড়াও ঈশিতা বসু রায়ের সংগ্রহ থেকে প্রদর্শিত হবে প্রখ্যাত শিল্পীদের কণ্ঠে নজরুল-সঙ্গীত ও কবিতার দুর্লভ গ্রামোফোন রেকর্ড এবং ক্যাসেট।

ডাকটিকিট সংগ্রাহক শৌভিক রায়ের সংগ্রহ থেকে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে প্রকাশিত নজরুল-বিষয়ক ডাকটিকিট দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করবে। শেখর দে প্রদর্শনীতে যুক্ত করছেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশে নির্মিত বিশেষ মুদ্রা। বাংলাদেশের সংগ্রাহক সাকিল হকের তৈরি নজরুল-ছবি সম্বলিত দেশলাই বাক্সও এই প্রদর্শনীতে এক অভিনব মাত্রা যোগ করবে।

ফাল্গুনী দত্ত রায়ের সংগ্রহে থাকা নজরুলের ‘অগ্নি-বীণা’-র দ্বিতীয় সংস্করণ, ‘বেতার জগৎ’-এর বিশেষ সংখ্যা, বিরল ডাকটিকিট এবং নজরুল-সম্পৃক্ত চলচ্চিত্রের বুকলেটসও প্রদর্শিত হবে। ‘বিদ্যাপতি’, ‘সাপুড়ে’, ‘গোরা’, ‘চৌরঙ্গী’ সহ একাধিক চলচ্চিত্রের সঙ্গে নজরুলের যোগসূত্রের দলিল এই প্রদর্শনীকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

অপ্রতিম বসুর সংগ্রহ থেকে থাকছে ‘চোখের চাতক’-এর প্রথম সংস্করণ সহ আরও বহু দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী। ভারত ও বাংলাদেশের শিল্পী ওয়াসিম কাপুর, বাপ্পা ভৌমিক, সুব্রত কর এবং রাসেল রহমান শিমুলের আঁকা নজরুলের প্রতিকৃতিও প্রদর্শনীতে স্থান পাবে। কফিম্যান পার্থ মুখার্জী কফি দিয়ে আঁকবেন নজরুলের প্রতিকৃতি। পাশাপাশি মৌটুসী ঘোষের ‘আলপনায় নজরুল’ এবং সুবীর বিশ্বাসের স্লেট পাথরে নির্মিত নজরুল-শিল্পও থাকবে দর্শকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে।

প্রতিদিন গ্যালারিতে ‘আরশি কলকাতা’-র শিল্পীরা সুমিত গুহর পরিচালনায় লাইভ পেন্টিং করবেন। এছাড়াও থাকছে নজরুলপ্রেমীদের আড্ডা, নজরুল-বিষয়ক ক্যুইজ, শব্দবাজি এবং গ্রামোফোন রেকর্ড প্লেয়ারে নজরুল-সঙ্গীত শোনার বিশেষ আয়োজন।

সোমঋতা মল্লিক জানান, “আমাদের প্রাণের কবির জীবন ও সৃষ্টি সম্পর্কে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে অবগত করাই এই প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য। নজরুল-সংক্রান্ত দুর্লভ সামগ্রী সংগ্রাহকেরা যে কত যত্নে সংরক্ষণ করে চলেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। উদ্বোধনের দিন তাঁদের বিশেষ সম্মানও জানানো হবে।”

প্রদর্শনীতে আরও তুলে ধরা হবে নজরুল-স্মৃতি বিজড়িত ভারতের বিভিন্ন স্থান সম্পর্কে ছায়ানট (কলকাতা)-এর দীর্ঘ ১৮ বছরের কাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝলক। ২০১৮ সালে সোমঋতা মল্লিকের তত্ত্বাবধানে মাসুদুর রহিম রুবাইয়ের ক্যামেরায় তোলা কলকাতায় নজরুলের বসবাস করা বিভিন্ন বাড়ির ছবিও প্রদর্শিত হবে।

নজরুলকে নতুনভাবে আবিষ্কারের এই বিশেষ আয়োজনে সকল নজরুলপ্রেমীদের জন্য রইল আন্তরিক আমন্ত্রণ।

তিস্তা দে

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.