গত ৮ এপ্রিল রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর প্রাক্কালে শতাব্দী প্রাচীন রামমোহন লাইব্রেরি এন্ড ফ্রি রিডিং রুম-এর উদ্যোগে রায়া দেবনাথ মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠিত হল এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান — ‘হে নূতন দেখা দিক আর-বার’। রবি সৃজনীর আলোকধারায় অবগাহন করা এই অনুষ্ঠান যেন একদিকে রবীন্দ্রস্মৃতির পুনরাবিষ্কার, অন্যদিকে বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্য সংরক্ষণের এক আন্তরিক প্রয়াস।
বাংলার নবজাগরণের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান রামমোহন লাইব্রেরি বহু মনীষীর পদধূলিধন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম-সহ বাংলা ভাষার অসংখ্য বরেণ্য সাহিত্যিক ও শিল্পী এই প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর কবিগুরুকে এই লাইব্রেরিতেই বিশেষ সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। অনুষ্ঠানে সেই ঐতিহাসিক ছবিও প্রদর্শিত হয়, যা উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে।
রামমোহন লাইব্রেরিতে সারা বছর জুড়েই নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রতি মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার এখানে অনুষ্ঠিত হয় ভিন্ন স্বাদের বিশেষ অনুষ্ঠান, যেখানে কলকাতার সঙ্গীতপ্রেমীরা একত্রিত হয়ে গ্রামোফোনে পুরনো রেকর্ডের গান শোনেন। শুধুমাত্র গান শোনাই নয়, সেই সঙ্গে উঠে আসে গান, শিল্পী ও সময়ের নানা অজানা তথ্য। এই অভিনব উদ্যোগ বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখার এক অনন্য প্রয়াস বলেই মনে করেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
অনুষ্ঠানের সূচনায় রামমোহন লাইব্রেরি এন্ড ফ্রি রিডিং রুমের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিত মিত্র এই উদ্যোগের তাৎপর্য নিয়ে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিলেন উৎপল চৌধুরী। তাঁকে সহযোগিতা করেন চন্দন চ্যাটার্জী ও অর্পন চ্যাটার্জি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব সামলান উৎপল চৌধুরী ও সোমঋতা মল্লিক।
শুরুতেই উৎপল চৌধুরী কবিগুরুর ‘দুর্লভ জন্ম’ কবিতাটি পাঠ করেন। পাশাপাশি তিনি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস উদযাপনের ইতিহাসও তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, কবিগুরুর ভাগ্নী সরলাদেবী চৌধুরাণীই প্রথম এই জন্মোৎসবের সূচনা করেন। তখন রবীন্দ্রনাথ পার্কস্ট্রিটের ৪৯ নম্বর বাড়িতে দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে থাকতেন। সরলাদেবী তাঁর আত্মজীবনী ‘ঝরা পাতায়’-এ লিখেছিলেন—
“রবি মামার প্রথম জন্মদিনের উৎসব আমি করাই… রবির জন্মদিন বলে একটা সাড়া পড়ে গেল।”
এরপর শোনানো হয় অমিয়া ঠাকুরের কণ্ঠে সেই বিখ্যাত গান — ‘হে নূতন দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ’।
একটির পর একটি দুর্লভ গ্রামোফোন রেকর্ডে বেজে ওঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত। কবি মজুমদারের কণ্ঠে ‘শুন গো নলিনী খোল গো আঁখি’, কৃষ্ণা হাজরার ‘আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার’, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্রর ‘জগতে আনন্দ যজ্ঞে’, কনক দাস ও দেবব্রত বিশ্বাসের যুগল কণ্ঠে ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো’, কৃষ্ণচন্দ্র দের ‘তোমরা যা বলো তাই বলো’, অমিতা সেনের ‘চিনিলে না আমারে’, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আমার পরাণ যাহা চায়’ এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রাঙ্গণে মোর শিরীষ পাখায়’— প্রতিটি গানই যেন উপস্থিত দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক অন্য সময়ের আবহে।
রেকর্ড তালিকার দিকে নজর দিলেই বোঝা যায়, রামমোহন লাইব্রেরির সংগ্রহে রয়েছে বিপুল সংখ্যক দুর্লভ গ্রামোফোন রেকর্ড। অনুষ্ঠানটির জন্য বেশ কিছুদিন আগে থেকেই শ্রোতাদের কাছ থেকে গানের অনুরোধ সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই অনুরোধের কথা মাথায় রেখেই গান নির্বাচন করেন উৎপল চৌধুরী। পাশাপাশি প্রতিটি গান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে বিশ্বকবির স্বকণ্ঠে উচ্চারিত ‘Where the mind is without fear’ কবিতার রেকর্ড শোনানোর মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর যেন এই অস্থির সময়েও মানবতার পথ দেখায়। প্রেক্ষাগৃহের নিস্তব্ধতা প্রমাণ করে দেয় — সময় বদলালেও কবিগুরুর সৃষ্টি আজও কতটা প্রাসঙ্গিক।
উৎপল চৌধুরী ও সোমঋতা মল্লিকের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা অনুষ্ঠানটিকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে। সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে রামমোহন লাইব্রেরির এই সাংস্কৃতিক যাত্রা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকুক — এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেন উপস্থিত সঙ্গীতপ্রেমীরা।

