একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনার অপমৃত্যু

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ধারা সৃষ্টির অঙ্গীকার নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আজ নিজেই তার অস্তিত্বের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করার পথে হাঁটছে। জুলাই আন্দোলনের রক্ত, ঘাম ও আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে যে রাজনৈতিক সম্ভাবনার জন্ম হয়েছিল, জামায়াতে ইসলামির মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও পশ্চাৎপন্থী শক্তির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার মাধ্যমে এনসিপি সেই সম্ভাবনাকে কার্যত কবর দিচ্ছে।

এনসিপির জন্ম হয়েছিল ‘মধ্যপন্থী’, গণতান্ত্রিক ও আধুনিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে। দলটির নেতারা স্পষ্ট করেই বলেছিলেন—বাংলাদেশকে আর মধ্যযুগীয় চিন্তার কাছে জিম্মি করা যাবে না। অথচ আজ সেই এনসিপিই এমন একটি দলের সঙ্গে জোট বাঁধতে যাচ্ছে, যে দল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত, যার রাজনীতি নারীবিদ্বেষী, অসাম্প্রদায়িকতার শত্রু এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

এটি শুধু রাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন নয়; এটি আদর্শ, নৈতিকতা ও ইতিহাসের প্রশ্ন। এনসিপির শীর্ষ নেত্রী তাসনিম জারা ও তাসনূভা জাবীনের পদত্যাগ সেই সত্যকেই নগ্নভাবে সামনে এনেছে। তাঁরা কেউ আবেগের বশে নয়, বরং রাজনৈতিক বিবেকের তাড়নায় সরে দাঁড়িয়েছেন। তাসনূভা জাবীনের ভাষায়, এই জোট “পরিকল্পিত”—এটি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং ধাপে ধাপে আদর্শ বিসর্জনের ফল।

আরও উদ্বেগজনক হলো, দলের ভেতর থেকেই ৩০ জন নেতা স্মারকলিপি দিয়ে যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, সেটিকে কার্যত উপেক্ষা করা হচ্ছে। এতে স্পষ্ট, এনসিপির বর্তমান নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার চেয়ে ক্ষমতার অঙ্ককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে নৈতিক অবস্থান দুর্বল হবে—এই বাস্তবতা তারা জেনেও চোখ বন্ধ করে আছে।

বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ার পর জামায়াতকে ‘বিকল্প’ হিসেবে বেছে নেওয়া এনসিপির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই প্রমাণ। ক্ষমতায় যাওয়ার শর্টকাট হিসেবে যারা ইতিহাসবিরোধী শক্তিকে বৈধতা দেয়, তারা শেষ পর্যন্ত নিজেরাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়—বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার উদাহরণ নতুন নয়।

জুলাই আন্দোলনের ছাত্র-যুব নেতৃত্ব যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল—একটি ন্যায়ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও আধুনিক বাংলাদেশের—এনসিপির এই সিদ্ধান্ত সেই স্বপ্নের সরাসরি অবমাননা। এটি শুধু একটি দলের ভুল সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

এনসিপি যদি এখনো আত্মসমালোচনার সাহস না দেখায়, যদি জামায়াতের সঙ্গে এই আত্মঘাতী পথে এগিয়ে যায়, তবে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। রাজনীতি শুধু আসনের হিসাব নয়—রাজনীতি মানুষের স্মৃতি, রক্ত ও আত্মত্যাগের দায় বহন করে। সেই দায় ভুলে গেলে, রাজনৈতিক আত্মহত্যা অনিবার্য।

লেখক: হাবিব বাবুল
জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক । 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.