সাদা টুপিতে গেরুয়ার সমালোচনা, দ্বিচারিতা ও ভবিষ্যত ভাবনা

“জলের শ্যাওলা”- ভারতে সাম্প্রতিককালের নির্বাচনে একটি বিশেষ অঙ্গরাজ্যেতে একটি বিশেষ ধর্মীয় প্রভাবের রাজনীতির জয় মানেই যে সমগ্র ভারত সেই বিশেষ ধর্মীয় রাজনীতির বৃত্তে আবৃত হবে এমনটা ভাবা স্রেফ বাতুলতা বলেই মনে করি। ভারতের এই বিশেষ ধর্ম হিন্দুত্ববাদ ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলবে কারণ এই বিশেষ ধর্মের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে বলেই, এমনটা ভাবাও বাতুলতাসম। স্মরণে রাখুন, এই একই ধর্মীয় প্রভাবের রাজনৈতিক দল ইতিপূর্বেও ক্ষমতায়ন হয়েছিল কিন্ত। তবে এ কথাও সত্য য, ভারতের এই ধর্মীয় প্রভাবের রাজনৈতিক দলটি ভারতের দু’ একটি অঙ্গরাজ্যের ওপর বেশ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে এবং অতটুকুতেই। এর বেশি কিছু হবার নয়।
এই লেখার পূর্বে একটি মেসেজ দিচ্ছি। আজকে সকালে একটি মেসেজ পেয়েছি (নাম লিখবো না) এবং মেসেজটি হলো, ভাই আপনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মতন অঞ্চলে এমন রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে একটি শব্দও লিখলেন না যে এবং সাথে পরপর তিনটি আশ্চর্য চিহ্ন।
হ্যা কথা সত্য যে, আমি একটি শব্দও লিখিনি এবং লেখার কোন ইচ্ছেও আমার ছিল না কেননা রাজনীতি বা রাষ্ট্র ধর্ম দ্বারা আবৃত হলে, ওটাকে স্রেফ ঘৃণা করা যায় (হ্যা শব্দটি ঘৃণাই হবে) এবং প্রতিহত করা প্রয়োজন হয় দেশের স্বার্থেই। কেন প্রতিহত করা প্রয়োজন? ওটা আবার অনেক বড় আলোচনার বিষয় হবে। এখানে বা আজকে তা লিখছি না।
আমি বেশ অনুমান করেছিলাম যে, এমন কোন মেসেজ কারো না কারো নিকট হতে আমার নিকট আসবে এবং আসলো। আমি মোটেও অবাক হইনি তবে আমি ভেবেছি। কি ভেবেছি? মানুষের দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে। একটি সাধারণ দ্বিমুখী আচরণ বা স্বার্থপর মানসিকতা হলো, নিজের ভুল চোখে দেখে না, কিন্তু অন্যের ভুল মেনে নিতে চায় না! ওই যে বাংলা প্রবাদ আছে না, “নিজের বেলায় ষোল আনা, অন্যের বেলায় কানা”। পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের আলোচনায় চাই বা না চাই, বাংলাদেশের জামায়াত- শিবিরসহ তাদের বৃত্তের ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা বা অবস্থান স্বাভাবিক কারণেই চলে আসে কেননা আমাদের দেশের এই রাজনৈতিক দলগুলো আবার অন্যের বেলায় ষোল আনাই কানা যে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটু ভাল করে লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন যে,, কে বা কারা ভারতের একটি অঙ্গ রাজ্যেতে একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর আগমনে এমন দ্বিমুখী আচরণ করছে? উপলব্ধিতে নিন বিষয়টি এইসব মতলববাজদের নিজেদের রাজনীতিতে ধর্মীয় আচরণকে সামনে রেখে। আরও লক্ষ্য করুন, গেরুয়া বলে কটাক্ষ করছে যে জনেরা, সেই জনেরা নিজেদের মাথায় সাদা টুপি চড়িয়ে গেরুয়া রংয়ের সমালোচনায় লিপ্ত, গেলো গেলো বলে। আর কিছু লেখার প্রয়োজন থাকে কি?
লেখার প্রয়োজনীয়তায় ভারতীয় রাজনীতির বিষয়টি আপন ভাবনায় একটু খোলাসা করি:
বর্তমান ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। দেশটির সংবিধানে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। India এর সংবিধানের প্রস্তাবনায় “Secular” বা ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি ১৯৭৬ সালে যুক্ত হয়। তবে রাজনৈতিকভাবে “হিন্দু রাষ্ট্র” ধারণা নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা আছে। বিশেষ করে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ এবং কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ভারতকে সাংস্কৃতিকভাবে হিন্দু সভ্যতার রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। আবার অনেক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক স্পষ্টতই মনে করেন, ভারতের বর্তমান শাসক দল “ভারতীয় জনতা পার্টি” এর কিছু নীতি হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকে আছে। তবে এর বিপরীতেও বহু ও ভিন্ন মত আছে।
একটি বাড়তি বা অগ্রীম প্রশ্ন করছি এখানে, “ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে হিন্দু রাষ্ট্র হয়ে যাবে কি?”
উত্তরটি একটু বাঁকাভাবেই দিচ্ছি (কেউ কিছু মনে নিবেন না, প্লিজ), “সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ” এমন একটি কথা আমাদের দেশে চালু আছে নানাবিধ কারণেই তবে ভারত কখনোই সব সম্ভবের দেশ নয়। এর মূল কারণ বহুবিধ ভাষা, নানান জটিল সংস্কৃতি ও ভূগোল।
আরও একটু লক্ষ্য করুন, ভারতকে বিজেপি যদি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় তাহলে কি কি করতে হবে? এটা বহু কিছুর ওপর নির্ভর করছে এবং বিষয়টি অনেক জটিল ও বড় বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।
লক্ষ্য করন, যে কোন দেশেই সংবিধান পরিবর্তনের রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রয়োজন হয় এবং ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হতেও সেই রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রয়োজন হবে। যা সাম্প্রতিককালে ভারতে হবার নয় বলেই মনে করি।
তাছাড়াও ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান বড় বাঁধা হয়ে সামনে হিমালয় হয়ে দাঁড়াবেই। এটা ভারতেই আইন- আদালতে ঐতিহ্য থেকেই বলা যায়। দেশটির বহু ধর্ম, ভাষা ও জাতিগত বৈচিত্র্য, জনগণের সমর্থন বা বিরোধীতা, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, এই সকল কিছুকে উপেক্ষা করে আইনগতভাবে সংবিধান পরিবর্তন সম্ভব, যদি সংসদে পর্যাপ্ত সমর্থন থাকে। কিন্তু বাস্তবে ভারতে এটি খুবই জটিল এবং বিতর্কিত একটি বিষয়। কারণ ভারতে বড় মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠী ও বহুসংস্কৃতি রয়েছে। ভারত যত বড় দেশ তত বড় জনসংখ্যার কারণেই প্রতিটি গোষ্ঠীর আকার অনেক অনেক বড়। এই সকল উপসর্গ সামনে রেখে স্পষ্টতই বলা যায়, ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার সম্ভাবনা পুরোপুরি অসম্ভব নয় (স্বাভাবিক সূত্রে লিখছি), কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত অত্যন্ত কঠিন, জটিল এবং রাজনৈতিকভাবে গভীর বিতর্কের বিষয়। মোদ্দা কথা, ভারত কখনোই হিন্দু বা বিশেষ ধর্মীয় রাষ্ট্র হবার নয় এবং অবশ্যই নয়।
উপরে ভারতে ধর্মীয় রাষ্ট্র আলোচনার ক্ষেত্রটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমভাবে আলোচনা দাবী রাখে কি? বা, আলোচনাটি একই রকমের হবার সম্ভাবনা রয়েছে কি?
বাংলাদেশ বর্তমানে সংবিধান অনুযায়ী এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম, তবে একই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিও সংবিধানে রয়েছে। এই দুই বিষয় একসঙ্গে থাকার কারণে বাংলাদেশে রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক একপ্রকার বিতর্ক বিরাজমান আছে।
বাংলাদেশ পুরোপুরি “ইসলামিক রাষ্ট্র” হবে কি না, এটিও নির্ভর করে বিশেষ কিছু বিষয়ের ওপর।
প্রথমেই লিখতে হয, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনসমর্থনে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতার বিষয়ে, যা বর্তমান সরকারের রয়েছে। তবে এ কথাও সত্য যে, এমন কোন সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার থেকে আসার সম্ভাবনা শূণ্য। পাশাপাশি, এটাও উল্লেখ করছি যে, এমন কোন সিদ্ধান্ত (নিশ্চিত বর্তমানে হবার নয়) যদি আসে, সেখানে দেশের আদালতের ব্যাখ্যা ও সাংবিধানিক কাঠামো, দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা (লক্ষ্য রাখুন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বাস্তবতা আলাদাভাবে উল্লেখ করছি), এই সকল বিষয় উঠে আসবে এবং স্পষ্টতই মনে করি যেহেতু দেশটি একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট দর্শনের দ্বারা অর্জিত হয়েছে বলেই কখনোই অতটা সহজ হবার নয় এবং তেমন ভাবনাকে বাংলাদেশের জনমানুষেরা গ্রহণ করবে না বলেই মনে করি।
তবে একথাও সত্য যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থী দল ও গোষ্ঠীর প্রভাব আছে এবং বর্তমানে সেটা বেশ প্রকটভাবেই আছে বলা যায়। আবার পাশাপাশি শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক ধারাও রয়েছে। ফলে দেশটি কোন দিকে যাবে? তা সময়, রাজনীতি এবং জনগণের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা আছে, কিন্তু এটা নিশ্চিত বা অবশ্যম্ভাবী কিছু নয় বলেই মনে করি। এটি একটি জটিল রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন।
বলাই বাহুল্য যে, ইসলামপন্থী দল ও গোষ্ঠীর প্রভাব বেশ বিরাজমান আছে বর্তমান বাংলাদেশে এবং বেশ বৃদ্ধিও পেয়েছে বলেই দেখা যায়। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এই দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অংশ। তাদের প্রভাব সময়ভেদে কম–বেশি হয়েছে। বর্তমানে তারা মূলধারার বড় দলগুলোর মতো এককভাবে প্রভাবশালী না হলেও, কিছু ক্ষেত্র বিশেষে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বেশ রাখে বলেই প্রতিয়মান হয়। বিশেষ করে ধর্মীয় ইস্যু ও ইসলামিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে, মূলত ধর্মকে বর্ম করেই এগুচ্ছে। জামায়াতি ইসলাম, ইসলামিক আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফতে মজলিশ, হেফাজতে ইসলাম ইত্যাদি দলগুলো সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাবশালী সংগঠনে রূপান্তরিত হয়েছে। এ কথা মেনে নিতেই হবে। এই সকল ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলো ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছি না তবে বেশ কয়েকটি বাস্তবতা অতিব গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করি। সেই সব বাস্তবতা আজকের আলোচনার বিষয় নয় বলেই লিখছি না।
লেখার শেষে স্পষ্টতই লিখছি, এই যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যে কট্টর হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান ঘটলো এবং বাংলাদেশ থেকে সাদা টুপি মাথায় চড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক চাওয়া- পাওয়ার বিপরীতে দ্বিচারিতার ভূমিকায় গেরুয়া রঙের যে সমালোচনা হচ্ছে, কিংবা পশ্চিমবঙ্গ থেকে হিন্দুত্ববাদীর নামে যে অসভ্যতার সমালোচনা বাংলাদেশ নিয়ে হচ্ছে, এগুলো খুব দ্রুতই কমে আসবে এবং ভারত তাদের নিজেদের স্বার্থেই কখনোই ধর্মীয় রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে না বা হতে পারবে না, যা উপরেই কিছুটা উল্লেখ করেছি লেখায়, কেননা ভারতের সংবিধানকে উপেক্ষা করে ভারত যদি কোন ধর্মীয় রাষ্ট্র হয়ে উঠে, তাহলে সেদিন থেকেই ভারত কয়েক খণ্ডে ভাগ হতে বেশি সময় নিবে না এবং স্পষ্টতই মনে করি ভারত কখনোই সে পথ মারাবে না। তবে আমাদের বাংলাদেশ? স্পষ্টতই আবার লিখছি, ভারত ধর্মীয় রাষ্ট্র হবার সম্ভাবনা শূণ্য, আমাদের বাংলাদেশ কিন্ত মোটেও শূণ্য নয়। সুতরাং আমাদের ভাবনা আমাদেরকেই গভীরতার সাথে ভাবতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ, দেশের জন্মসূত্র, ৭১ এর রক্ত ও ইজ্জত, এগুলোকে যদি আমরা অবহেলা করি তাহলে আমাদের বিপদ আমরাই ডেকে আনবো। সুতরাং সময় থাকতেই সাধন হোক।
বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.