গণতন্ত্রের প্রত্যাশা এবং প্রতীক্ষা

তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা, রাজনীতিতে অনেক জটিলতার অবসান ঘটাবে এ প্রত্যাশা সবার। প্রত্যাবর্তন সবসময় আনন্দের। নিজের দেশ ছাড়তে চায় না কেউ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেউ যখন দেশ পরিত্যাগ করে, তখন বুঝতে হবে দেশে বসবাস কঠিন। দরিদ্রদের জন্য দেশে টিকে থাকা কঠিন, তার কাজ এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা নেই বলে। আর ধনীদের বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হয় সম্পদ সুরক্ষার জন্য। তারা সেখানে বাড়ি, ব্যাংক ব্যালান্স করেন। দুর্নীতিবাজরা দেশের সম্পদ লুটপাট করে আখের গুছিয়ে উন্নত জীবন ভোগ করতে বিদেশে পাড়ি জমান। মধ্যবিত্তরা হাঁসফাঁস করেন আর সন্তানের উন্নত ভবিষ্যতের পথ খুঁজতে সন্তানকে বিদেশ পাঠান। কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে দেশে থাকলে, জেলে পচতে হবে না হলে মরতে হবে। এই কারণে অনেকে দেশ ছাড়েন। যারা বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়েন, তাদের জন্য ফিরে আসার মতো আনন্দের আর কী আছে? তিনি যদি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে থাকেন, তাহলে আনন্দ শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকে না, দল এবং সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তারেক রহমানের ফিরে আসা, এখন রাজনৈতিক আগ্রহের মূল আলোচনার বিষয় হয়েছে। রাজনীতি সমাজের পরিচালিকা শক্তি এ বিষয়ে বিতর্ক নেই। কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে রাজনীতি বন্ধ করার কথা বলেন, রাজনীতিমুক্ত সমাজ গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এটা যে একটা রাজনীতি, তা বুঝতে সময় লাগে না। ধরা পড়ে যায়, তাদের জারিজুরি। রাজনীতিবিহীন সমাজের কথা বলে, আসলে তারা প্রশ্নবিহীন ও প্রতিবাদহীন পরিবেশ তৈরি করতে চান। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা এবং রাজনীতি নিয়ে মানুষের ধারণা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিগত রাজনীতি মানুষকে কিছুটা রাজনীতিবিমুখ করলেও, মানুষ শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতেই সমাধান প্রত্যাশা করেন। গত ১৫ বছরের দুঃশাসন এবং তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের পটভূমিতেই দেশের মানুষ এখন রাজনৈতিক সমাধান আশা করছেন।

হাজার বছরের অভিজ্ঞতায় মানুষ দেখেছে এবং ভাবে যে, একা বাঁচা সম্ভব নয়। কিন্তু তারপরও ব্যক্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তাকে বিচ্ছিন্ন করে সবার কাছ থেকে। কিন্তু যখন সমস্যার সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন প্রধানত নিজের এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের ভালো হোক এটাই সাধারণভাবে মানুষ চায়। কারণ শেষ পর্যন্ত সবাই ভালো না থাকলে, এককভাবে নিজের ভালো থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সমাজের অস্থিরতা ব্যক্তির জীবনকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশ এর এক অনন্য নজির। কিন্তু মানুষ শান্তি চায়। অধরা সেই শান্তি খুঁজতেই বারবার মানুষ পথে নামে। আন্দোলনের পথে অশান্তির সমাধান খুঁজতে চেষ্টা করে। একা এবং একত্রভাবে মানুষ চেষ্টা করে, তার প্রত্যাশা পূরণের। সমাজে যেহেতু পরস্পরবিরোধী চিন্তার অবস্থান আছে, তাই বাধা থাকে পদে পদে। প্রতিনিয়ত সে সব অতিক্রম করার লড়াই করতে হয়। এক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাওয়া এবং লক্ষ্যের পথে অবিচল থাকার বিকল্প নেই। প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মধ্যেও ভবিষ্যতের আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।  ব্যক্তি, সমাজ এবং রাজনীতিতে কিছু প্রতীক্ষার অবসান হয়। আবার কিছু প্রতীক্ষা অন্তহীন মনে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে অনেকেই ভাবতে পারেননি যে, ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার অবসান হবে। প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে সময়েও রাজনৈতিক কারণেই অনেকে লড়েছিলেন স্বৈরাচারী ব্যবস্থা অবসানের লক্ষ্যে। অনেক মতপার্থক্য সত্ত্বেও, এক প্রশ্নে একটা সাধারণ ঐক্য ঘটেছিল গণমানুষের মধ্যে। সেটা হলো স্বৈরশাসনের অবসান হোক, নির্বাচনের পথে দেশ ফিরুক এবং দমন-পীড়নের পথ নয়, রাজনীতিতে যুক্তিতর্ক করার পরিবেশ আসুক। গণতন্ত্রের স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে একটি স্লোগান খুব উচ্চারিত হয়েছিল এবং জনগণ বিশেষ করে তরুণ সমাজকে আকর্ষণ করেছিল তা হলো, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। প্রতিহিংসা নয়, রাজনীতি হোক ন্যায়বিচারের। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর সেই স্লোগানের বিপরীত পথে অনেকটা হাঁটতে শুরু করল অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশ। জনজীবনের সমস্যা সমাধানের চেয়ে উত্তেজনা তৈরি করে দেশকে অস্থির করে রাখার প্রবণতা এবং নানা ধরনের চুক্তির আয়োজন করা মানুষকে ভাবিয়ে তুলছিল। একটা প্রশ্ন ভেসে বেড়িয়েছে বাতাসে, কী হচ্ছে এসব? কেউ কি দেখার নেই?

ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে? নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে কি সংকট তৈরি হচ্ছে? নির্বাচন না হলে কীভাবে চলবে দেশ? নির্বাচনে আমূল কোনো পরিবর্তন হবে না, কিন্তু একটা জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হতে পারে। বর্তমানে গানম্যান নেওয়ার আগ্রহ থেকে বুঝা যায় কী পরিমাণ উদ্বেগে আছেন অনেকে। নির্বাচন যেন এই অবস্থার অবসান ঘটায়, সেই প্রত্যাশা মানুষের। নির্বাচন গণতান্ত্রিক চর্চার একটা পদ্ধতি। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। নির্বাচন এক্ষেত্রে জনগণের চাওয়া এবং রাজনৈতিক দলের পরিকল্পনার মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি করে। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলের জনগণের প্রতি প্রতিশ্রুতি এবং জনগণের কাছে জবাদিহির পথ তৈরি হয়। দেশের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান কীভাবে পরিচালিত হবে, জনগণের ট্যাক্সের টাকা কীভাবে জনগণের কাজে ব্যবহার করা হবে, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে আহরণ এবং ব্যবস্থাপনা করা হবে, রাষ্ট্রের সম্পদ কীভাবে জনগণের মধ্যে বণ্টন হবে, দেশের বাণিজ্যনীতি, পররাষ্ট্রনীতি কী হবে সেই আলোচনা চলবে জনগণের মধ্যে। নির্বাচন শুধু প্রার্থী এবং প্রতীকের বিষয় নয়, নির্বাচন হচ্ছে মত এবং পথ নির্ধারণের বিষয়। আমাদের দেশে এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়, নির্বাচনকে এক মাসের উৎসব আর একদিনের ভোটে পর্যবসিত করেছে। প্রতি পাঁচ বছর পর কে বা কোন দল ক্ষমতায় গিয়ে জনগণকে শোষণ ও লুণ্ঠন করবে, তার সম্মতি নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করেছে। এর ফলে নির্বাচন হয়ে পড়েছে, কৌশলে জনগণের সম্মতি নেওয়ার মাধ্যমে তাদের বোকা বানানোর পদ্ধতি। প্রতিটি নির্বাচনের পর জনগণ ভাবে কী হলো, কাকে ভোট দিলাম? সে দেখি নিজের আখের গুছিয়ে নিতে গিয়ে জনগণের সর্বনাশ করছে! বিরক্ত এবং হতাশ জনগণ ভাবে, নির্বাচনের সময় কী বলেছে আর ক্ষমতায় গিয়ে কী করছে! এটাই রাজনীতি। জনগণ যেন প্রশ্ন করতে না পারে, নির্বাচিত হয়ে তোমাদের কীভাবে এত সম্পদ বৃদ্ধি পেল- সে কারণেই নির্বাচনে ভোটারদের লোভ দেখানো, ভয় দেখানো, আঞ্চলিকতা ও সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে মানুষকে বিভক্ত করা হয়। কেউ কেউ আবার তাদের ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়া যাবে, ভোট না দিলে দোজখে যাবে এই কথা বলে প্রচারণা চালায়। কার বংশ কত বড়, কার কত টাকা আছে সেই প্রতিযোগিতাও চলে নির্বাচনের নামে। দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি, ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ১২ হাজার। এর মধ্যে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি। মিছিলে শ্রমজীবীদের দরকার হয়, সমাবেশের আয়োজন করলে মাঠ ভর্তি করতে গরিব মানুষদের দরকার হয়, ভোটের সময় দরকার হয়। কিন্তু নির্বাচনের পর তাদের কাজ থাকবে কি না, কাজ না থাকলে তাদের সংসার চলবে কীভাবে? সেই প্রশ্নটা উত্থাপিত হওয়া দরকার। সংসদ নির্বাচন কি ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচন যে, টাকাওয়ালারাই প্রার্থী হবেন? টাকা, পেশিশক্তি এবং ধর্মের ব্যবহার নির্বাচনের গণতান্ত্রিক চরিত্র নষ্ট করে। ভোটাররা যৌক্তিক প্রশ্ন করতে ভয় পান, বিভিন্ন কারণে।

ফলে পার্লামেন্টে জনগণের প্রতিনিধি সঠিকভাবে নির্বাচিত হয় না এবং জনগণের কথা আলোচিত হয় না। পার্লামেন্ট হয়ে যায় ব্যবসায়ীদের ক্লাব এবং জনগণের বিপক্ষে আইন তৈরির জায়গা। জনগণ এটা দেখে আসছে বারবার। এসব ভুলিয়ে দেওয়ার জন্যই নির্বাচন এলে উত্তেজনা তৈরি করা হয়, টাকা দিয়ে ভোটের কর্মী বানানো হয়, ভোট কেনাবেচার সংস্কৃতি তৈরি হয়। জনগণের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করা হয় যারা জিতবে তারা তো লুটপাট করে টাকা বানাবে, আমিও পারলে দুই এক হাজার টাকা নিয়ে নিই। একটা শাড়ি, লুঙ্গি কিছু নগদ টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যায় তারা। ধনীরা টাকার থলি নিয়ে এগিয়ে আসে তাদের পছন্দের প্রার্থীর জন্য। ফলে নির্বাচন হয়ে পড়ছে, মানুষের চরিত্রের মান নষ্ট করার ব্যাপার। যারা দেশ নিয়ে ভাবেন, সমাজ নিয়ে ভাবেন তারা এসব দেখেন আর দুঃখের সঙ্গে বলতে থাকেন এভাবেই কি চলতে থাকবে? দেশের মানুষ নিজেরা সৎ থাকতে চায়, তারা চায় সৎ এবং দায়িত্বশীল মানুষরা নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাক। গণমানুষের পক্ষে আইন তৈরি হোক, কৃষক পাক তার ফসলের ন্যায্য দাম এবং জনগণ পাক ন্যায্যমূল্যে পণ্য, বন্ধ হোক সিন্ডিকেট করে দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর পদ্ধতি, ওষুধের দাম নিয়ে তুঘলকি বন্ধ হোক। শ্রমিক চায় কাজ এবং ন্যায্য মজুরি। নারীরা চায় নিরাপদে পথ চলতে, কাজ করতে, লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। দেশের মানুষ চায় শিক্ষা ও চিকিৎসা  নিয়ে ব্যবসা বন্ধ হোক, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুরা নাগরিক মর্যাদা নিয়ে বাঁচুক, বৃদ্ধরা পাক নিরাপত্তা, বস্তিবাসী মানুষ যেন মাথাগোঁজার ঠাঁই না হারায়। মানুষের এইসব চাওয়া রাজনৈতিক ভাষা যেন পায় নির্বাচনে। দেশের সব স্তরে জবাবদিহি চালু হোক। প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী সবই চলে জনগণের টাকায়। তাদের সম্পদ ও আয়ের হিসাব যেন থাকে। সংসদ সদস্য, মন্ত্রী হলে যে আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার সংস্কৃতি চালু হয়েছে তা বন্ধ হোক। জনগণের কষ্টের টাকা আর প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো টাকা যেন দুর্নীতি আর লুটপাটে শেষ হয়ে না যায়। দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দিয়ে আমরা যেন পরনির্ভরশীল হয়ে না পড়ি। নির্বাচনে যেন সত্যিকার অর্থে জনমতের প্রতিফলন ঘটে। এই দেশ আমাদের সবার, কয়েকজন ধনী ও পুঁজিপতির কাছে এর সম্পদ কেন কুক্ষিগত হবে? যে দেশে মাথাপিছু আয় বাড়ছে, এখন যা ২৫৯৩ ডলার সেই দেশে মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করবে কেন? নির্বাচন একটি রাজনৈতিক বিতর্কের মাধ্যমে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়ে পরিণত হোক।  যেখানে প্রতিটি মানুষ ভাববেন, তার মতামত দেওয়ার অধিকার আছে। তার মতের একটা মূল্য আছে এবং তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার রয়েছে। বর্তমানে এই প্রতীক্ষায় আছে বাংলাদেশ। কারণ, দেশের মানুষ যদি মুক্তভাবে তার মতপ্রকাশ করতে না পারেন তাহলে নির্বাচিত যারা হবেন, তারা কি সেই মানুষের কষ্ট, দুর্ভোগ ও যন্ত্রণার কথা জানবেন!

রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.