খবরটা এসে পৌঁছতেই গোটা পাড়া থ’। সবার মুখেই এক কথা, এ কী মা-বাবা রে! চারিদিকে এত কিছু ঘটছে, এ সব দেখেও ছেলের দিকে একটু নজর দেয়নি! ওরা কি খবরের কাগজটাগজ পড়ে না, না টিভি দেখে না… শেষে কিনা স্কুলের শিক্ষকমশাইদের এ সব দেখতে হবে… কালে কালে কী যে হল!
ওদের মালির বাগান অঞ্চলটা বেশ কিছু দিন আগে কলকাতা একশো পঞ্চাশ হিসেবে পিন কোড নম্বর পেলেও ওটা আদতে শহরতলিই। শুধু শহরতলিই নয়, গ্রাম বলতে চোখের সামনে যে ছবি ফুটে ওঠে, খানিকটা সে রকমই। সোনারপুর স্টেশন থেকে অটোতেই লেগে যায় আট-দশ মিনিট।
— মাধ্যমিক পরীক্ষায় যদি ফার্স্ট ডিভিশন পাস, তা হলে তুই যা চাইবি তাই দেব। রোকনের বাবা এ কথা বলতেই রোকন বলেছিল, ঠিক আছে, শুধু ফাস্ট ডিভিশন নয়, ফাস্ট ডিভিশনের সঙ্গে আমি তোমাকে অন্তত দুটো লেটারও এনে দেব।
না। শুধু দুটো লেটারই নয়, মাধ্যমিকে ও স্টার পেয়েছিল। বাবা এত খুশি হয়েছিলেন যে, সে দিনই ব্যাঙ্ক থেকে কড়কড়ে একগাদা টাকা তুলে ওকে সঙ্গে করে মোবাইলের দোকানে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, নে, তোর যেটা পছন্দ হয়, নে।
রোকন নিয়েছিল। ফেরার সময় বাবা বলেছিলেন, এ বার আর এখানে নয়, ইলেভেন-টুয়েলভটা তোকে কলকাতার স্কুলে পড়াব। পরীক্ষায় শুধু স্টার পেলেই তো হবে না। একটু চালাক-চতুরও হতে হবে। সব কিছু জানতে হবে। শিখতে হবে। শহরমুখী হতে হবে। সেটা শহরে না গেলে হবে না।
রোকন বলেছিল, ঠিক আছে।
রোকনের বাবা রোকনকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন কলকাতার গোলপার্কের কাছে একটি নামকরা স্কুলে। ওখানে ভর্তি করার আর একটা কারণ ছিল, ওই স্কুলের সামনেই রামকৃষ্ণ মিশন। ওখানে স্পোকেন ইংলিশ শেখায়। স্কুল ছুটি হয়ে গেলে ছেলে যাতে একটু হেঁটেই টুক করে ওখানে গিয়ে ওটা শিখতে পারে, সে জন্য।
বালিগঞ্জ পর্যন্ত ট্রেনের মান্থলি কেটে দিলেও একটা ছেলের দৈনিক হাতখরচা যতটা লাগার কথা, ওর বাবা হিসেব করে তার থেকেও অনেক অনেক বেশি টাকা দিতেন রোকনকে। ছেলেকে যাতে কখনও সমস্যায় পড়তে না হয়।
সেই টাকা বাঁচিয়ে রোকন যে মোবাইলে ইন্টারনেট ভরে, ওর বাবা সেটা অনেক পরে জেনেছিলেন। যখন দেখেছিলেন, ছেলে সারাক্ষণই ফোন নিয়ে হয় ঘাঁটাঘাঁটি করছে, নয়তো কানে হেডফোন গুঁজে এক মনে গান শুনছে।
আগে রাত এগারোটা বাজলেই যে ছেলে শুয়ে পড়ত, এমনকী মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়ও এর অন্যথা করেনি— সে কিনা ইদানীং রাত দেড়টা-দুটোতেও মোবাইল নিয়ে বসে থাকে! বাথরুম করতে উঠে কত দিন ওর বাবা দেখেছেন। কোনও কোনও দিন হয়তো বলেছেন, কী রে, এখনও ঘুমোসনি? অনেক রাত হল যে। এ বার শুয়ে পড়। সকালে উঠতে হবে তো।
— হ্যাঁ, এই তো শুচ্ছি।
অনেক বেলা করে ঘুম থেকে উঠত রোকন। তবু ওকে ওর বাবা-মা কোনও বকাঝকা করতেন না। ছেলে বড় হয়েছে, কখন কোন কথায় মনে আঘাত পাবে, কখন কী করে বসবে, কিছু বলা যায়! এই তো ক’দিন আগেই, গায়ে হাতও তোলেননি, বাবা সামান্য একটু বকেছেন দেখে ওঁদের এলাকারই একটা ছেলে সোজা চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে গলায় গামছা বেঁধে ঝুলে পড়েছিল।
ছেলে যাতে কোনও আঘাত না পায় সে জন্য যে বাবা-মা এত তটস্থ থাকেন, সেই বাবা-মাকেই কিনা শুনতে হল…
ক’দিন ধরেই ওদের ক্লাসের বায়োলজির শিক্ষক রোহনকে খেয়াল করছিলেন। কেমন যেন একটু মনমরা ভাব। আগের মতো পড়াশোনাতেও আর মন নেই। ক্লাসের মধ্যেই মোবাইল নিয়ে সারাক্ষণ কী যেন করে।
আসলে বেশ কিছু দিন যাবৎ ব্লু হোয়েল গেম নিয়ে গোটা পৃথিবী জুড়ে খুব হইচই হচ্ছে। রাশিয়ার এক মনস্তত্ত্বের ছাত্র ফিলিপ বুদেকিং নাকি এই আত্মঘাতী নীল তিমির খেলাটা তৈরি করেছিল। পঞ্চাশ পর্বের এই খেলাটা একেবারে নেশার মতো। একবার শুরু করলে ওটার কবল থেকে বেরিয়ে আসা খুব মুশকিল। মাঝপথে ছাড়াও যায় না। এবং প্রতিটি পদক্ষেপই শুধু যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা নয়। এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে, শেষ পর্বে যাওয়ার অনেক আগেই কেউ কেউ একেবারে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। এই খেলায় যেমন আছে মধ্যরাতে উঠে ভয়ঙ্কর ভয়ের সিনেমা দেখা, তেমনই আছে বহুতল বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপ দেওয়া, আছে হাতের উপরে ধারালো কিছু দিয়ে তিমি মাছ আঁকা।
এই খেলায় মেতে উঠে কত ছেলেমেয়ে যে বাবা-মায়ের কোল শূন্য করেছে, হিসেব নেই। তাই শুধু বাবা-মা কিংবা নিকট আত্মীয়স্বজনদের উপর ভরসা রাখতে পারছে না। মহামারির আকার নেওয়া এই খেলাটাকে বন্ধ করার জন্য সরকার নিজেই উঠেপড়ে লেগেছে। নতুন নতুন অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারই একটা হল, স্কুলে স্কুলে সচেতনতা শিবির। ছাত্রছাত্রীদের উপরে শিক্ষকদেরও নজর রাখতে বলা হয়েছে। আর এটা হওয়ার ফলেই…
বায়োলজির সেই শিক্ষকের হঠাৎ কী মনে হল, তিনি সোজা রোকনের কাছে গিয়ে বললেন, এই তোর জামার হাতাটা একটু গোটা তো।
— কেন স্যার?
— গোটা না…
প্রথমে ইতস্তত করলেও শিক্ষকের চাপের কাছে নত হয়েছিল রোকন। এবং জামার ফুল হাতাটা আস্তে আস্তে উপর দিকে তুলতে শুরু করেছিল। আর তখনই শিক্ষকমশাই একেবারে চমকে উঠলেন, যা সন্দেহ করেছিলেন, তাই। ছাত্রের হাতে ধারালো ছুরি জাতীয় কোনও কিছু দিয়ে একটা তিমি মাছ আঁকা। সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হল হেড মাস্টারের কাছে। স্কুল সেক্রেটারির কাছে। স্থানীয় থানায় এবং রোকনের বাড়িতে।
মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল সেই খবর। মুহুর্মুহু সম্প্রচারিত হতে লাগল নিউজ চ্যানেলগুলোতেও।
রোকনের আত্মীয়স্বজনেরা ফোন করে বারবার খোঁজখবর নিতে লাগলেন। কেউ কেউ সোজা বাড়িতে এসে হাজির হলেন। পাড়ার মেয়ে-বউরা গুজগুজ ফুসফুস শুরু করে দিল। থানা থেকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রোহনকে জিপে করে বাবা-বাছা করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেলেন। ওর বাবা-মাকে বলে গেলেন, ওর হাতের সামনে ছুরি, ব্লেড, এমনকী জ্যামিতি বক্সের কম্পাসও রাখবেন না। ও কিন্তু ওই কম্পাস দিয়েই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হাতের মধ্যে ওটা এঁকেছে। ও নিজেই সেটা স্বীকার করেছে। বলেই, পকেট থেকে রোকনের মোবাইলটা বের করে ওর বাবার হাতে দিয়ে পুলিশ অফিসারটি বললেন, এটা আপনার কাছে ক’টা দিন রাখুন। ওকে দেবেন না। আর ওর দিকে একটু খেয়াল রাখবেন। ওর ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ নেই তো?
রোকনের বাবা বলেছিলেন, না। ও সব নেই।
কিন্তু পুলিশের জিপ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ-মুখ পাল্টে গেল রোকনের। মোবাইলের জন্য কেমন যেন মরিয়া হয়ে উঠল সে। বাপ-বেটায় শুরু হয়ে গেল তর্কাতর্কি। চিৎকার-চেঁচামেচি। মোবাইল নিয়ে কাড়াকাড়ি। ধাক্কাধাক্কি। যেন দক্ষযজ্ঞ বেঁধে গেছে বাড়িতে।
আশপাশের লোকজন ছুটে এল। খবর পেয়ে পাশের বাড়ি থেকে হাজির হল টুম্পা। এতক্ষণ ধরে গোটা বাড়িময় দাপাদাপি করলেও টুম্পাকে দেখামাত্রই রোকন যেন একটু কেমন হয়ে গেল। মনে হল, ওকে দেখেই একটু দমে গেছে। ধীরে ধীরে শান্ত হতে লাগল সে। ওটা দেখে কেউ কেউ মনে মনে বলল, শান্ত হবে না? ও রকম দশাসই চেহারা আর মাসল দেখলে আচ্ছা আচ্ছা উগ্রপন্থীরাও ঝটপট করে এসে সব অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করবে। আর ও তো ও…
যে ছেলেটা কারও কথায় কর্ণপাত করছিল না, শুনছিল না কারও অনুরোধ-উপরোধও, কেউ কিছু বলতে গেলেই কেমন যেন মারমুখী হয়ে উঠছিল— সেই রোকনের চোখের দিকে তাকিয়ে টুম্পা মাত্র একবার বলতেই সুড়সুড় করে টুম্পার পিছু পিছু পাশের ঘরে চলে গেল রোকন।
মাত্র মিনিট পাঁচেক। দরজা বন্ধ করে টুম্পা ওকে কী বুঝিয়েছে কে জানে! যখন দরজা খুলল, সবাই দেখল— কোথায় সেই উগ্রচণ্ডী রোকন! এ তো শান্ত দিঘির চেয়েও শান্ত, শীতল। একেবারে টলটল করছে।
বাইরে বেরিয়ে রোহন নিজেই একটু আগে বাবার হাত থেকে জোর করে কেড়ে নেওয়া মোবাইলটা বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, বাবা, এটা এখন তোমার কাছে থাক। আমি কয়েক দিন পরে নেব…
ছেলের কথা শুনে শুধু রোকনের বাবাই নন, এতক্ষণ ধরে উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাড়া-প্রতিবেশীরাও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রোকন আর টুম্পার দিকে।
৬
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে টুম্পা যখন দেখল মোবাইলের চার্জ একদম তলানিতে এসে টিপ টিপ করছে, তখন মোবাইলটা অফ করে চার্জে বসিয়েছিল ও। যত সকালেই উঠুক না কেন, ঘুম থেকে উঠেই ও যাতে দেখতে পায় ফুল চার্জ হয়ে গেছে। কিন্তু এ কী! ফোন খুলেই ও দেখল, আটখানা মিসড্ কল! আর প্রত্যেকটা ফোনই মামির। মামি তো সাধারণত ওকে ফোন করে না। তা হলে কি কোনও গণ্ডগোল হয়েছে! কাল রাতে তো মামা বাড়ি ছিল! তা হলে! সঙ্গে সঙ্গে রিং ব্যাক করল টুম্পা। তিনটে রিং হতে না হতেই শেফালি ফোন ধরল, হ্যালো…
— ফোন করেছিলে?
অত্যন্�

