৭ অক্টোবর শুরু হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা আয়োজন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা। ২০২৬ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা চলবে ৭ থেকে ১১ অক্টোবর। আয়োজকদের ভাষায়, এটি শুধু বই প্রদর্শনের জায়গা নয়; আন্তর্জাতিক প্রকাশনা শিল্পের ব্যবসায়িক যোগাযোগ, কপিরাইট ও অনুবাদ অধিকার, নতুন অংশীদারত্ব এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক কেন্দ্র।
এই মেলায় বাংলাদেশ ২০১৪ সাল থেকে সরকারি উদ্যোগে অংশ নিয়ে আসছে। দীর্ঘ এক যুগের এই অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করার একটি ধারাবাহিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশক, সাহিত্যিক, এজেন্ট ও প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রকাশকদের যোগাযোগও তৈরি হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতারই স্বাভাবিক পরিণতি হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের মেলাটি।
কিন্তু এবার সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিষয়টি শুধু একটি বইমেলায় বাংলাদেশের একটি স্টল থাকবে কি থাকবে না—এমন সামান্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বাংলা বইয়ের অনুবাদ, কপিরাইট ও প্রকাশনা-অধিকার বাণিজ্য এবং দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক পরিচিতির প্রশ্ন জড়িত।
জানা গেছে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে বার্লিনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ২০২৬ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের জন্য স্টল বুকিং দিয়েছে। অর্থাৎ প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যদি শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় অংশগ্রহণে সম্মতি না দেয়, তাহলে এই বুকিংয়ের আর্থিক দায় কে নেবে? ইতোমধ্যে যে সরকারি অর্থ ও প্রশাসনিক শ্রম ব্যয় হয়েছে, তার দায়ই বা কীভাবে নির্ধারিত হবে?
আরও উদ্বেগজনক অভিযোগ হচ্ছে, বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে এ বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি পাঠানো হলেও মন্ত্রণালয় থেকে সেসব চিঠির কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি নিজেও সংস্কৃতিমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি; কিন্তু তাদের কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এমন নীরবতা কি গ্রহণযোগ্য?
প্রশ্নটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে যখন আমরা ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার প্রকৃতি বুঝি। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মেলায় ৪,৩৫০ জন প্রদর্শক, ২ লাখ ৩৮ হাজার দর্শনার্থী এবং ৭,৮০০ জন গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত ছিলেন। ২০২৬ সালের মেলাতেও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে যোগাযোগ, অধিকার বাণিজ্য, অনুবাদ ও নতুন অংশীদারত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অতএব, কোনো দেশ এই মেলায় অংশ নিলে তার উদ্দেশ্য কেবল কয়েকটি বই প্রদর্শন করা নয়। উদ্দেশ্য হলো নিজের ভাষা ও সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরা, বিদেশি প্রকাশকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, অনুবাদের সম্ভাবনা সৃষ্টি করা, কপিরাইট ও প্রকাশনা-অধিকার নিয়ে আলোচনা করা এবং নিজ দেশের প্রকাশনা শিল্পকে বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা।
বাংলাদেশের জন্য এই সুযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষায় বিপুল সাহিত্য সৃষ্টি হলেও বিশ্বের বড় প্রকাশনা বাজারে বাংলা বইয়ের উপস্থিতি এখনো সীমিত। বাংলা সাহিত্যকে অন্য ভাষায় অনুবাদ এবং বিদেশি সাহিত্যকে বাংলায় অনুবাদের জন্য আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি।
গতবারের মেলায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশকদের যোগাযোগ ও মতবিনিময় হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এমনকি কয়েকটি বিদেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রকাশিত বই বাংলায় অনুবাদ করে বাংলাদেশের প্রকাশকদের মাধ্যমে প্রকাশের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল বলেও জানা গেছে। যদি এই যোগাযোগের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের মেলায় বাস্তব চুক্তি বা সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে সেই সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এখানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন করা দরকার—ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণে ‘দেশের লাভ কী’, এই প্রশ্ন কি আদৌ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে?
যদি মন্ত্রণালয়ের কাছে লাভ বলতে কেবল তাৎক্ষণিক রাজস্ব আয় বোঝায়, তাহলে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক কূটনীতি, অনুবাদ অধিকার, কপিরাইট বাণিজ্য, প্রকাশনা-ব্যবসার নেটওয়ার্ক এবং বাংলাদেশের সাহিত্যকে বিশ্বে পরিচিত করার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য তারা কীভাবে হিসাব করছে?
রাষ্ট্রের সংস্কৃতি নীতি কি শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে ?
একটি দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক উপস্থিতি ও পরিচয় নির্মাণের অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের সাহিত্য, ভাষা ও প্রকাশনা শিল্পকে আন্তর্জাতিক বইমেলায় তুলে ধরে। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি তাই কেবল একটি স্টল হারানোর ঘটনা নয়—এটি একটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুযোগ হারানোরও ঘটনা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে, যদি সত্যিই দূতাবাসের পক্ষ থেকে একাধিক চিঠির কোনো জবাব না দিয়ে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক ধীরগতি নয়; এটি দায়িত্ব পালনের প্রশ্নও উত্থাপন করে।
কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—অংশগ্রহণ করা হবে অথবা হবে না—তা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতা কোনো নীতিই হতে পারে না। বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক মেলার স্টল বুকিং হয়ে গেছে, অর্থনৈতিক দায় তৈরি হয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রকাশকদের জন্য সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দরজা খোলা রয়েছে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল বিষয়টি নিয়ে প্রকাশনা শিল্পের প্রতিনিধি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, সংশ্লিষ্ট প্রকাশক, দূতাবাস এবং আন্তর্জাতিক বইমেলা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া। প্রয়োজন হলে অংশগ্রহণের অর্থনৈতিক সুফল, কপিরাইট ও অনুবাদ সম্ভাবনা, সাংস্কৃতিক কূটনীতির মূল্য এবং ভবিষ্যৎ প্রকাশনা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন করা যেত।
তার পরিবর্তে যদি চিঠির উত্তর না দিয়ে, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা না বলে, কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়—তাহলে সেটি প্রশাসনিক বিচক্ষণতার পরিচয় হবে না।
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। এই অবস্থায় যে আন্তর্জাতিক দরজাগুলো ধীরে ধীরে খুলছে, সেগুলো বন্ধ করার পরিবর্তে আরও সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো দরকার। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা সেই দরজাগুলোর একটি।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে তাই জবাব চাইতেই হয়: বাংলাদেশ কেন যাবে না? অংশগ্রহণ না করার সুনির্দিষ্ট কারণ কী? দূতাবাসের চিঠিগুলোর উত্তর দেওয়া হয়নি কেন? ইতোমধ্যে বুকিং করা স্টলের আর্থিক দায় কী হবে? এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের সঙ্গে সম্ভাব্য অনুবাদ ও প্রকাশনা-চুক্তির যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটির মূল্যায়ন কে করেছে?
এই প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় চাইলে এখনো পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। কারণ ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা কেবল পাঁচ দিনের একটি অনুষ্ঠান নয়। এটি বিশ্বের প্রকাশনা শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল—যেখানে বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, কপিরাইট, ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও লেনদেন হয়।
বাংলাদেশ সেখানে থাকবে কি থাকবে না—এ সিদ্ধান্ত তাই কোনো আমলাতান্ত্রিক ফাইলে আটকে থাকার বিষয় হতে পারে না।
একটি দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যদি দেশের সাহিত্য ও প্রকাশনা শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রসারের সুযোগকে ‘লাভ কী’ প্রশ্নে থামিয়ে দেয়, অথচ সেই লাভের দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়নই না করে, তাহলে সেটি নিছক ভুল সিদ্ধান্ত নয়—এটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক সম্ভাবনার প্রতি অবহেলার শামিল।
সময় খুব কম। এখন প্রয়োজন নীরবতা নয়, সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত; গড়িমসি নয়, দায়িত্বশীলতা; এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের সাহিত্য ও প্রকাশনা শিল্পের আন্তর্জাতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
ফ্রাঙ্কফুর্টের দরজা বাংলাদেশের জন্য খোলা। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ নিজেই কি সেই দরজা দিয়ে ঢুকতে প্রস্তুত ?
লেখক: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

