লন্ডন বইমেলা ২০২৭

আইরিন পারভিন খান :বইয়েরও ভ্রমণ আছে। লেখকের ভাবনা থেকে পাঠকের হাতে পৌঁছানোর পথে একটি বই পেরিয়ে যায় ভাষা, দেশ আর সংস্কৃতির সীমানা। সেই যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষদের অন্যতম আন্তর্জাতিক মিলনস্থল লন্ডন বইমেলা। ২০২৭ সালে এই আয়োজনের ঠিকানা বদলাচ্ছে। পশ্চিম লন্ডনের ঐতিহাসিক অলিম্পিয়া থেকে মেলা যাচ্ছে পূর্ব লন্ডনের রয়্যাল ভিক্টোরিয়া ডকের পাশে এক্সেল লন্ডনে। আগামী ১৬ থেকে ১৮ মার্চ সেখানে বসবে তিন দিনের মেলা।

১৯৭১ সালে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা লন্ডন বইমেলা আজ বিশ্ব প্রকাশনাজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ মিলনক্ষেত্র। এখানে প্রকাশক, লেখক, সাহিত্যিক এজেন্ট ও বই বিক্রেতাদের দেখা হয়; অনুবাদ ও প্রকাশনার স্বত্ব নিয়ে আলোচনা চলে; একটি দেশের গল্প অন্য দেশের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর পথ তৈরি হয়। নতুন বইয়ের পাশাপাশি এখানে জন্ম নেয় নতুন সহযোগিতা, নতুন অনুবাদ এবং ভবিষ্যতের বহু প্রকাশনার সম্ভাবনা।

অলিম্পিয়ার কথা উঠলে প্রথমেই মনে আসে তার সুবিশাল কাচের ছাদ। পশ্চিম লন্ডনের ওয়েস্ট কেনসিংটনে অবস্থিত এই প্রদর্শনীকেন্দ্রের উদ্বোধন হয় ১৮৮৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর। ভিক্টোরীয় স্থাপত্য, বাঁকানো উঁচু ছাদ, চারপাশের গ্যালারি এবং ভেতরে ছড়িয়ে পড়া দিনের আলো গ্র্যান্ড হলকে দিয়েছে স্বতন্ত্র চরিত্র। দেড় শতাব্দীর কাছাকাছি সময় ধরে নানা প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সাক্ষী এই ভবন লন্ডনের ইতিহাসেরও একটি অংশ।

এই ঐতিহাসিক পরিবেশ বইমেলাকে দিয়েছিল আলাদা এক আবহ। কাচের ছাদের নিচে পাশাপাশি সাজানো প্রকাশকদের স্টল, ব্যস্ত বৈঠক আর বই নিয়ে কথোপকথনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বছরের স্মৃতি। তাই ভেন্যু বদলের ঘোষণায় অলিম্পিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও বিদায়ের আবেগও প্রকাশ করেছেন মেলার আয়োজকেরা।

তবে লন্ডন বইমেলা শুরু থেকেই একটিমাত্র ঠিকানায় ছিল না। বিভিন্ন সময়ে ভেন্যু বদলেছে। ২০০৬ সালে এক্সেলে মেলা হয়েছিল; এরপর আয়োজন চলে যায় আর্লস কোর্টে। ২০১৫ সালে মেলা অলিম্পিয়ায় ফিরে আসে এবং পরবর্তী সময়ে এই ঐতিহাসিক ভবনই হয়ে ওঠে তার পরিচিত ঠিকানা। তাই ২০২৭ সালের পরিবর্তন এক অর্থে এক্সেলে ফিরে যাওয়া, তবে বদলে যাওয়া যোগাযোগব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার এক নতুন পরিবেশে।

অলিম্পিয়ার সঙ্গে বিদায়ের আবেগ থাকলেও নতুন ভেন্যু বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে বাস্তব প্রয়োজন। প্রকাশনাশিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর আয়োজকেরা আরও স্বচ্ছন্দ, সহজে চলাচলযোগ্য এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের উপযোগী পরিসরের দিকে এগিয়েছেন। বেশি বসার জায়গা, উন্নত বৈঠককক্ষ, খাবারের সুবিধা এবং শক্তিশালী ইন্টারনেট সংযোগকে তাঁরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

রয়্যাল ভিক্টোরিয়া ডকের জলঘেরা পরিবেশে এক্সেল লন্ডন মেলাকে দেবে ভিন্ন এক আবহ। আধুনিক প্রদর্শনী হল ও সম্মেলনকক্ষের পাশাপাশি এখানে রয়েছে প্রশস্ত জনপরিসর। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, মেলার জন্য ব্যবহৃত হবে ২০২৫ সালে চালু হওয়া নতুন ICC Expansion অংশ। সিঁড়ি ব্যবহার না করেও চলাচলের ব্যবস্থা এবং প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের উপযোগী সুবিধা অংশগ্রহণকে আরও সহজ করবে। দীর্ঘ সময় মেলায় কাটানো মানুষের জন্য বিশ্রাম ও বসার সুযোগও একটি বড় প্রাপ্তি।

দর্শনার্থীদের জন্য নতুন ঠিকানার অন্যতম সুবিধা যাতায়াত। Elizabeth line ধরে হিথ্রো বিমানবন্দর এবং মধ্য লন্ডনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন থেকে সরাসরি Custom House পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে এক্সেলের পশ্চিম প্রবেশপথে যাওয়া সহজ। DLR দিয়েও Custom House অথবা Prince Regent স্টেশনে নেমে ভেন্যুতে পৌঁছানো যায়। কাছেই রয়েছে London City Airport। বিদেশ থেকে আসা প্রকাশক ও দর্শনার্থীদের জন্য এই সংযোগগুলো বিশেষভাবে উপকারী।

থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাও সফর পরিকল্পনার একটি সুবিধাজনক দিক। এক্সেলের আশপাশে রয়েছে একাধিক হোটেল, আর ভেন্যুর ভেতরে ক্যাফে ও খাবারের নানা বিকল্প। মেলার ব্যস্ততার শেষে ডকের ধারে কিছুটা সময় কাটানো কিংবা কাছের Canary Wharf ঘুরে দেখা সফরে যোগ করতে পারে বাড়তি আনন্দ। বই ও মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের পাশাপাশি পূর্ব লন্ডনকেও নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ থাকবে।

অলিম্পিয়ার কাচের ছাদের নিচে গড়ে ওঠা স্মৃতিগুলো মেলার ইতিহাসেই থাকবে। সেই স্মৃতি সঙ্গে নিয়েই এবার নতুন ঠিকানায় মিলিত হবে প্রকাশনাজগতের মানুষ। নতুন কোনো লেখকের প্রথম পরিচয়, একটি অনুবাদের সম্ভাবনা কিংবা বহুদিনের পরিচিত সহকর্মীর সঙ্গে দেখা, এমন ছোট ছোট মুহূর্তেই আবার প্রাণ পাবে লন্ডন বইমেলা।

এই মেলা মূলত প্রকাশনাশিল্পের পেশাগত আন্তর্জাতিক আয়োজন। অংশগ্রহণের নিবন্ধন, প্রবেশের শর্ত এবং সর্বশেষ সময়সূচি অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেখে সফরের পরিকল্পনা করা ভালো।

তথ্যসূত্র:

  • The London Book Fair — ভেন্যু পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

  • The London Book Fair — ঠিকানা যাতায়াত ও সময়সূচি

  • Olympia — ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড হল

  • University of Sheffield Archives — অলিম্পিয়ার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

  • London Book Fair — মেলার ইতিহাস ও পুরোনো ভেন্যু

 

  • ছবি: এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী চিত্র; ভেন্যুর প্রকৃত আলোকচিত্র নয়।

 

আইরিন পারভিন খান 

সহযোগী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.