আমাদের জাতি মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী একসাথে উদযাপনের সুযোগ পেয়েছে। এটা এক দুর্লভ প্রাপ্তি। আমি নিজেও এ উদযাপনে শরিক হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। সেই সাথে সর্বকালের আমাদের সেই মহান নেতা এবং স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী ও স্বাধীনতাকামী সবাইকে বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।
আমাদের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেয়া খোকাবাবুর বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা হয়ে উঠা আর শত বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জন- কোনটিই মসৃণ ছিল না। কোন গোল টেবিল বৈঠকে সমঝোতার মাধ্যমে জাতির পিতার স্বীকৃতি বা স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হয়নি। এজন্য আমাদের পূর্বসূরীদের যুগ যুগ ধরে দুর্গম পথে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। সেসব আমাদের গৌরবগাঁথা ইতিহাস এবং আমিও সেই ইতিহাসের শেষের দিকের একজন ক্ষুদ্র সাক্ষী হিসেবে গৌরব বোধ করি। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয়দফা ঘোষণার সময়ে কাকতালীয় হলেও আমার বয়স তখন ছয় বছর চলছে। সেসময়ে বঙ্গবন্ধুর সেই ছয়দফার মর্মার্থ বুঝার বা উপলব্ধি করার ভার-বুদ্ধি কোনটিই আমার ছিল না। তবে আমার রক্তে জন্মগতভাবে বিদ্রোহের বীজ থাকায় না বুঝেই স্লোগান দিতাম ‘ছয়দফা মানতে হবে, নইলে গদি ছাড়তে হবে’। তারপরে আবার স্লোগান আসলো ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’। তখনো না বুঝেই আমি চাইতাম পৃথিবীর সব জেলের তালা ঠিক থাকলেও যেখানে বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়েছে সেই তালা ভাঙতে হবে। এভাবে ৬ দফা, ১১ দফা, ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০ এর নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধ- এসবে না বুঝে বা কিছুটা বুঝেই জড়িয়ে পড়লাম। ১৯৭০-৭৩ সাল পর্যন্ত তিন তিনবার বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। দেবদারু গাছের ডালপালা কেটে ‘বঙ্গবন্ধু তোরণ’ নামে গেইট করে এলাকার অনেকের সাথে দাঁড়িয়ে থেকেছি এবং বঙ্গবন্ধুকে আমার পিতার সাথে কোলাকুলি করতে দেখেছি। তাই আজ আমারও মনে হচ্ছে আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু তিনবার বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। এটা আমার ক্ষুদ্র জীবনের এক বড় প্রাপ্তি।
১৯৭৫ সালে আমি আমার দুটো পিতাকেই (প্রথমে জাতির পিতা এবং এর মাস দেড়েক পরে জন্মদাতা পিতা) নৃশংসভাবে হারিয়ে দোহারা এতিম হই। স্বাধীনতা পরবর্তী ধ্বংসস্তুপের উপর বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে দেশ যখন নতুনভাবে গড়ে উঠছিল, তখন এদেশের রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবীদের কার কি ভূমিকা ছিল, কাদের প্ররোচণায় স্বাধীনতা বিরোধী চরমপন্থী-উগ্রপন্থী এসব অতিবিপ্লবীরা সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল, কারা ষড়যন্ত্র করে বাসন্তীর গায়ের শাড়ি পালটিয়ে জাল পরিয়ে বিকৃত ছবি বিদেশে পাচার করেছিল সেসব প্রশ্নের উত্তর আজও জাতির কাছে স্পষ্ট নয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী দল দীর্ঘদিন দেশ পরিচালনা করছে। আমরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার পেয়েছি, মানবতাবিরোধী শীর্ষ অপরাধীদের বিচার পেয়েছি, টেকসই ও মর্যাদা সম্পন্ন উন্নয়নশীল রাষ্ট্র পেয়েছি। আমাদের প্রজন্মের চাওয়া-পাওয়া অনেকটাই আজ পূরণ হয়েছে। কিন্তু আফসোস, দেশটা ধান্ধাবাজ ভাসমান জয় বাংলার লোকে ভরে যাচ্ছে। এরা জোয়ারের সাথে আসে, ভাটার সাথে চলে যায়। কিন্তু আমাদের দেশের জন্য প্রয়োজন আরও কর্ণেল জামিল, যিনি বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুক্ষণে শেষ আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন ‘স্যার, আমি আসছি’। আজ আমাদের নূর হোসেন কোথায়, যে ছেলেটি বুকেপিঠে স্লোগান লিখে বঙ্গবন্ধু কন্যাকে বলেছিল ‘আপা আমি মিছিলে যাচ্ছি’। আজকের তোষামোদকারী এবং অতি মাত্রায় ‘জয় বাংলা’ বলা লোকগুলোকে মহাসংকটে কাছে পাওয়া যাবে না।
‘৭৫ পরবর্তী সময়ে আমরা যখন স্লোগান দিতাম, ‘মাগো তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব’, তখন এই ভাসমানদের কেউ কেউ খুনিদের সাথে তাল মিলিয়ে পাল্টা স্লোগান দিত ‘এক নেতা এক দেশ, এক রাতেই গুষ্টি শেষ’। আজ ভাবছি ওদের স্লোগানটি নির্মম মনে হলেও প্রথম অংশটুকু ছিল বাস্তবতা, যা আজ ইতিহাস। কেননা একটি জাতির স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর মত একজন জাতীয়তাবাদী নেতার প্রয়োজন হয়। এজন্য সে জাতিকে যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করতে হয়। শতসহস্র বছরের সাধনা ও অপেক্ষার পর আজ হতে শতবর্ষ পূর্বে সৃষ্টকর্তা আমাদের জাতির মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুকে পাঠিয়েছিলেন। তাই ইতিহাসের সেই মহান নেতা যখন ১৯৭১ এর ৭ই মার্চে বললেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল’, এদেশের মানুষ তাই করলেন। নেতা আরও বললেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’, এদেশের মানুষ সেভাবেই প্রস্তুতি নিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের উক্ত স্লোগানের দ্বিতীয় অংশে ছিল উল্লাস ও দম্ভ প্রকাশ যা স্বয়ং বিধাতারও পছন্দ হয়নি। কেননা খুনিরা একরাতেই গুষ্টি শেষ হয়েছে ভাবলেও বাস্তবে তা হয় নি। অর্থাৎ তারা খেলা শেষ মনে করলেও সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় বাঙালী জাতির জন্য আরও উইকেট ছিল যা আজ দৃশ্যমান এবং বাঙালী জাতিসহ সারা বিশ্ব সেই খেলা উপভোগ করছে।
আজ স্বাধীনতার এই সুবর্ণ জয়ন্তীতে ভাবছি আমার পিতার আত্মত্যাগের দাম কত! এভাবে একজন শহিদের আত্মত্যাগের মূল্যটা টাকার অংকে বের করতে পারলেই ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তঋণের মূল্য বের করা সহজ হত। অথবা আমার মা বা বোনের ইজ্জতর দাম কত? এটার মূল্য ধরে নিতে পারলে অতি সহজেই দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের মূল্য বের হয়ে আসত। আমরা যারা এই ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুবিধাভোগী তাদের কিছুটা হলেও ঋণ শোধ করার দায় তো রয়েই যায়। কিন্তু টাকার অংকে তো এই হিসাব মিলাতে পারছি না, ডলারেও না। হিসাবশাস্ত্রে নাকি এ ঋণের মূল্য নির্ধারণের কোন সূত্রই আবিষ্কার হয় নি। এই ডিজিটাল যুগেও ছোট্ট এই হিসাবটি মিলাতে না পেরে অগত্যা চোখ বন্ধ করে বসে আছি। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি আমার সামনে কিছু বর্ণমালা চক্রাকারে ঘুরছে। ভালভাবে খেয়াল করলাম, এগুলো হিসাবসংক্রান্ত কোন সংখ্যা নয়। নিছকই এলোমেলো কিছু বাংলা বর্ণমালা। বর্ণমালাগুলো শিশুমন দিয়ে সাজাবার চেষ্টা করলাম। যা পেলাম তা হল- ১। শেখ মুজিব ২। স্বাধীনতা।

জাহীদ হোসেন
সমাজকর্মী

