একজন রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর চারপাশের মানুষের সংখ্যা নয়, বরং তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। তিনি কতজনের কথা শুনছেন, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—তিনি কার কথা কতটা শুনছেন এবং ভিন্নমতকে কতটা জায়গা দিচ্ছেন।
এই জায়গাতেই আজ একটি প্রশ্ন উঠছে।
প্রধানমন্ত্রীর মনের দৃষ্টিটা কি দূরগামী ? নাকি নাকের ডগার বাইরে তিনি আর কিছু দেখতে পাচ্ছেন না ? মনের গভীর স্তরে, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মননশীল কাজটি হওয়ার কথা, সেখানেও কি ধোঁয়া আর কুয়াশা জমেছে ?
প্রশ্নটি কঠিন, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংবাদমাধ্যমেও তাঁর নতুন দায়িত্ব পাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক। তাঁর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও কম নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী তিনি প্রশাসন ক্যাডারে কাজ করেছেন এবং অতীতে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া অস্বাভাবিক—এমন কথা বলা হচ্ছে না।
প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
বিএনপিতে কি আর কোনো যোগ্য মানুষ নেই?
বিএনপিতে বহু শিক্ষিত, অভিজ্ঞ, দায়িত্বশীল ও পরীক্ষিত নেতা রয়েছেন। সংসদীয় রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, আইন, নিরাপত্তা ও সাংগঠনিক রাজনীতিতে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারও দলটির কম নয়। তাহলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর ক্ষেত্রে বারবার একই ব্যক্তিকে সামনে আনার প্রয়োজন কেন তৈরি হচ্ছে ?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
কারণ একজন মন্ত্রী যতই যোগ্য হোন না কেন, একটি রাষ্ট্রের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যদি ক্রমশ একই ব্যক্তির কাঁধে এসে জমা হয়, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তির সক্ষমতার প্রশ্ন থাকে না; রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
এখানেই ‘বলয়’-এর প্রসঙ্গটি আসে।
প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে এমন একটি বলয় তৈরি হয়েছে কি না, যেখানে কয়েকজন মানুষ তাঁর কাছে নিয়মিতভাবে পৌঁছাতে পারছেন, অথচ দলের অন্য যোগ্য মানুষদের কণ্ঠস্বর তুলনামূলকভাবে দূরে সরে যাচ্ছে—এই প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
এটি কোনো ব্যক্তিকে হেয় করার প্রশ্ন নয়। বরং প্রধানমন্ত্রীর নিজের রাজনৈতিক সক্ষমতা ও বিচক্ষণতার প্রশ্ন।
একজন প্রধানমন্ত্রী যদি একই ব্যক্তির ওপর বারবার নির্ভর করেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণের মনে প্রশ্ন আসবে—এটি কি আস্থার বিষয়, নাকি বিকল্প নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা?
আরও একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ—সালাহউদ্দিন আহমদ কি নিজেই বারবার দায়িত্ব চাইছেন, নাকি প্রধানমন্ত্রী তাঁর ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিচ্ছেন? যদি প্রধানমন্ত্রীই তাঁকে একের পর এক দায়িত্ব দিয়ে থাকেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এমন কী বিশেষ মূল্য আছে তাঁর, যা দলের অন্য অভিজ্ঞ নেতাদের মধ্যে নেই?
আবার যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করা অপরিহার্য হয়, তাহলেও সেই ব্যাখ্যাটি জনগণের সামনে থাকা উচিত। গণতান্ত্রিক সরকারে ক্ষমতার সিদ্ধান্ত যত স্বচ্ছ হয়, সরকারের প্রতি আস্থাও তত শক্তিশালী হয়।
রাজনীতিতে ‘বিশ্বাসের মানুষ’ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল ব্যক্তিগত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সেখানে প্রতিষ্ঠান, দায়িত্বের বণ্টন, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং জবাবদিহি থাকতে হয়।
একজন প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে যদি কেবল এমন মানুষদের ভিড় বাড়তে থাকে যারা তাঁর সঙ্গে একমত, তাহলে বিপদটা সেখানেই। কারণ শাসকের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষ সবসময় প্রশংসাকারী নন; বরং যিনি প্রয়োজনের সময় বলেন—‘আপনার সিদ্ধান্তটি ভুল হতে পারে।’
রাষ্ট্র পরিচালনায় ভিন্নমত কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি নিরাপত্তাব্যবস্থা।
প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই দূরদর্শী হন, তাহলে তাঁর সামনে এখন একটি সুযোগ আছে। তিনি চাইলে প্রমাণ করতে পারেন যে তাঁর সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিবিশেষের ওপর অন্ধ নির্ভরতার ফল নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রয়োজন, যোগ্যতা ও পরিস্থিতির বিচারেই দায়িত্ব বণ্টন করা হচ্ছে।
তাই প্রশ্নটি সালাহউদ্দিন আহমদকে নিয়ে যতটা, তার চেয়ে বেশি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে।
কেন বারবার সালাহউদ্দিন ?
বিএনপির অন্য যোগ্য নেতারা কোথায় ?
তাদের দক্ষতা কি বিবেচনায় আসছে ?
নাকি প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে এমন একটি সীমিত বলয় তৈরি হয়েছে, যার বাইরে থাকা মানুষদের যোগ্যতা ও মতামত তাঁর কাছে পৌঁছাচ্ছে না ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই জাতি প্রত্যাশা করে।
কারণ রাষ্ট্রের প্রধান যদি নাকের ডগার বাইরে দেখতে না পান, তাহলে তাঁর চারপাশের কুয়াশা একসময় গোটা রাষ্ট্রকেই ঢেকে ফেলতে পারে।
আর যদি তিনি সত্যিই দূরদর্শী হন, তাহলে তাঁকে সেই কুয়াশা সরাতে হবে—নিজের চারপাশের বলয় ভাঙতে হবে, দলের বিস্তৃত নেতৃত্বকে কাজে লাগাতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে যে বাংলাদেশে দায়িত্ব বণ্টন হয় ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতা, প্রয়োজন ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
প্রধানমন্ত্রীর সামনে প্রশ্নটি তাই খুব সরল—
তিনি কি একজন ব্যক্তির ওপর আস্থা রাখছেন, নাকি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আস্থায় নিয়ে দেশ চালাচ্ছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর যত দ্রুত পরিষ্কার হবে, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থাও তত দ্রুত পরিষ্কার হবে।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক
শুদ্ধস্বর ডটকম

