ব্রিক্‌সের ঘোষণা : বিশ্বশান্তির অঙ্গীকার, নাকি পশ্চিমা পরাশক্তির বিরুদ্ধে নতুন মেরুকরণ ?

 

বিশ্ব রাজনীতি যখন যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং পরাশক্তির আধিপত্যের টানাপোড়েনে ক্রমেই অস্থির, তখন ব্রিক্‌সের যৌথ ঘোষণাপত্র নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বার্তা কি সত্যিই বিশ্বকে শান্তির দিকে নিয়ে যাবে, নাকি এটি কেবল পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে আরেকটি কূটনৈতিক মঞ্চের ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে?

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আজকের ব্রিক্‌স আর আগের ব্রিক্‌স নেই। এটি ক্রমশ এমন এক জোটে পরিণত হচ্ছে, যার সদস্যদের সম্মিলিত অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত শক্তি বিশ্বব্যবস্থার প্রচলিত ক্ষমতার ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জ করার মতো অবস্থানে পৌঁছেছে। ফলে ব্রিক্‌সের প্রতিটি রাজনৈতিক বক্তব্যেরই এখন আন্তর্জাতিক তাৎপর্য রয়েছে।

এবারের ঘোষণাপত্রে নাম না করে একতরফা শুল্কনীতির বিরোধিতা করা হয়েছে। নাম বলা হয়নি, কিন্তু ইঙ্গিত বুঝতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে এটি নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ—এসব এখন শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়; অনেক ক্ষেত্রেই ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অস্ত্র।

ব্রিক্‌স সেই ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রকে সমালোচনা করলেই কি বিশ্ব অর্থনীতিতে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে? অবশ্যই নয়। কারণ ব্রিক্‌সের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের মধ্যেও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং দ্বিপক্ষীয় বিরোধ রয়েছে। অতএব পশ্চিমা আধিপত্যের সমালোচনা করা সহজ; কিন্তু বিকল্প একটি ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা অনেক কঠিন।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কোনো রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুরোনো কৌশল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার আঘাত শেষ পর্যন্ত কতটা শাসকের ওপর পড়ে আর কতটা সাধারণ মানুষের জীবনে গিয়ে লাগে—সেটিই বড় প্রশ্ন। খাদ্য, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ও মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিষেধাজ্ঞা কেবল কূটনৈতিক অস্ত্র থাকে না; তা মানবিক সংকটে রূপ নেয়।

ব্রিক্‌স এই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু ব্রিক্‌সের নিজেদেরও প্রমাণ করতে হবে যে তারা শুধু পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করছে না; যে কোনো রাষ্ট্রের অন্যায় অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক আগ্রাসন কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও একই নৈতিক অবস্থান নিতে প্রস্তুত।

কারণ বিশ্ব এখন আর কেবল ‘পশ্চিম বনাম অ-পশ্চিম’ এই সরল সমীকরণে পরিচালিত হয় না। পৃথিবীর মানুষ জানতে চায়—কে অন্যায় করছে, কে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে, কে আন্তর্জাতিক আইন ভাঙছে। অপরাধীর পরিচয় মিত্র না প্রতিপক্ষ—এটি শান্তির রাজনীতির মাপকাঠি হতে পারে না।

ব্রিক্‌সের ঘোষণাপত্রে যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনা ও কূটনীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থানকে স্বাগত জানাতেই হয়। ইউক্রেন থেকে পশ্চিম এশিয়া—যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে পৃথিবীর একাধিক অঞ্চল। কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু, ধ্বংস হচ্ছে অবকাঠামো, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা। অথচ যুদ্ধ থামানোর চেয়ে অস্ত্র সরবরাহ, সামরিক জোট এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা যেন বেশি দৃশ্যমান।

এই বাস্তবতায় ব্রিক্‌স যদি সত্যিই শান্তির শক্তি হতে চায়, তবে তাকে বক্তৃতার বাইরে যেতে হবে। যুদ্ধবিরতির জন্য সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ, সংঘাতরত পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার কাঠামো তৈরিতে তাদের এগিয়ে আসতে হবে। শুধু ‘আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চাই’ বললে হবে না; আলোচনার টেবিলটি তৈরি করার রাজনৈতিক সাহসও দেখাতে হবে।

পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার নিন্দা ঘোষণাপত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশের জন্যই ঐচ্ছিক বিষয় হতে পারে না। সন্ত্রাসবাদকে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ বলে ভাগ করার সুযোগ নেই। যে সন্ত্রাস নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, তার বিরুদ্ধে অবস্থান সর্বজনীন হওয়া উচিত। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক বন্ধুত্ব কিংবা কৌশলগত সম্পর্কের কারণে সেই নীতিতে ছাড় দেওয়া হলে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়।

গাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদের দাবির সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানেও মূল প্রশ্ন ঘোষণাপত্রের ভাষা নয়—বাস্তব পদক্ষেপ। গাজার মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং একটি ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ব্রিক্‌স কি সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারবে? পারলে এই ঘোষণাপত্র ইতিহাসে গুরুত্ব পাবে; না পারলে এটি আরেকটি কূটনৈতিক বিবৃতি হয়েই থাকবে।

সবচেয়ে বড় সত্য হলো—ব্রিক্‌স জাতিসংঘ নয়, ন্যাটোও নয়। এর কোনো একক সামরিক কমান্ড নেই, একক পররাষ্ট্রনীতি নেই, এমনকি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থও সব ক্ষেত্রে এক নয়। ফলে পৃথিবীর যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষমতা ব্রিক্‌সের হাতে নেই। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানোর ক্ষমতা তাদের আছে।

আর এখানেই ব্রিক্‌সের প্রকৃত সম্ভাবনা।

যদি ব্রিক্‌স একটি বিকল্প আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারে, নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে পারে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জোরদার করতে পারে এবং সংঘাতের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে পারে—তাহলে বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে।

কিন্তু একটি বিপদও আছে। পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প তৈরি করতে গিয়ে যদি ব্রিক্‌স নিজেই আরেকটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্লকে পরিণত হয়, তবে বিশ্বশান্তি নয়, বরং নতুন মেরুকরণই তৈরি হবে। ‘এক মেরুর’ পৃথিবীর বদলে ‘দুই মেরুর’ পৃথিবীও শান্তির নিশ্চয়তা দেয় না। পৃথিবীর প্রয়োজন বহু মেরু নয় শুধু; প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক বহু-পাক্ষিকতা।

তাই ব্রিক্‌সের সামনে এখন ঐতিহাসিক সুযোগ। তারা চাইলে বিশ্বকে বলতে পারে—শক্তিশালী রাষ্ট্রের ইচ্ছাই আন্তর্জাতিক আইন নয়, নিষেধাজ্ঞাই কূটনীতির একমাত্র ভাষা নয় এবং যুদ্ধই সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু সেই কথার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হলে তাদের নিজেদের আচরণেও একই নীতির প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

ব্রিক্‌সের ঘোষণাপত্র পৃথিবীতে আগামীকাল শান্তি ফিরিয়ে দেবে না। কোনো ঘোষণাপত্রের সেই ক্ষমতাও নেই। কিন্তু এটি একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক সংকেত। এখন দেখার বিষয়, সেই সংকেত কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি বাস্তব কূটনীতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সংঘাত নিরসনের কার্যকর উদ্যোগে পরিণত হয়।

বিশ্ব আজ নতুন কোনো আধিপত্য চায় না; চায় ন্যায়, নিরাপত্তা ও শান্তি। ব্রিক্‌স যদি সত্যিই সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, তবে তাকে শুধু আমেরিকার সমালোচক হলে চলবে না—তাকে হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নির্মাতা।

ঘোষণাপত্র তাই শেষ কথা নয়। আসল পরীক্ষা এখন শুরু।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.