কোভিড-১৯ :মানুষেরই জয় হোক

অ্যাডভোকেট আনসার খান:পৃথিবীর দু’শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়া ভয়ংকর করোনা ভাইরাস মহামারী বিশ্বব্যবস্হার ভবিষ্যৎ রাজনীতি,অর্থনীতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাৎপর্যময় পরিবর্তন নিয়ে অাসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞজনেরা।এমনকি মানুষে-মানুষে সম্পর্ক নতুন ভাবে মুল্যায়িত হওয়ারও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কোনো একটা মহামারী যখনই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে তখন এর সাথে সকল মানুষের, অর্থ্যাৎ ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো, জাতি-ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের জীবনজীবিকা, অধিকার, স্বাধিকার ইত্যাদি নিয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তার বিষয়সহ সবকিছু জড়িত হয়ে পড়ে,এটা বিশ্বজনীন বাস্তবতার রূপ নেয়।এমন অবস্হায় মানুষ-মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।কারণ,এরূপ অবস্হায় প্রত্যেক মানুষই একে অন্যের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং কোনো মানুষই নিজেদেরকে নিরাপদবোধ করতে পারে না।কারণ,সবার মধ্যেই থাকে নিরাপত্তাহীনতার আশংকা।
কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে পৃথিবী ক্রসরোডে বা চৌরাস্তার মূখে এসে দাঁড়িয়েছে। এ মহামারী হোল প্রথমে ও সর্বাগ্রে একটা স্বাস্হ্য সংকট। তবে এটা দ্রূতই অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে,-যা রাষ্ট্রীয় সীমানা অতিক্রম করে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের রূপ ধারণ করছে। এর ফলে বেকারত্ব বা কর্মহীনতা,আয়হীনতা,আবাসনের সংকট, শিক্ষা ব্যবস্হায় সংকট,এমনকি খাবারের নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি দাঁড় করাবে বিশ্বসম্প্রদায়কে।অন্যদিকে শিল্প্ ও ব্যবসা-বানিজ্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর স্বাস্হ্যব্যবস্হা ভেঙে পড়বে ব্যাপকভাবে -যা সমগ্র মানবসম্প্রদায়কে প্রভাবিত করবে দীর্ঘমেয়াদে।
শ্রমিক ও ভোক্তাদের দ্বারা স্ব-বিচ্ছিন্নতা,কারখানা ও দোকানপাঠ বন্ধকরণ,খেলাধুলা ও বিনোদনের অন্যান্য কর্মকান্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ জনজীবনের চলাচল নিষিদ্ধকরণের লক্ষে স্হল,নৌ ও আকাশপথ বন্ধ করে মানুষজনকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখা ইত্যাদির মাধ্যমে মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টার ফলে রাষ্ট্র, সমাজ ও বিশ্বব্যবস্হায় বহুমূখি সংকটের উদ্ভব হওয়ার শংকা রয়েছে, যা জাতীয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক হুমকির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
বিশ্বঅর্থনীতিতে মন্দাভাব ইতোমধ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। অর্থনীতিতে মন্দাভাব মানবজীবনকে এবং অবশ্যই জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।কারণ,কোভিড-১৯ মোকাবিলায় জাতিসমুহ ও বিশ্বব্যবস্হা যেসকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তার ফলে অর্থের সন্চালন হ্রাস করবে এবং এর সাথে রাজস্ব আযও কমবে।এসকল গৃহীত ব্যবস্হা ব্যক্তি ও পরিবারগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে,-তাদের আয়কেও বিপর্য়করভাবে হ্রাস করবে।
একবার তাদের আর্থিক রিজার্ভগুলো কমে গেলে, সংস্হাগুলো,শিল্পগুলো ও ব্যবসা-বানিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে,তাদের মালিক,কর্মচারী ও সরবরাহকারীদের জন্য চরম বিপর্য়কর অবস্হার সৃষ্টি হবে-সামগ্রিক জনজীবনকেও বিরূপভাবে প্রভাবিত করবে।
কোভিড-১৯ এর ক্ষতিকর প্রভাবের একটা উদাহরণ গণচীন -যেখানে কোভিড-১৯ প্রথম আঘাত করেছিলো,সেখানে শিল্প উৎপাদন প্রায় ১৩.৫% হ্রাস পেয়েছে। খুচরা বিক্রি কমেছে ২১%।আর কিছু খাত প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। গাড়ী বিক্রি কমেছে ৯২% এবং রেস্তোরাগুলোর বিক্রি হ্রাস পেয়েছে ৯৫শতাংশ।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির স্কেল মূল্যায়ন করা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে একারণে যে কেউ জানে না যে কতদিন পর্যন্ত মানুষকে ঘরে আবদ্ধ থাকতে হবে,-বা কতদিন শিল্পসহ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকবে।অর্থ্যাৎ এটা অনিশ্চিত একটা অবস্হা। কাজেই মহামারী বিষয়ক অর্থনৈতিক মন্দার মাত্রা ও প্রকৃতির পরিমাণ নির্ণয় করা কঠিন, তবে অসুস্থতা ও দারিদ্র্যতার ভয়াবহ নিম্নগামীতার সর্বাধিক ঝুঁকি রয়েছে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এটা সত্য যে অর্থনীতির সকল সেক্টর ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ফলে মানুষ উপার্জনহীন হয়ে পড়েছে, যা ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশংকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হার(আইএলও) তথ্য মতে, ইতোমধ্যে করোনা মহামারীর অভিঘাতে বিশ্বের ৮১ শতাংশ বা দুইশ সত্তর কোটি কর্মজীবী মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়াও আরও ৩৩০কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে মনে করে আইএলও।
কোভিড-১৯ মহামারী পৃথিবীর মানুষকে বোঝতে অনুপ্রাণিত করেছে যে,তারা সকলেই এই ছোট গ্রহের সমানাধিকার সম্পন্ন একই রক্ত-মাংসের বাসিন্দা এবং তারা প্রত্যেকেই একে অন্যের ওপড় পরস্পর নির্ভরশীল এবং এটা বৈশ্বিক উত্তাপ, বৈষম্য, পরিবেশের অবক্ষয়, মহাযুদ্ধ ইত্যাদি যাকিছু হোক না কেন,তার মোকাবিলা করতে হবে একসাথে অথবা একসাথে ডুবে মরতে হবে।
কোভিড-১৯ মোকাবিলার জন্য বিশ্ববাসীকে আজ সঠিক সিদ্বান্ত নেবার সময় এসেছে এবং সঠিক ঐক্যবদ্ধ সিদ্বান্তের মাধ্যমেই মানবসম্প্রদায় কোভিড-১৯ এর ওপর জয়লাভ করবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.