অ্যাডভোকেট আনসার খান:২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ট ট্রাম্প যেমনটা বর্ণবাদ ও উগ্রবাদী শেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ উসকে দিয়েছিলেন এবং প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালনকালেও শেতাঙ্গবাদী ধারণাকে লালন করে চলেছেন-সেটার প্রভাব চলমান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায়ও পড়েছে, ট্রাম্প তাঁর পুরোনো কৌশলই ২০২০ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রয়োগ করছেন, ছড়িয়ে দিচ্ছেন সর্বত্র বর্ণবাদ ও শেতাঙ্গ প্রাধান্যের জাতীয়তাবাদী ধারণাকে। এর ফলে আমেরিকান বহুত্ববাদী সমাজে বর্ণবাদী চরম পন্থা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠছে যে, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদের দায়িত্ব নেবার পর থেকে আমেরিকায় শেতাঙ্গ তথা উগ্রপন্থার জাতীয়তাবাদের উগ্রতা বেড়ে চলেছে অত্যন্ত ব্যাপকভাবে। ফলে আমেরিকান সমাজে চরমপন্থা পূর্ববর্তী দশকগুলোর যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময়ে অনেক বেশি ব্যাপকতা পেয়েছে। এন্টি ডিফামেশন লীগের মতে, ২০১৬ হতে ২০১৯ সালের মধ্যবর্তী সময়কালে আমেরিকায় চরমপন্থা, ইহুদীবাদ বিরোধীতা সহ অন্যান্য উগ্র চরমপন্থী ঘটনা ঘটেছে ৬৭৬৮, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। আর আমেরিকায় অভ্যন্তরীণ চরমপন্থার উত্থান ও এর ব্যাপকতার জন্য সচেতনমহল ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেই দায়ি করে চলেছেন।
২০১৫ সালে তাঁর প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনী প্রচারণাভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আলোকে প্রচার-প্রচারণার দ্বারা তাঁর সমর্থকদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে চরমপন্থায় ও সহিংসতায় উৎসাহিত করেছিলেন এবং সেটা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা-এ অভিমত পোষণ করেছেন যে, আমেরিকা ফার্স্ট ধারণাই উগ্র শেতাঙ্গবাদী ও চরমপন্থার জাতীয়তাবাদকে ধারণ ও লালন করে। এ ধরনের জাতীয়তাবাদী ধারণার মূলগত অর্থ হলো, আমেরিকান জাতীয়তাবাদ যা পৃথিবীর অন্য জাতিগুলোকে অবজ্ঞা করে থাকে এবং এটা গত শতাব্দীর বিশ-ত্রিশের দশকে হিটলার-মুসোলিনীর প্রচারিত উগ্র জাতীয়তাবাদী ধারণার প্রায় কাছাকাছি।
২০২০ সালের নির্বাচনের জন্য আবারো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়ে মি. ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় আবারও একই শ্লোগান তুলেছেন-‘আমেরিকা ফার্স্ট এগেইন’। নতুনত্ব কিছুই নেই। আছে কেবল আমেরিকার স্বার্থ চিন্তার দিক থেকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও বেসিজমের মাধ্যমে বর্ণবাদ উসকে দিয়ে শেতাঙ্গদের ভোট নিজের অনুকূলে নিয়ে আসা; নির্বাচনে নিজের বিজয় নিশ্চিত করা। উগ্র জাতীয়তাবাদ ও শেতাঙ্গবাদ মিশ্রিত এবং একই সঙ্গে বর্ণবাদ আশ্রিত-আমেরিকা ফাসর্ট এগেইন ধারণার প্রচারণার ফলে আমেরিকার অভ্যন্তরে যেমন বিভিন্ন বর্ণের ও ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা-সহিংসতা-উসকে দিয়ে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, শান্তি ও শৃঙ্খলা বিনষ্ট করা হচ্ছে, তেমনি এর ফলে গোটা বিশ্বের শান্তি, স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মৌলিক মানবাধিকার সংক্রান্ত নীতিগুলোকে পদদলিত করা হচ্ছে।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক কার্স্টেন মুলার এবং ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্লো শোয়ার্জের এক নতুন গবেষণায় দেখানো হয়েছে ট্রাম্পের মুসলিম বিরোধী টুইট ও মুসলিম বিরোধী ঘৃণ্য অপরাধের মধ্যে প্রত্যক কার্যকলাপের যোগসূত্র তৈরি করেছে। ২০১৫ সালের নির্বাচনী প্রচারণাকালে ট্রাম্প হিসপানিজ ও মুসলিম, বিশেষ করে আরব মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য-বিদ্বেষমূলক প্রচারণা শুরু করেছিলেন, বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও তাঁর দুইট বার্তায় এসব প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছিলো এবং এ প্রবণতা তাঁর প্রেসিডেন্সী সময়কালে অব্যাহত আছে এবং এখনো নির্বাচনী প্রচারণা-প্রপাগান্ডায় এগুলো তুলে ধরে মুসলিম ও হিসপানিকদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ তৈরী করা হচ্ছে শেতাঙ্গদের মধ্যে।
যেমন ২০১৫ সালে নির্বাচনী প্রচারণার প্রাক্কালে এক টুইটে ও বিভিন্ন বক্তব্যে ট্রাম্প বলেছিলেন-‘মেক্সিকো যখন লোক পাঠায় তখর ভালো লোক না পাঠিয়ে মন্দ লোক পাঠায় এবং এরা নিয়ে আসে ড্রাগ ও ক্রাইম। এরা ধর্ষক। আমি নিশ্চিত এরা আমাদেরকে সঠিক লোক পাঠাচ্ছে না। এদের বেশিরভাগ মেক্সিকো এবং অলওভার দক্ষিণ এবং ল্যাটিন আমেরিকা থেকে আসে সম্ভবতঃ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।’
তবে ট্রাম্পের বেশিরভাগ টুইট বার্তায় মুসলিম বিরোধী সেন্টিমেন্ট ফুটে ওঠে। আর সামাজিক গণমাধ্যম সম্ভবত: মুসলিম বিরোধী প্রচারণা ব্যাপকভাবে প্রচার করে থাকে। তবে ট্রাম্পের মুসলিম বিরোধী টুইটগুলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে থাকে। তার টুইট বার্তার কারণেই হেইট ক্রাইম বহুল অংশে বৃদ্ধি পায়-বিশেষ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হেইট ক্রাইম প্রবণতা আশংকাজনকভাবে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা বলা সঙ্গত হবে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানের কারণেই মুসলমান জনগোষ্ঠী সমেত মাইনোরিটি সমাজের জনগণের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য সহিংস অপরাধ প্রবণতা বেড়ে চলেছে। ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনে এফ.বি.আই লিখেছিলো-‘ক্রিমিনাল অফেনসেস দ্যাট আর মটিভেটেড, ইনহোল অর ইন পার্ট, বাইন এন অফেনডারস বায়াস এগেইন্সট এ রেস, রিলিজিয়ন, ডিস এবিলিটি, সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন, এথনিসিটি, জেন্ডার অর জেন্ডার আইডেনটিটি।
মূলত: ট্রাম্পের বর্ণবাদী, বিভাজনমূলক বক্তৃতা ও প্রচন্ড হিংস্রতা এবং সত্যকে বিকৃত করার প্রবণতার কারণে অনেক আমেরিকান গবেষক এ সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, ট্রাম্প সত্যিকার অর্থেই একজন ফ্যাসিস্ট, তিনি আধুনিককালের বেনিটো মুসোলিনী বা এডলফ হিটলার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ট্রাম্প গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ও নিরপেক্ষ আমলাতান্ত্রিক সব পদ্ধতিগুলো কেবল তাঁর ও তাঁর পরিবারের সন্দেহজনক ব্যবসায়িক ব্যবসায়ের জন্যই নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়ানোর কৌশল হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করছেন। উল্লেখ্য যে, ইতালীয় ফ্যাসিস্ট ও নাৎসীরা ১৯২০ সাল থেকে নিয়মিত একই কৌশল ব্যবহার করেছিলো।
প্রসঙ্গক্রমে আমেরিকান প্রতিনিধি সভার সদস্য ডেমোক্রেটিক ইলহান ওমরের মন্তব্য তুলে ধরা যেতে পারে। সাংবাদিকদের ইলহান বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-‘ফ্যাসিবাদী’ এবং বলেছেন যে, ট্রাম্পের সমর্থকরা আমেরিকান গণতন্ত্রের ভিত্তির বিরুদ্ধে। আমরা বলেছি এই প্রেসিডেন্ট বর্ণবাদী। আমরা তাঁর বর্ণবাদী মন্তব্যের নিন্দা করেছি। আমি বিশ্বাস করি যে, তিনি ফ্যাসিবাদী।’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। তবে ফ্যাসিবাদে পৌঁছার যথেষ্ট উপায় বা পথ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইতালিয়ান লেখক প্রিমিওলেভী। তিনি ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, দেয়ার আর মেনিওয়েজ অব রিচিং ফ্যাসিজম।’ তাঁর মতে, ‘অনেক উপায়ে ফ্যাসিবাদে পৌঁছানো যায়। কেবল পুলিশি সন্ত্রাস ও ভয় দেখানোর দ্বারা নয়, বরং তথ্য প্রবাহকে অস্বীকার ও বিকৃত করে, বিচার ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা এবং অবমূল্যায়ন করে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস ও অবমূল্যায়ন করে, পঙ্গু করে দিয়ে এবং আরো অন্যান্য কৌশল অবলম্বন করে ফ্যাসিবাদে পৌঁছানো যায়।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী এমনি ধারার কৌশল নিয়ে ফ্যাসিবাদের পক্ষে হাঁটছেন। কেউ বলছেন-ট্রাম্প ফ্যাসিবাদের দিকেই এগুচ্ছেন; আবার অনেকেই এর বিপরীত মত পোষণ করছেন।
দ্য আটলান্টিকে প্রকাশিত (২৫.০১.২০২০) এডওয়ার্ড আইজাক ডোভর-এর এক লেখা থেকে দেখা যায়-২০১৬ সালে এক সতর্কতা বার্তায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা-ট্রাম্প সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে ব্যক্তিগত অভিমতে বলেছিলেন : ট্রাম্প একজন ফ্যাসিবাদী। কারণ-তিনি কর্তৃত্ববাদী মনোভাবসম্পন্ন, তিনি কর্তৃত্ববাদী নেতাদের প্রশংসা করেছেন; ভøাদিমির পুতিন তাঁর প্রিয়। তিনি সত্যিই এক ধরনের ভাইরাল জাতীয়তাবাদ ব্যবহার করেন। তিনি লক্ষ্যগুলো সনাক্ত করেন : অভিবাসী, কৃষ্ণবর্ণ, বাদামী, সমকামী, মহিলা ইত্যাদি। তাঁর মধ্যে শেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ও ফ্যাসিস্টিক ধরনের প্রবণতা ও আচরণগুলো দেখতে পাওয়া যায়। ওবামা তাঁর ২০১৬ সালের এক বার্তার পুনরাবৃত্তিতে ঘোষণা করেছিলেন যে,-‘আমাদের গণতন্ত্রের পক্ষে ঝুঁকি রয়েছে।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং রাশিয়ার জুসেফ স্ট্যাবিলনের অনুকরণে-অনুসরণে-প্রেস ও সংবাদ মাধ্যমে-‘জনগণের শত্রু’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ফ্যাসিজমের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনাক্রমে দেখার চেষ্টা করবো যারা ট্রাম্পকে ফাসিস্ট বলতে নারাজ তাঁদের যুক্তিগুলো কী।
ফ্যাসিজমের মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে এটা বলা হয় যে, এটা উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রচার করে-এ ধরনের শাসন হলো কর্তৃত্ববাদী শাসন। এ ধরনের শাসনে মাইনোরিটিরা অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়ে থাকে। শাসক কেন্দ্রিক একটা নেতৃত্বের চক্র গড়ে ওঠে। জনমত উপেক্ষিত হয়; গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা হয়ে থাকে। বিশ্বাসঘাতকতা পূর্ণ বলে প্রশাসনকে উপেক্ষা করা হয়। দেশের আইনসভা সহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিয়ে সব কিছু শাসকের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ও কর্তৃত্বে নিয়ে আসা হয়। আইন শৃঙ্খলা, আইন বিভাগ-সব কিছুর ওপর শাসকের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে। সমালোচনা করার স্বাধীনতা, ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রাষ্ট্রের তথা শাসকের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। সংঘাত উসকে দেয়, সামরিকায়ন ও যুদ্ধবাজনীতিতে বিশ্বাস করে এবং ফ্যাসিজমের মূল শ্লোগান হলো-‘এভরি থিং টু এভরিবডি’।
ফ্যাসিবাদের মূল বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্পের স্বপক্ষবাদীরা ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট, এ বিষয়টা মানতে নারাজ। এদের মূল বক্তব্য হলো ট্রাম্প কোনো অর্থেই ফ্যাসিস্টের কাতারে পড়েনা। সবার বক্তব্যের একটা সাধারণ প্রতিক্রিয়া হলো-ট্রাম্প হিটলার মুসোলিনীর ন্যায় মন্দ বা ফ্যাসিস্ট নন। ট্রাম্প কখনো কর্তৃত্ববাদ চাপিয়ে দেননি। মুক্ত চিন্তার সাংবাদিকতাকে তিনি সমর্থন না করলেও মিডিয়ার ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেননি ট্রাম্প। ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং নেতার নির্দেশনা ছাড়া কোনো কিছুই নেওয়া যায় না এবং নেতার সিদ্ধান্ত কখনোই ভুল বা ব্যর্থ প্রতিপন্ন করা যায় না, এসব কিছুই ট্রাম্পের শাসনে হচ্ছে না, তিনি কখনো কর্তৃত্ববাদ আরোপ করেননি বরং দেশের সংবিধান অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিকভাবেই শাসনকার্য পরিচালনা করছেন ট্রাম্প, তাই তাঁকে ফ্যাসিস্ট বলা যায় না বলে অভিমত ট্রাম্পের স্বপক্ষবাদী লেখক, গবেষক ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের।
বিশ বা ত্রিশের দশকের ফ্যাসিস্টরা যেকোনো উপায়ে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতেন। ট্রাম্প তেমনটা করেননি; বরং আইন মেনেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন এবং এখনো স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনতার ম্যানডেটে পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার জন্য প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কাজেই তিনি ফ্যাসিস্ট নন। কোনো ঐতিহাসিক ফ্যাসিজমের ন্যায় মিঃ ট্রাম্প ফ্যাসিস্টের সংজ্ঞায় পড়েন না।
‘ট্রাম্প ডানপন্থী লোকরঞ্জনবাদী অথবা সম্ভবত: একজন বর্ণ বা জাতবিদ্বেষী লিবারেল’-বলেছেন মি: রজার গ্রিফিন। দ্য ন্যাচার অব ফ্যাসিজম বইয়ের লেখক এবং এক্সফোর্ড ব্রোকস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও রাজনৈতিক তত্ত্বের অধ্যাপক গ্রিফিন আরো বলেন, ট্রাম্প দেশের বিদ্যমান গণতন্ত্র ছুঁড়ে ফেলে দেননি এবং বিদ্যমান আমেরিকান সংবিধান বাতিল বা ধ্বংস করেননি। ট্রাম্প কখনো ফ্যাসিস্টদের ন্যায় সংঘাত উসকে দেননি। মূলত: তিনি একজন সাধারণ বর্ণবাদী। ট্রাম্প কখনো দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাতিল করার জন্য বলেননি বা চেষ্টা করেননি। তাই কৌশলগত কারণেই তাঁকে ফ্যাসিস্ট বলা যায় না’ অভিমত রজার গ্রিফিনের।
‘ট্রাম্প এখনো গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শে বিশ্বাসী, গণতান্ত্রিক পরিবারের সদস্য। তাঁকে বড়জোর এথনোক্রটিক অনুদার বলা যেতে পারে’-অভিমত দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের টেসিডি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাসিজম এক্সপার্ট অধ্যাপক মেথিউ ফিল্ডম্যান।
‘দ্য এনাটমি অব ফ্যাসিজম’ বইয়ের লেখক রবার্ট প্যাকসটন লেইজ-যিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একই অভিমত দিয়ে বলেছেন, ‘ট্রাম্প কখনো ফ্যাসিবাদী হতে পারেন না।’
ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট কি-না তা নিয়ে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত, ভিন্নমত আছে। তবে এটা বলা যায় যে, ট্রাম্প একজন অতি ডানপন্থী শেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা এবং তার মধ্যে রয়েছে কর্তৃত্ববাদী মনোভাব। তিনি প্রচলিত সংবিধান, আইন ও বিচার বিভাগকে উপেক্ষা করে থাকেন কর্তৃত্ববাদী শাসকদের ন্যায়। তাছাড়া তিনি প্রকৃতই একজন জাতি বিদ্বেষী বর্ণবাদী। এসব গণতন্ত্রের মধ্যে পড়ে না।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

