ভয়াতুরা কপোতী আমার

রাত তখন ১ টা বেজে ২৫ মিনিট। পুরো শহর মেতে উঠেছে বিজয়ানন্দে। ৪৮ বছর আগের এই দিনেই স্বাধীনতা এসেছিল প্রিয় স্বদেশ এ। বনানী ফ্লাইওভারে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম আকাশে আতশবাজির ফুলঝুরি। মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি আসছে যাচ্ছে। বেশ শীত শীত লাগছিল। ঋতুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মাত্র কিছুক্ষণ আগে এয়ারপোর্ট এ নেমেছে মেয়েটা। সোজা এখানেই চলে আসবে। ঋতুর সাথে আমি প্রায় সময় এই ফ্লাইওভারেই দেখা করি। এইখানে দাঁড়িয়ে অপরুপা রাতের ঢাকার দেখা পাওয়া যায়। অলস সময় কাটাতে কানে হেডফোন গুজে রবীন্দ্র সঙীত শুনছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই পাশে ঋতুর দামী গাড়িটা এসে দাড়ালো পাশে। বরাবরের মতোই এবারও গাড়ি থেকে নেমে ওর সেই বিখ্যাত মুচকি হাসিটা দিলো। যে হাসিতে কুপোকাত হয় হাজারো ঋষি-সন্যাসীরা।কলাপাতা রঙের শাড়ি পড়েছে। কপালে বড় লাল টিপ। সকালের প্রথম সূর্যের মতো লাল। বুঝলাম এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে নিকুঞ্জ গিয়েছিল শাড়ি পরে এসে আমাকে চমকে দেবে বলে। আমি সেভাবে কখনো ঋতুর দিকে ভালভাবে তাকাইনি। আজ তাকাতেই কেন যেন চোখ ফেরাতে কষ্ট হচ্ছিল। খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু অনেক কষ্টে সেই ইচ্ছে দমন করলাম। ঋতুর কাছে আমি বেশ গম্ভীর আর আন রোমান্টিক টাইপের মানুষ। সেইটা বজায় রাখার চেষ্টা করলাম আর কি। যদিও ঋতু খুব খুশীই হতো জড়িয়ে ধরলে। ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ঋতু এক প্যাকেট দামী বিদেশী ব্র্যান্ড এর সিগারেট আর খুব সুন্দর একটা লাইটার বের করে বলল,তোমার জন্য এনেছি। ওগুলো হাতে নিয়ে বললাম,এত সুন্দর গিফট কেউ আমাকে আগে কখনো দেয়নি।

কিছুক্ষন চুপচাপ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকলাম আমরা।আজ ঋতুকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করছে|হঠাৎ ঋতু বলল,’একটা কবিতা শোনাবে?

ওর কথা শুনে খানিকটা চমকে উঠলাম। অনেক দিন এভাবে কেউ আমার কাছে কবিতা শুনবার আবদার করেনি। ভুলেই গেছিলাম যে আমি কবিতা লিখি। ওর কথা শোনে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম ওর দিকে। মনের অজান্তেই কবিতার শ্লোকগুলো মুখে চলে আসলো যেন,’

 

শহরের নিয়ন আলোয় লজ্জাবনত প্রেমিকার মুখ

অনুভব করায় হৃদয়ে যাপিত স্বর্গসুখ

রাতের আকাশে দুর বহুদুরে হারায় তারার দল

আমি চোরা ‍দৃষ্টিতে করি তোমায় দেখার ছল

তুমিই তো আস্ত কবিতা একটা-কবিতার বই

হাজার বছর ধরে আমি শুধু তোমাতেই নিহিত রই

পৃথিবীর সব রুপ আজ হতে শুধুই তোমার

ভয়াতুরা কপোতী আমার…

 

ঋতু এগিয়ে এসে আমার বাহু জড়িয়ে ধরে। অন্য দিন হলে বাধা দিতাম। আজ কেন জানি বাধা দিতে ইচ্ছে করছে না। ঋতুর শরীর থেকে পরিচিত একটা গন্ধ আসছে।যা শুধু ঋতুর কাছে আসলেই পাই।বেলী ফুলের মিষ্টি গন্ধের মতোন।

কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ঋতু বললো,’আমি তোমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করবো। তোমার জন্য অপেক্ষা করতে আমার সবসময়ই ভাল লাগে।

আমি ঋতুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম,’ঋতু আজ আমি আসি।বলে আস্তে করে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে হাঁটা দিলাম একটা সিগারেট টানতে টানতে। আমাকে মায়া কাটাতে শিখতে হবে তো!!

49183524_221208595465542_5255786252170428416_n

জাকওয়ান হুসাইন

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.