মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাক, শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই তার ফিরে আসতে হয়। জন্মভূমি, শৈশবের উঠোন, আত্মীয়স্বজন ও চেনা মুখগুলো থেকে হাজার মাইল দূরে এসে এই সত্যটি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। বিদেশের অচেনা শহরে নতুন করে জীবন গড়ে তোলার পথে অর্থ, পেশা, নাগরিক সুবিধা কিংবা সামাজিক অবস্থান যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, একজন আপন মানুষের প্রয়োজন কখনো ফুরোয় না। আর প্রবাসে সেই আপন মানুষটির নাম অনেক সময়—বন্ধু।
বাংলা সমাজ ও সংস্কৃতিতে বন্ধুত্বের এই ঐতিহ্য নতুন নয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে কাজী নজরুল ইসলাম—বাংলা সাহিত্য ও সমাজজীবনের নানা পর্বে আমরা এমন এক মানবিক সম্পর্কের সন্ধান পাই, যেখানে মানুষকে তার ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে নয়, তার হৃদয় ও মানবিকতা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে। বন্ধুত্ব সেখানে ছিল সৃষ্টিশীলতার সহযাত্রী, দুঃসময়ের আশ্রয় এবং আনন্দের স্বাভাবিক অংশীদার।
প্রবাসে এসে মনে হয়, সেই ঐতিহ্যকে আমাদের নতুন করে আবিষ্কার করার প্রয়োজন হয়েছে। বরং এক অর্থে আমরা এখনও মাইকেল-নজরুলের সেই বন্ধুত্বের যুগেই বাস করছি। কারণ প্রবাসে আত্মীয়তার পরিধি সীমিত হলেও বন্ধুত্বের প্রয়োজন সীমাহীন। হঠাৎ অসুস্থ হলে যে মানুষটি হাসপাতালে ছুটে যান, গভীর রাতে বিপদে ফোন করলে যিনি বলেন, ‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি’, নতুন দেশে এসে পথ হারালে যিনি পাশে দাঁড়ান—তিনি হয়তো রক্তের সম্পর্কের কেউ নন; তিনি একজন বন্ধু।
প্রবাসে বন্ধুত্ব তাই নিছক আড্ডা, বিনোদন কিংবা সামাজিকতার বিষয় নয়। এটি অনেক সময় অস্তিত্বের অবলম্বন। ঈদের আনন্দ, পূজার উৎসব, বড়দিনের উচ্ছ্বাস কিংবা বৈশাখের রঙ—বন্ধুর উপস্থিতিতে এসব আনন্দ পূর্ণতা পায়। আবার একই বন্ধুত্ব শোকের দিনে নীরবে পাশে বসে থাকে, অসুস্থতার সময়ে দরজায় কড়া নাড়ে, বিপদের মুহূর্তে নিজের সময়, শ্রম ও সামর্থ্য উজাড় করে দেয়। প্রবাসে একজন সত্যিকারের বন্ধু কখনো কখনো একটি পরিবারের সমান, কখনো একটি স্বদেশের সমান।
কিন্তু আমাদের সংকটও এখানেই। দেশ থেকে আমরা শুধু ভাষা, সংস্কৃতি ও স্মৃতি নিয়ে আসি না; সঙ্গে নিয়ে আসি নানা বিভাজনের অভ্যাসও। ধর্ম, রাজনীতি, আঞ্চলিক পরিচয়, শ্রেণি, পেশা কিংবা ব্যক্তিগত মতাদর্শ—এসব পরিচয় অনেক সময় আমাদের সম্পর্কের মাঝখানে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। অথচ বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমাদের একবার অন্তত নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার—এই বিভাজনগুলোকে আমরা আর কত দূর পর্যন্ত বহন করব?
রাজনীতি থাকবে, মত থাকবে, বিতর্ক থাকবে। সেটিই স্বাভাবিক। একজন যে রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস করেন, অন্যজন তার বিপরীত মত পোষণ করতেই পারেন। একজনের ধর্মীয় বিশ্বাস অন্যজনের বিশ্বাস থেকে আলাদা হতে পারে। কিন্তু মতের অমিল যদি বন্ধুত্বের দরজা বন্ধ করে দেয়, তবে আমরা শুধু একজন বন্ধুকে হারাই না—নিজেদের পৃথিবীকেও ছোট করে ফেলি।
বন্ধুত্বের সৌন্দর্য এখানেই যে, বন্ধুকে নিজের মতো হতে হয় না। বরং ভিন্নতার মধ্যেও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পাশে দাঁড়াতে পারাই বন্ধুত্বের প্রকৃত পরীক্ষা। বন্ধুর রাজনৈতিক মত আমার মতো নয়—তবু তার অসুস্থতার খবর পেলে আমি হাসপাতালে যাব। তার ধর্ম আমার ধর্ম নয়—তবু তার সন্তানের জন্মের আনন্দে আমি তাকে অভিনন্দন জানাব। সে আমার মতের সমালোচনা করে—তবু তার বিপদের দিনে আমি তার দরজায় দাঁড়াব। এই সহজ মানবিকতাই প্রবাসী সমাজকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোরও এখানে বড় দায়িত্ব রয়েছে। এমন পরিসর তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ নিজের পরিচয় নিয়ে আসবে, কিন্তু অন্যের পরিচয়কে ছোট করবে না; নিজের মত প্রকাশ করবে, কিন্তু ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকেও সম্মান করবে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভাষা ও মানবিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে যদি আমরা মিলিত হতে পারি, তবে আমাদের কমিউনিটি শুধু একটি সামাজিক গোষ্ঠী হয়ে থাকবে না—এটি হয়ে উঠতে পারে একটি মানবিক পরিবার।
প্রবাসে নতুন আসা একজন মানুষকে আপন করে নেওয়াও এই বন্ধুত্বেরই অংশ। অচেনা দেশে একটি ফোন নম্বর, একটি ঠিকানা, চাকরির একটি খবর, প্রয়োজনে একটি গাড়ি, কিংবা কয়েক ঘণ্টা আন্তরিক সময়—কখনো কখনো একজন বিপন্ন মানুষের জীবনে এসবের মূল্য অপরিসীম। আজ আমি যে হাতটি বাড়িয়ে দিচ্ছি, কাল হয়তো সেই হাতই অন্য কারও জন্য আশ্রয় হয়ে উঠবে। এভাবেই ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব একসময় সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়।
আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও এই মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়া জরুরি। বিদেশে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা সন্তানদের শুধু বাংলা ভাষা কিংবা উৎসবের সঙ্গে পরিচিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের শেখাতে হবে—মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সংস্কৃতির সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ। ভিন্ন ধর্মের বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করা, ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কথা বলা, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসবই আমাদের উত্তরাধিকার।
মাইকেল থেকে নজরুল—বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রা আমাদের একটি সহজ অথচ গভীর সত্য শিখিয়েছে: মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের কারাগারে বন্দী করা যায় না। মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে যে শক্তি, তার নাম মানবিকতা।
প্রবাসে এই কথাটির তাৎপর্য আরও গভীর। এখানে স্বজনের সংখ্যা কম, কিন্তু স্বজন হয়ে ওঠার সুযোগ অনেক বেশি। একটি ফোনকল, এক কাপ চা, শীতের সন্ধ্যায় বন্ধুর দরজায় গিয়ে দাঁড়ানো, কিংবা কোনো দুঃসংবাদের পর নিঃশব্দে পাশে বসে থাকা—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই প্রবাসজীবনের বড় সম্পদ। এগুলোই দূরদেশে আমাদের জন্য তৈরি করে এক টুকরো বাংলাদেশ।
তাই আমাদের বন্ধুত্বকে আরও বড় করতে হবে। ধর্মের দেয়ালের ওপারে, রাজনীতির বিভাজনের ওপারে, আঞ্চলিক সংকীর্ণতার ওপারে, ব্যক্তিগত অহমিকার ওপারে। মত আলাদা হতে পারে, বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, পথ আলাদা হতে পারে—কিন্তু মানবিকতার জায়গায় যেন আমরা একসঙ্গে দাঁড়াতে পারি।
কারণ শেষ পর্যন্ত বিদেশের মাটিতে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সম্প্রদায় কিংবা আঞ্চলিক পরিচয় নয়। আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়—আমরা মানুষ। আর একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষের দুঃসময়ে হাত বাড়িয়ে দেয়, তখনই প্রবাসের অচেনা মাটি হয়ে ওঠে আপন।
হয়তো সেখানেই মাইকেল-নজরুলের বন্ধুত্বের প্রকৃত উত্তরাধিকার। সময় বদলেছে, দেশ বদলেছে, আমাদের ঠিকানা বদলেছে; কিন্তু বন্ধুর কাঁধে মাথা রাখার প্রয়োজন বদলায়নি। তাই বিদেশের মাটিতে আমাদের নতুন অঙ্গীকার হোক—বিভাজনের নয়, বন্ধুত্বের; দূরত্বের নয়, সেতুর; পরিচয়ের নয়, মানবিকতার।
তবেই বলা যাবে, আমরা শুধু মাইকেল ও নজরুলের যুগের বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করছি না—আমরা সেই বন্ধুত্বকে আমাদের সময়ের জন্য নতুন করে বাঁচিয়ে রাখছি।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

