বলিভিয়া : ইভো মোরালেসের উত্থান-পতন

অ্যাডভোকেট আনসার খান :ভিল্লা টুনারাই-বলিভিয়ার অন্যতম এ শহর থেকে শ্রমিক ইউনিয়নে যোগদানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পথপরিক্রমার শুরু হয়েছিলো দেশটার সদ্য পদত্যাগী প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের এবং মাত্র তিন দশকেরও কম সময়ের মধ্যে উল্কার মতো উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে জনগণের ভোটে ২০০৬ সালে নির্বাচিত হওয়া প্রেসিডেন্ট মোরালেসের রাজনৈতিক জীবনের অবসানও ঘটলো ঐ একই শহর ভিল্লা টুনারাই থেকে ২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর।
যে জনগণের বিপুল সমর্থনে বলিভিয়ার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে ১৮২৫ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশটার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০০৬ সালে, গভীর জঙ্গল পরিবেষ্টিত অতি সাধারণ এক পল্লী গ্রামের অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান ইভো মোরালেসের নেতা হয়ে ওঠা এবং জনগণের নিকট অতি জনপ্রিয়তা পাওয়া সেই ক্যারিশমেটিক নেতা জনগণের একটা অংশের বিপুল ও প্রচন্ড বিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুর শহর ভিল্লা টুনারাই থেকে ২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর নিজ মুখে তাঁর প্রেসিডেন্সী পদত্যাগ করার ঘোষণা করেছিলেন যা সত্যিকার অর্থে বিস্ময়কর ঘটনা বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
যে ব্যক্তি দারিদ্র্যতার যন্ত্রণা নিয়ে বড় হয়েছেন, রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া কমলার খোসা চুষে খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়েছেন, আদিবাসীর সন্তান হওয়ার কারণে যে কিনা প্রতিনিয়ত প্রতি ক্ষেত্রে নিগৃহীত হয়েছে সেই ব্যক্তিই যখন বিপুল জনপ্রিয়তায় ওঠে এসেছিলো বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে, ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলো প্রথম আদিবাসী প্রেসিডেন্ট হয়ে-তাঁর এমন বিদায় কারো কাম্য ছিলো না। অথচ এটাই এখন বাস্তবতা যে, যে শহর থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিলো, সে শহরেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের যবনিকাপাত হলো। তিনি আর রাজনৈতিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন-এমনটা কেউ মনে করছে না।
বলিভিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে ইভো মোরালেসের বিদায় হওয়া নিয়েও রয়েছে ভিন্ন মত। জনগণের তীব্র ক্রোধ আর বিক্ষোভের মুখে মোরালেস প্রেসিডেন্সী ত্যাগ করেছেন-এমনটা ভাবার কারণ নেই বলে অভিমত রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের। বেশিরভাগ ইভো সমর্থকদের স্পষ্ট বক্তব্য ক্যু-এর মাধ্যমে ইভোকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ বাহিনী জড়িত এবং এদের পেছনে মূল সমর্থন জুগিয়েছে আমেরিকা ও তার মিত্র আমেরিকান দেশগুলো। ইভোকে সরিয়ে আমেরিকান অঞ্চলকে বামপন্থীমুক্ত করাই মূল লক্ষ্য। ব্রাজিল থেকে আমেরিকা গোটা ল্যাটিন আমেরিকা অঞ্চলে ইভো মোরালেসই ছিলেন শেষ এবং একমাত্র বামপন্থী শাসক-যা ঐ অঞ্চলের ডানপন্থী শাসকদের নিকট বিষ ফোঁড়াই মনে হতো। তাই এ বিষ ফোঁড়া উপড়ে ফেলার জন্য ইউ.এস.এ সহ অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস (ওএএস) উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছিলো এবং এদেরই ইঙ্গিতে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী মোরালেসের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়-এর সাথে পুলিশ বাহিনীও যোগ দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে বিদায় নিতে হয় মোরালেসকে।
১৮২৫ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকে বলিভিয়ায় কখনো স্থিতিশীলতা আসেনি, সব সময়ই রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকায় দেশের সশস্ত্র বাহিনী রাজনীতিতে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করেছে। দীর্ঘ এ সময়কালে দেশটায় ২০০ বারেরও অধিক সশস্ত্র বাহিনী ক্যু করেছে বা ক্যু করার চেষ্টা করেছে। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যবর্তী সময়কালে নয়টা সরকার দেশ শাসন করেছে-বার বার সরকার পরিবর্তনের পেছনে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে কলকাঠি নেড়েছে সশস্ত্র বাহিনী। একইভাবে মোরালেসকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ভূমিকা রেখেছে দেশের সশস্ত্র বাহিনী। ইভো মোরালেস নিজেই এটাকে ‘সিভিল ক্যু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইউ.এস ন্যাভাল একাডেমীর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পলগা হেসিমোভিস বলেছেন স্পষ্টতই এটা সিভিল এফেয়ার্সে মিলিটারী হস্তক্ষেপ। শীতল যুদ্ধ সময়কালের ক্যু এবং বলিভিয়ার ক্যু এর মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করতে গিয়ে হেসিমোভিস বলেন, শীতল যুদ্ধকালে সেনা বাহিনী জোরপূর্বক রাজধানী শহরের সরকারী অফিসভবনগুলো দখলে নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নিজেরা রাষ্ট্রশাসন পরিচালনা করতো। কিন্তু বলিভিয়ায় সে ধরণের কিছু ঘটেনি। তবে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে আর্মস ফোর্সেস প্রধান জেনারেল উইলিয়ামস কালিমন এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট মোরালেসকে পদত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সশস্ত্র বাহিনী শক্তি প্রয়োগ করেনি বলে মন্তব্য করেছেন মি. হোসেমোভিস।
সশস্ত্র বাহিনী শক্তি প্রয়োগ করেনি বা সরাসরি ক্ষমতাও দখল করেনি বিদায় এটা ক্যু নয় বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। তবে যারা মনে করেন এটা ক্যু, তাঁদের ভাষ্য হলো একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা ছাড়ার জন্য সশস্ত্র বাহিনী এ ধরণের বিবৃতি দিতে পারেনা, এটা প্রকাশ্যে হুমকি প্রদানের নামান্তর। এ ধরণের হুমকি দিয়ে সশস্ত্র বাহিনী প্রেসিডেন্ট, প্রশাসন তথা রাষ্ট্রের প্রতি তাদের যে আনুগত্যতার শপথ রয়েছে তার লঙ্ঘন করেছে। তাই দেখা যায় আমেরিকা ও এর মিত্র দেশ ব্যতীত বামপন্থী সমর্থিত দেশ যেমন-রাশিয়া, কিউবা, ভেনেজুয়েলা, মেক্সিকোর মতো দেশগুলো বলিভিয়ার ঘটনাকে ক্যু বলেই আখ্যায়িত করেছে।
অন্যদিকে রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও দ্বিমত দেখতে পাওয়া যায়। যেমন-ক্যাটে ইন্সটিটিউটের ল্যাটিন আমেরিকান বিশেষজ্ঞ আয়ান বাসকুয়িজ সরাসরি বলে দিয়েছেন এটা সামরিক ক্যু নয়। তবে সেন্টার ফর ইকোনোমিক এন্ড পলিসি রিসার্চ এর কো-ডাইরেক্টর মার্ক ওয়েসব্রট এটাকে ক্যু হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন-গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর আহবান স্পষ্টত ক্যু।
এছাড়াও আমেরিকান বিখ্যাত রাষ্ট্র দার্শনিক নোয়াম চমস্কি, আমেরিকান সিনেটর বার্ণি সেন্ডার্স, ব্রিটেনের লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন, আর্জেন্টাই প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট আল বারটু ফার্নানদেজ প্রমুখ বলিভিয়ার ঘটনাকে সামরিক ক্যু হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বলিভিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে ইভো মোরালেস গণবিক্ষোভের মুখে স্বেচ্ছায় সরে গেছেন, নাকি সেনা অভ্যুত্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এতো জনপ্রিয় একজন প্রেসিডেন্টের প্রতি ব্যাপক জনঅসন্তুষ্টির পেছনে কী কারণ ছিলো। প্রায় চৌদ্দ বছর আগে বামপন্থী সংগঠন মুভমেন্ট ফর সোস্যালিজম (এমএএস) এর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রথমবারের মতো বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন মোরালেস। প্রায় সাড়ে এগারো মিলিয়ন মানুষের দেশে ৬০% শতাংশই হলো আদিবাসী এবং আদিবাসীদের প্রথম নেতা হিসেবেও তিনি বলিভিয়ার নেতৃত্ব অর্জন করেছিলেন গণতান্ত্রিকভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিগত প্রায় চৌদ্দ বছরে বলিভিয়াকে একটা আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে রূপান্তর ও উন্নয়নে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ ভূমিকা পালন করেছিলেন মোরালেস। ২০০৯ সালে দেশের সংবিধান পুনর্লিখনের মাধ্যমে তিনি বলিভিয়াকে প্লুরিন্যাশনাল স্টেট বা বহুজাতিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন-যেখানে ভিন্ন ভিন্ন জাতির মানুষের সহাবস্থান, সাংস্কৃতিক মর্যাদার স্বীকৃতি, সকল মানুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। স্পেনিশ ভাষার সাথে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, একই সাথে আদিবাসীদের ৩৬টা সম্প্রদায়কেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিলো সাংবিধানিকভাবে।
সাংবিধানিক সংশোধনীর ফলে স্পেনীশভাষী বলিভিয়ানদের একক আধিপত্যের সুযোগ খর্ব হয়েছিলো। উল্লেখ্য যে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০% শতাংশ আদিবাসী হলেও সংখ্যালঘু স্পেনিশভাষী অভিজাত শ্রেণী ঐতিহ্যগতভাবে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছিলো এবং দেশের বেশীরভাগ সম্পদ তাদেরই দখলে ছিলো। মোরালেস প্রেসিডেন্ট হওয়ায় ঐ অভিজাতদের রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ যেমন কমেছিলো, তেমনি অর্থনীতিতেও দাপট হ্রাস পেয়েছিলো। অন্যদিকে, প্লুরিন্যাশনাল স্টেট ঘোষিত হওয়ায় আদিবাসীরাও রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্পেনিশভাষীদের সমান মর্যাদায় ওঠে এসেছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতা ও প্রভাব খর্ব হওয়ায় স্পেনিশভাষীরা মোরালেসের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেছিলেন এবং প্রতিশোধ নেবার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।
বলিভিয়ার অর্থনীতিতেও একটা বিপ্লব সাধন করেছিলেন ইভো মোরালেস। দেশে তেলের রিজার্ভ ৪৪১ মিলিয়ন ব্যারেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের রিজার্ভ ২৭.৬ ট্রিলিয়ন কিউবিটফিট। রয়েছে প্রচুর লিথিয়াম। এর সবকিছুই এতদিন বেসরকারী খাতে ছিলো কিন্তু মোরালেস রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে এসবগুলো প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয়করণ করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এর ফলে রাষ্ট্রীয় তহবিলে স্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছিলো ব্যাপকভাবে। রাষ্ট্রীয় তহবিলে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রেভিনিউ আসতো মাত্র ৬৭৩ মিলিয়ন ডলার। অথচ জাতীয়করণের পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়কালে এসব খাত থেকে রেভিনিউ এসেছিলো ২.২৮ বিলিয়ন ডলার।
প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা কায়েম করাটা বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক নীতি ব্যবস্থার অংশ বিধায় ইভো মোরালেসের বামপন্থী ধারণা বা নিওলিবারেলিজম দর্শনের প্রতি আমেরিকার চরম অসন্তুষ্টি ছিলো। বলিভিয়ার তেল, গ্যাস, লিথিয়াম ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আমেরিকার স্বার্থ জড়িত, এগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা কায়েম হওয়ায় আমেরিকার স্বার্থের ওপর আঘাত পড়েছিলো-যা আমেরিকা সহজভাবে গ্রহণ করেনি কখনো।
দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেছিলেন মোরালেস। চরম দারিদ্র্যতা থেকে তাঁর দেশকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। বিশ্বব্যাংকের মতে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিলো ৪.২% শতাংশ। দারিদ্র্য কমেছিলো ৪২% শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যতা হ্রাস পেয়েছিলো ৬০% শতাংশ এবং বেকারত্ব কমেছিলো ৭.৭% শতাংশ থেকে ৪.৪% শতাংশ। এছাড়াও দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে উন্নয়নের জোয়ার তৈরী হয়েছিলো এবং নি¤œ আয়ের দেশ হতে নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছিলো বলিভিয়া। আর মানব উন্নয়ন সূচকে দেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছিলো ০.৬৭৫ (মধ্যম মানবিক উন্নয়ন)। এসব পরিসংখ্যান বিশ্বব্যাংক ও সেন্টার ফর ইকনোমিক এন্ড পলিসি রিসার্চ (সিইপিআর) এর। সিইপিআর-এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিলো ১৭.১০.২০১৯ সালে। দেশের এই ব্যাপক উন্নয়ন মোরালেসের নিওলিবারেলিজম অর্থনৈতিক নীতি বা ইভোনোমিক নীতির বাস্তবায়নের ফলেই সম্ভব হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বলিভিয়ার আর্থ, সামাজিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থায় ইভো মোরালেস বৈপ্লবিক সংস্কার সাধন এবং উন্নয়ন করেছিলেন বিধায় জাতীয় জনপ্রিয়তার প্লাটফর্মে তিনি এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠেন যা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও দীপ্তি ছড়িয়েছিলো। এছাড়া, আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষার জন্য বিশ্বজুড়ে তিনি শক্তিশালী অবস্থানে আসীন হয়েছিলেন।
এতো কিছু কল্যাণমূলক কাজ করার পরেও তিনি অজনপ্রিয় হয়ে গেলেন, রাজনীতি হতে তাঁর পতন ঘটলো। উল্কার মতো উত্থান আবার উল্কার মতোই হারিয়ে গেলেন। কিন্তু কেন তা নিয়ে এখন অবধি চলছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে হিসেব নিকেশ।
ইভো তাঁর পতনের জন্য নিজেই দায়ি বলে মনে করা হয়। তিনি সর্বদা একটা দ্বিপার্শ্বযুক্ত মুদ্রা ছিলেন। একদিকে তিনি নিঃসন্দেহে ক্যারিশমার মানুষ ছিলেন। গরীব ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর ছিলো গভীর দরদ। অন্যদিকে, তাঁর মধ্যে ছিলো একটা কর্তৃত্ববাদী মনোবৃত্তি এবং উচ্চাশা। কর্তৃত্ববাদী ধারা এবং উচ্চাশা তাঁর পতনকে ত্বরান্বিত করেছিলো বলে অভিমত পর্যবেক্ষকদের।
সংবিধানে তিনি নিজে সংযোজন করেছিলেন দুমেয়াদের বেশী কেউ প্রেসিডেন্ট পদের জন্য যোগ্য হবেন না। অথচ তিনি নিজেই ৩-মেয়াদ শেষে চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রার্থী হলেন বিজয়ী হলেন। এটা সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং বিজয়ী হয়েছেন বলে দাবি করলেও সর্বত্র অভিযোগ ওঠলো তিনি ভোট জালিয়াতি এবং কারচুপি করে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। আবার বলিভিয়ানরা এ অভিযোগ সামনে নিয়ে আসলো যে, মোরালেস নিজেকে আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসেবে অধিষ্ঠিত করতে চলেছে। তাই বলিভিয়ানরা, বিশেষ করে অভিজাত স্পেনীশভাষী বলিভিয়ানরা রাস্তায় নেমে আসলো ভোট ডাকাতির বিরুদ্ধে এবং মোরালেসের পদত্যাগের দাবিতে সারা বলিভিয়া অচল হয়ে পড়লো গণবিক্ষোভে। পুলিশের গুলিতে ত্রিশজন মানুষ নিহত হওয়া সত্বেও মানুষজন রাস্তা ছেড়ে যায়নি। এক পর্যায়ে পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে আন্দোলনকারীদের সাথেই শামিল হয়ে গেলো। সশস্ত্র বাহিনী প্রধান ইভোকে পদত্যাগের আহবান জানায়। ফলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। এভাবেই এক উজ্জ্বল তারকার পতন ঘটলো। তাঁর পতনের জন্য নিজেই অনেকাংশে দায়ি। এছাড়া বিদেশী ইন্ধন, সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ ত্যাগ-জনগণের বিক্ষোভ ইত্যাদি তো ছিলোই।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.