বিয়ের গিফট – শিহাব

আজ কাল বিয়ের দাওয়াতে যেন গিফটের বিনিময়ে খাদ্য! বিয়ে, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীসহ বছরে শ’খানেক দিবসে অঘোষিত বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে উপহার দেওয়া। মধ্যবিত্ত মানুষের প্রতি মাসে সাংসারিক খরচ সামলে উপহার দেওয়া আনন্দের বদলে বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোন বিয়ের দাওয়াত একটা আনন্দের খবর। কিন্তু দাওয়াত পেয়ে এখন মানুষ খুশি হওয়ার চেয়ে গিফটের কথা চিন্তা করে হিসাব কষতে থাকে। অন্যদিকে যারা দাওয়াত দিয়েছেন তারাও অনুষ্ঠানে গিফট টেবিলের ব্যবস্থা করে থাকেন। কে কি গিফট দিলেন তা খাতায় লিখে রাখেন। এই কাজের জন্য আপন বিশ্বস্ত কাউকে টেবিলে বসানো হয়। আবার এমনও কিছু পরিবারের কর্তা আছেন যারা এই গিফটের হিসাব লিপিবদ্ধ করা খাতাটি সযত্নে সংগ্রহ করে রাখেন। আবার সামর্থ্য না থাকা স্বত্বেও বা দেয়ার ইচ্ছে না থাকা স্বত্বেও স্রেফ সামাজিকতার খাতিরে / লোক লজ্জার ভয়ে অনেক মানুষ গিফট ছাড়া আসতে পারেনা। টাকা হাতে না থাকলে ধার করে হলেও কিনে। আর গিফট জোগাড় করতে না পারলে কেও কেও বিয়েতেই আসেনা! আবার যখন মানুষ গিফট আনে তখন সেইসব গিফট পেয়ে আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলি!! ইদানীং বিয়ের গিফট নিয়ে চিন্তা আসছিলো মাথায় যে বিয়েতে গিফট দেয়ার যে প্রথা হয়ে গেছে তাতে কয়জন মানুষ মন হতে সন্তুষ্টচিত্তে গিফট আনে। বিয়েতে গেলে গিফট না দিলে মান ইজ্জত থাকবেনা, গিফট না নিয়ে তো যাওয়া যাবেনা, এসব ভেবেই তো বেশিরভাগ মানুষ গিফট দেয়, তাই নয় কি? এবং কেও গিফট না আনলে দাওয়াতকারী রাও মনঃক্ষুণ্ণ হন। আর উপহার দেওয়ার পরেই শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। কার উপহারটি কেমন হলো এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সীমা থাকে না সামাজিক অনুষ্ঠান-পরবর্তী পারিবারিক সম্মিলনে। মানুষ খরচ বাঁচিয়ে উপহার দেয়। অথচ এর পরেই সেই উপহার নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। নিজেদের মাঝে সমালোচনা করেন অমুক তো খালী হাতেই চলে এসেছে! খালি খেতেই এসেছে একটা গিফট আনতে এত কিপটামি! ছোটলোক। অমুক কি আনছে দেখছো? এতজন মানুষ মিলে খেতে এসে। এই সামান্য জিনিস গিফট দিলো? কিপটা কাকে বলে বুঝছো! ইত্যাদি ইত্যাদি! মানুষ মানুষকে গিফট দেয় খুশি মনে, এটা জোর করে চেয়ে নেয়ার বিষয় না। তবে আজকাল যেন বিয়েতে গিফট দেয়া একটা বাধ্যতামূলক কাজ হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, কেউ বিয়েতে কম মূল্যের গিফট দিলে তার বদনাম করা হয়, তাকে ছোটলোক ভাবা হয়। কিন্তু বিয়ে শাদীতে গিফট আনার যে প্রথা সমাজে প্রচলিত হয়ে গেছে যে বিয়েতে গিফট আনতেই হবে! গিফট না আনাটা দোষণীয় বা ছোট মনের পরিচায়ক। অনেক সময় দেখা যায়, একই আইটেম অনেক হয়ে যায়। যা পরবর্তীতে অন্যের অনুষ্ঠানে দেওয়ার জন্য জমিয়ে রাখা হয়। এ ধারাবাহিকতায় পরিচিত কারও বিয়ে কিংবা জন্মদিনে আপনি যে উপহার দিয়ে এলেন অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই উপহারটি আপনার কোনো অনুষ্ঠানেই ফেরত এসেছে অন্য একজনের হয়ে এমনটি মাঝে মাঝেই ঘটে। আমি গিফট দেয়া-নেয়ার বিরোধিতা করছি না। কেননা রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন- ‘তোমরা পরষ্পরের মধ্যে গিফট আদান-প্রদান করো এতে তোমাদের সম্পর্ক গভীর হবে’। তবে বর্তমানের বিয়ের গিফট প্রদান প্রথা দেখে মনে হচ্ছে- মেহমানেরা বাধ্য হয়েই গিফট নিয়ে আসছেন। এ যেন গিফটের বিনিময়ে খাদ্য! তাই বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে বলতেই হয়- বিয়েতে এই সিস্টেম তুলে ফেলা উচিত। আত্মীয়দের মধ্যে কে বড়লোক, কে গরিব এসব বাছ-বিচার না করে, কারো কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশা না করে সন্তুষ্ট চিত্তে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দাওয়াত খাওয়াতে হবে। আর কারো যদি একান্তই গিফট দিতে ইচ্ছা করে বা তিনি নাছোড় বান্দা হয়ে গিফট দিতে প্রস্তুত, তাহলে- সদ্য বিবাহিত পরিবারে গিয়ে তাদের সুখী পরিবার দেখে তাদের হাতে গিফট দেয়াটাই ভালো মনে করি। মানুষ মনের খুশিতে যদি কাউকে কিছু দেয় সেটা হয় উপহার। কিন্তু উপহার যখন দায়ে পড়ে দিতে হয় তখন সেখানে খুশির জায়গায় ভর করে বিরক্তি। দোয়া আশীর্বাদের বদলে উপহার পরিণত হয়েছে একটি ব্যবসায়। অনেকেই হিসাব করেন খরচ কত হলো আর উপহার উঠল কত টাকার। তাই এ ধরনের মানসিকতা পরিবর্তন করতে অনেকেই দাওয়াত পত্রে ‘উপহার আনা নিষেধ’ উল্লেখ করে দেন। কেউ এমনিতে কাউকে উপহার দিতে পারে কিন্তু সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার দেওয়া এখন শুধুই লোক দেখানো সামাজিকতা।

20181210_131841

আবু জাফর শিহাব(এল এল বি)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.