ফারহান হোসেন:এক-এগারোর সামরিক ষড়যন্ত্রে দীর্ঘকারাভোগের পর ১১ই জুন তিনি মুক্তি পেলেন। মুক্তির বেশ কিছুদিন পর ততকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি জনাব মাহমুদ হাসান রিপন ভাইয়ের নেতৃত্বে শেখ হাসিনার মুক্তি আন্দোলনে ছাত্রলীগের নগন্য এক কর্মী হিসেবে সুধা সদনে নেত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের সুযোগ হয়।
মাত্র দুই হাত দূরত্বে ক্ষণিকের সেই সাক্ষাতে আমি ছিলাম আবেগাপ্লুত, শিহরিত। অপ্রস্তুতভাবেই হঠাৎ নত হয়ে পায়ের কাছেই মোজাইকের মেঝে ছুঁয়ে সালাম করে উঠতেই আমার বাঁ কাঁধে আলতো আঙুল রেখে মৃদু হেসে সদ্য কারামুক্ত মাতৃতুল্য জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ” ভালো থেকো “।
সংগ্রাম ও সাফল্যের নিরীখে ব্যক্তির চেয়ে দল আর দলের চেয়ে রাষ্ট্রের ভালো থাকাই সর্বাপেক্ষা মুখ্য। আর সেই মুখ্য কাজটিই নিবিড় নেতৃত্বে এগিয়ে নিয়ে চলছেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। সত্তুরের কোঠায় এসেও তিনি যেন প্রাণবন্ত এক জনয়িত্রী, যেন প্রৌঢ়া কিন্তু উজ্জ্বয়িনী। সংশপ্তকের জীবনে শেখ হাসিনার সীমাহীন সংগ্রাম ও সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব কাগজ-কলমের পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা সহজ নয় বরং তা বিস্তৃত ও বিস্তীর্ণ। জাতির পিতার আদর্শ ও অনুশাসন বাস্তবায়নের পথে চলতে চলতে তিনি নিজেই বাংলাদেশের প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছেন, রুপান্তরিত হয়েছেন এক অপ্রতিম জীবনাদর্শনে। চড়াই-উৎরাইয়ের পথে পুড়ে পুড়ে ধারণ করেছেন বিচক্ষণতার অনন্য উচ্চতা, অধিকারী হয়েছেন দৃঢ়তা-দূরদৃষ্টি-তীক্ষ্ণতার। নেতৃত্বের শাসনে তিনি ইস্পাতসম একই সাথে মানবিক ও বিশ্ব মানবতার দৃষ্টান্ত। এই গ্রহে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রযাত্রার নমুনা, অগ্রগামী বাংলাদেশের নবনামাঙ্কিত আলেখ্য তিনি।
এশিয়া থেকে এখন তিনি বিশ্ব নেতৃত্ব এবং নন্দিত ও সমাদৃত বিশ্ব মানবতার নেত্রী। জাতিসংঘের স্বীকৃতিতে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি গোটা বাংলাদেশকে করেছেন মহীয়ান। আজকের শেখ হাসিনার তিতিক্ষার সংগ্রামের শুরু মূলত ‘৭৫ এর আগষ্ট থেকেই। একমাত্র বোন ছাড়া পরিবারের সবাইকে হারিয়ে প্রবাসের আশ্রিত দিনগুলোতে অপারগতার জীবন কাটিয়েছেন। তখনকার দু:সময়ে পৃথিবীর পথে পথে হেটেছেন, নানান দেশে আশ্রয় নিয়ে পিতা হত্যার বিচার কামনা করেছেন আর অভিমান-অনুরাগের জীবনে এক বুক শোক নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণেছেন তবু দিনশেষে দেশে ফিরতে পারেননি, এক নজরের জন্যও যেতে পারেননি পিতা মুজিবের সমাধিস্থানে। পিতৃভূমি আর পিতার সমাধিতে যেতে না পারা এক অসহায় কন্যার শোকের পাল্লা বোধ করি পৃথিবীর অনেক কিছুর চেয়ে একটু বেশিই ভারি।
হৃদয়ে লালিত শোক ও সংগ্রাম নিয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধাচরণের বীজ বুনে তিনি ফিরে এলেন ১৯৮১ সালে। প্রতিবিপ্লব নয় বরং পরিমিত বিপ্লব ও অসীম পরমতসহিষ্ণুতার শক্তিতে তিনি হাটতে শুরু করলেন স্বাধীনতার চেতনা ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র বিনির্মানের পথে। দলের ত্যাগী নেতাকর্মী ও মুক্তিকামী গণমানুষকে অহিংস আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে সামরিক শাসনের নিপীড়নের বিপরীতে দাড়িয়ে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামে বিচক্ষণ নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সহ্য করে নিয়েছেন তার ও দলের ওপর নেমে আসা সব নির্যাতন। শুধুমাত্র ‘৮১ থেকে ‘৯০ অব্দি শেখ হাসিনার আন্দোলন ও সামরিক রোষানলের যে চিত্র তা অনেক বিশ্বনেতার সংগ্রামকেই হার মানাবে।
মুহাম্মদ ফারহান হোসেন
প্রাক্তন ছাত্রনেতা, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ।

