যে বই নিষিদ্ধ, সেই বইই কেন আরও কৌতূহলের ?

 

একটি বই—কিছু কাগজ, কিছু অক্ষর, কিছু বাক্য। অথচ সেই অক্ষরই কখনো একটি সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেয়, কখনো ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলে, কখনো একজন মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়—‘কেন?’ আর এই ‘কেন’ প্রশ্নটিই সম্ভবত ক্ষমতার সবচেয়ে বড় ভয়।

তাই পৃথিবীর ইতিহাসে বই নিষিদ্ধ করার ইতিহাসও কম দীর্ঘ নয়। যে বই মানুষের চিন্তার দরজা খুলে দেয়, কোনো কোনো শাসক বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠী সেই বইয়ের দরজাই বন্ধ করে দিতে চেয়েছে। কখনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে, কখনো অশ্লীলতার অজুহাতে, কখনো রাষ্ট্রবিরোধী চিন্তার অভিযোগে, কখনো রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে। আবার কখনো কোনো বইকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে শুধু এই কারণে যে, সেটি প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

জেমস জয়েসের Ulysses, ডি. এইচ. লরেন্সের Lady Chatterley’s Lover, ভ্লাদিমির নবোকভের Lolita, জর্জ অরওয়েলের 1984, সালমান রুশদির The Satanic Verses, খালেদ হোসেইরির The Kite Runner, হার্পার লির To Kill a Mockingbird, মায়া অ্যাঞ্জেলুর I Know Why the Caged Bird Sings—বিশ্বসাহিত্যের এমন বহু বই বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা, সেন্সরশিপ কিংবা পাঠাগার থেকে অপসারণের মুখোমুখি হয়েছে।

এই তালিকা শুধু অতীতের নয়। আজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বই নিয়ে নিষেধাজ্ঞা ও বিতর্ক চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে ৪,২৩৫টি স্বতন্ত্র বইয়ের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ নথিভুক্ত হয় এবং ৫,৬৬৮টি বই লাইব্রেরি থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সংস্থাটি অবশ্য জানিয়েছে, তাদের কাছে সব ঘটনার খবর পৌঁছায় না। অর্থাৎ বাস্তব সংখ্যা আরও বড় হতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, একটি বইকে ভয় পাওয়ার কারণ কী?

কারণটি অনেক সময় বইয়ের বিষয়বস্তু নয়, বরং বইটি পাঠকের মনে যে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, সেটিই। একটি বই যখন বলে—‘প্রচলিত সত্যটি সত্যিই কি সত্য?’—তখন ক্ষমতার অস্বস্তি শুরু হয়। একটি উপন্যাস যখন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে, তখন নীরবতা ভাঙার আশঙ্কা তৈরি হয়। একটি কবিতা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তিও কখনো কখনো স্লোগানে পরিণত হয়।

ডি. এইচ. লরেন্সের Lady Chatterley’s Lover তার উজ্জ্বল উদাহরণ। যৌনতার স্পষ্ট বর্ণনা ও ভাষার কারণে বইটি ব্রিটেনে দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৬০ সালে Penguin Books বইটির পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ প্রকাশ করলে প্রকাশকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ছয় দিনের বিচার শেষে জুরি প্রকাশককে নির্দোষ ঘোষণা করে। এরপর বইটি যখন বাজারে আসে, পাঠকের আগ্রহ বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিনেই দুই লাখ কপি বিক্রি হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে বিক্রি কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে যায়।

এখানে ইতিহাস যেন একটি মজার শিক্ষা দেয়—যে বইকে আড়াল করতে চাওয়া হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞা ও বিচারই কখনো কখনো সেই বইকে মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

তবে এটাও সত্য, নিষিদ্ধ হলেই প্রতিটি বই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে না। কোনো বইয়ের বিক্রি বেড়েছে, কোনো বই আরও আলোচিত হয়েছে, আবার কোনো বইয়ের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাব পরিমাপ করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তাই ‘নিষেধাজ্ঞা মানেই জনপ্রিয়তা’—এমন সরল সিদ্ধান্ত ইতিহাস সমর্থন করে না। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা যে অনেক সময় মানুষের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়, তার দৃষ্টান্ত কম নয়।

সালমান রুশদির The Satanic Verses সেই বিতর্কিত ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায়। ১৯৮৮ সালে ভারত বইটির আমদানি নিষিদ্ধ করা প্রথম দেশ হয়। পরে বিভিন্ন দেশে বইটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক, প্রতিবাদ ও নিষেধাজ্ঞা দেখা দেয়। ভারতে দীর্ঘ সময় বইটি সাধারণ বইয়ের দোকানের তাক থেকে কার্যত অদৃশ্য ছিল। ২০২৪ সালের শেষ দিকে দিল্লিতে সীমিতভাবে বইটির কপি বিক্রির খবর প্রকাশিত হয়। এত বছর পরও একটি বইকে ঘিরে আগ্রহের এই স্থায়িত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি বইকে তাক থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু মানুষের কৌতূহল থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় না।

জর্জ অরওয়েলের 1984–এর কথাও মনে পড়ে। একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র, নজরদারি, সত্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ভয়াবহ কল্পচিত্র—আজও পৃথিবীর বহু পাঠক এই উপন্যাসে নিজেদের সময়ের ছায়া দেখতে পান। The Kite Runner কিংবা To Kill a Mockingbird–এর মতো বইও বিভিন্ন সময় স্কুল ও লাইব্রেরিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কিন্তু পাঠকের মন থেকে তারা হারিয়ে যায়নি।

এখানেই বইয়ের অদ্ভুত শক্তি।

বই নিষিদ্ধ করা উচিত নয়—এর প্রথম কারণ, একটি বই নিষিদ্ধ করা মানে শুধু কয়েকটি কাগজের পাতা আটকে দেওয়া নয়; পাঠকের জানার অধিকারকেও সীমিত করা। কোনো বইয়ের বক্তব্য ভুল মনে হলে তার বিরুদ্ধে আরও ভালো যুক্তি লেখা যায়। কোনো মতাদর্শ ক্ষতিকর মনে হলে তার সমালোচনা করা যায়। কোনো বক্তব্য আপত্তিকর হলে পাঠককে তার প্রেক্ষাপট বোঝানো যায়। কিন্তু বইটি যদি একেবারেই পড়তে না দেওয়া হয়, তাহলে পাঠক নিজে বিচার করবে কীভাবে ?

দ্বিতীয়ত, কে নির্ধারণ করবে কোন চিন্তা বিপজ্জনক ?

আজ যে চিন্তা ক্ষমতাবানদের কাছে অস্বস্তিকর, আগামীকাল হয়তো সেটিই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সত্য হয়ে উঠতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বহু লেখক আছেন, যাদের সময়ে তাঁদের বক্তব্য ছিল বিতর্কিত; পরে তাঁদের রচনাই হয়ে উঠেছে সমাজ ও মানুষের পরিবর্তনের মূল্যবান দলিল।

তৃতীয়ত, নিষেধাজ্ঞা মানুষের কৌতূহলকে আরও উসকে দিতে পারে। যে দরজায় লেখা থাকে ‘প্রবেশ নিষেধ’, মানুষের চোখ অনেক সময় সেখানেই আটকে যায়। যে বই দোকানের তাকে নেই, সেটিই হয়তো পাঠক খুঁজতে শুরু করে। Lady Chatterley’s Lover–এর ইতিহাস তার একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

আরও ভয়ংকর হলো আত্মসেন্সরশিপ। যখন একজন লেখক জানেন, একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন করলেই তাঁকে আক্রমণের মুখে পড়তে হতে পারে, তখন তিনি হয়তো প্রশ্নটিই করবেন না। একটি শব্দের বদলে আরেকটি নিরাপদ শব্দ বেছে নেবেন। একটি সত্য লিখতে গিয়ে দশবার ভাববেন। শেষ পর্যন্ত সেন্সরশিপ শুধু বইয়ের ওপর থাকে না; ঢুকে পড়ে লেখকের মনের ভেতরেও।

অবশ্য শিশুদের বয়সোপযোগী বই নির্বাচন, স্কুলের পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, লাইব্রেরির সংগ্রহনীতি কিংবা অভিভাবকের নিজের সন্তানের পাঠ নিয়ে সিদ্ধান্ত—এসব প্রয়োজনীয় সামাজিক ও শিক্ষাগত বিষয়। কিন্তু বয়সভিত্তিক পাঠ-নির্দেশনা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো চিন্তাকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া এক জিনিস নয়।

কারণ গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য এখানেই—এখানে আমরা একই বই পড়ে একমত নাও হতে পারি। কেউ একটি বইকে মহান সাহিত্য মনে করতে পারেন, অন্যজন সেটিকে অপছন্দ করতে পারেন। কেউ কোনো মতাদর্শ গ্রহণ করতে পারেন, অন্যজন তার তীব্র বিরোধিতা করতে পারেন। কিন্তু মতের এই সংঘাতকে যদি বইয়ের দরজা বন্ধ করে সমাধান করতে চাই, তাহলে একদিন দেখা যাবে, প্রশ্ন করার মতো কোনো দরজাই আর খোলা নেই।

বইয়ের বিরুদ্ধে বই দিয়ে লড়াই করা যায়। যুক্তির বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে লড়াই করা যায়। মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্য দিয়ে লড়াই করা যায়। একটি ভুল ধারণার বিরুদ্ধে দশটি সঠিক ধারণা দাঁড় করানো যায়। কিন্তু বই নিষিদ্ধ করে মানুষের চিন্তাকে নিরাপদ রাখা যায় না।

বরং যে সমাজ বইকে ভয় পায়, সে সমাজকে প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কি বইটিকে ভয় পাচ্ছি, নাকি বইটি যে প্রশ্নটি করছে, সেই প্রশ্নটিকে?

একটি বইয়ের পাতা বন্ধ করা যায়। একটি বইকে তালাবদ্ধ করা যায়। একটি বইকে দোকানের তাক থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু মানুষের মনের ভেতরে একবার যে প্রশ্ন জন্ম নেয়, তাকে আর নিষিদ্ধ করা যায় না।

কারণ বই শেষ পর্যন্ত কাগজ নয়—বই একটি দরজা। আর মানুষের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হলো, সে দরজাটি খুলে নিজের চোখে পৃথিবীকে দেখার অধিকার রাখে।

লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.