মশা মারতে জবান দাগান

‘মশা মারতে কামান দাগানো’ – প্রবাদটি আমরা বছরের পর বছর ধরে শুনে আসছি, ব্যবহার করে আসছি। ছোট বিষয়ে বড় প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনকে এই প্রবাদ দ্বারা বোঝানো হয়। তবে বর্তমান সময়ে আমরা আমাদের দেশের মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, সচিবদের যেকোন কিছু মারতে বা প্রতিরোধ করতে জবান দাগাতে দেখি হরহামেশাই। এ বছর ডেঙ্গু আক্রমণ (মহামারী) থেকে বাচতে মশা মারার কাজে তারা প্রতিনিয়ত জবান দাগিয়ে যাচ্ছেন। প্রধান বিরোধী শক্তির নেতৃস্থানীয় একজন নেতাও শুরুতে জবান দাগাতে গিয়েছিলেন। হালে পানি পাননি। অনুশীলনের অভাব ছিল স্পষ্ট। সরকারের মন্ত্রী আমলারা এ কাজে অধিক দক্ষ। আর ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত জনগণকে একটি ইস্যু থেকে অন্য একটি ইস্যুতে নিয়ে যাবার আপদকালীন সময়ের জন্য এর চেয়ে ভাল আর কোন অস্ত্রও হয়তো নেই। তাই যে যার জায়গা থেকে দাগিয়ে চলেছেন জবান।

ডেঙ্গুর আক্রমন মহামারীর আকার ধারণের পূর্বেই  মহামান্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক বলে দিয়েছিলেন, “এডিস মশার প্রজনন ক্ষমতা রোহিঙ্গাদের মতো, যে কারণে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।” স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য নিজেকে এবং নিজের বংশকে এডিস নামের রোহিঙ্গা প্রজাতির মশার হাত থেকে নিরাপদ রাখতে মালয়েশিয়ায় প্রমোদ ভ্রমণে বেড়িয়েছিলেন। কিন্তু বেরসিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সংবাদ মাধ্যমের তোপের মুখে তিনি জীবনের ঝুকি নিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। সেসময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বললেন, “বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা আশপাশের দেশের তুলনায় কম।” বোঝা গেল ডেঙ্গু প্রতিরোধেও বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল। নিশ্চয়ই বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীরা তাদের দেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের মন্ত্রীদের কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন। পরে অবশ্য দেখলাম সরকার ডেঙ্গু মশা নিধনের পরামর্শক হিসেবে ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের দেশে নিয়ে আসলেন। ওদিকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন তো ডেঙ্গুর কথা শুনে প্রথমে বেজায় চটে বলেছিলেন, “ডেঙ্গু নিয়ে ছেলেধরার মতো গুজব ছড়ানো হচ্ছে”।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য বলেছেন, “দেশ যত উন্নত হবে মানুষের সমস্যা তত বাড়বে। যে দেশ যত উন্নত হচ্ছে সে দেশে তত রোগের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডেঙ্গু এলিট শ্রেণির একটি মশা। এ মশা সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, কলকাতা শহরে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন উন্নত দেশ হতে যাচ্ছে, তাই এখন দেশে ডেঙ্গু এসেছে। মানুষের যত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে তত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।” আমরা মাঝে মাঝেই বিভিন্ন ভন্ড পীর ফকিরের স্বপ্নে পাওয়া বিভিন্ন ভন্ড তত্ত্বের সন্ধান পাই। মি. স্বপন তার এই এলিট তত্ত্ব স্বপ্নে পেয়েছেন কিনা জানিনা। তবে এ ধরনের সুপারন্যাচারাল তথ্য মানুষের জন্য কেবল স্বপ্নে পাওয়া সম্ভব।‌ এলিয়েন হলে অবশ্য সেটা ভিন্ন কথা। কেননা তাদের চিন্তার গভীরতা সম্পর্কে আমাদের মর্তের মানুষের ধারণা নেই। আবার হয়তো এমনও হতে পারে যে মন্ত্রী-মেয়রদের জবান দাগানো দেখে প্রতিমন্ত্রী সাহেব নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকে আপন জবান দাগানোর চেষ্টা করেছেন।

ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণের পর স্বাস্থ্য মমন্ত্রনালয় এবং সিটি করপোরেশন যেখানে এর দায় একে অন্যের উপর চাপাচ্ছে, সেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা স্ব স্ব অবস্থান থেকে জবান দাগাতে এগিয়ে এসেছেন। নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, “ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সরকার ছাড়া কেউ কোনও কাজ করছে না। ঢাকা শহরের মেয়রদের দোষারোপ করা হচ্ছে, কিন্তু মেয়র ও সিটি করপোরেশনগুলো আগাম প্রস্তুতি না নিলে ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করতো।” বিষয়টি বোধগম্য হয়নি। দেশের যেকোন সংকটে সরকার কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। অন্য কেউ স্ব-উদ্যোগে কিছু করলে তা প্রশংসা পেতে পারে, কিন্তু সেটা কারো সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের কথায় মনে হয়, সরকার একা এই দায়িত্ব পালন করে দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি অনেক বড় দয়া করছে। এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করা হিসেব অনুযায়ী গত ২০ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের অনুমিত সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ। সংবাদ মাধ্যমের হিসেব অনুযায়ী সেই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ৮০ জনের অধিক। সরকারি হিসাবেই প্রতিদিন ২০০০ এর বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে মি. খালিদ সেটিকে মহামারী হিসেবে গণ্য করতেন, তা হয়তো কেবল তিনিই জানেন।

বরাবরের মত এবারও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে বলতে শোনা গেছে যে এবার প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং ডেঙ্গু এবার নির্মূল হবেই। সেটি কতটা বাস্তবসম্মত বয়ান তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও; যদি তা’ই হয়, তবে নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে এই কার্যকর ব্যবস্থা আগে থেকে নেয়া যেত না? আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ৩ আগষ্ট প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং সেল গঠনের ঘোষণা দেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজ চিকিৎসার জন্য বিলেতে ছিলেন। জনাব কাদের বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্যরা এই নির্দেশ কি আরো আগে দিতে পারতেন না? মি. কাদের দেশকে ডেঙ্গুমুক্ত করার আগ পর্যন্ত ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিয়ে লড়াই করার ঘোষনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর  গত ৭ আগষ্ট মি. কাদের বললেন, “কিছু দিনের মধ্যেই কার্যকরী ওষুধ দেশে আসবে।” তাহলে এই কার্যকর ওষুধ আগে কেন আনা হল না? অন্তত ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার পর পরই কেন এই উদ্যোগ নেয়া হল না – সে বিষয়ে অবশ্য মন্ত্রী মহোদয় কিছু বলেননি। মশক নিধনের ওষুধ নিয়ে দূর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কথা সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে আমরা সবাই ইতিমধ্যে কমবেশি জেনেছি। এটি অবশ্য এই আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক নয়। তাই বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না।

ঈদের আগে যেহেতু দেশ ডেঙ্গুমূক্ত হয়নি, তাই পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সড়কমন্ত্রী ডেঙ্গু বিরোধী লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলেন হয়তো। তাই সড়কে নজর দেবার সময় পাননি। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে এবার ঈদে ৪-৫ ঘন্টার রাস্তা মানুষ ২৪-২৫ ঘন্টায় পার হয়েছে। জনাব কাদেরের কাছে অবশ্য এই দীর্ঘযাত্রাই ঈদ আনন্দ। সেদিক থেকে হিসেব করলে তিনি জনসাধারণের ঈদ আনন্দ বাড়িয়ে দেবার জন্য ধন্যবাদ আর প্রশংসা দাবি করতেই পারেন। তার মতে,      ‘বাংলাদেশের মানুষ ঈদযাত্রার দুর্ভোগকে দুর্ভোগ হিসেবে মনে করে না।’ মি. কাদের আরও বলেন, ‘আজকে রাস্তার কোথাও দুর্ভোগ আছে এমন কোনও ইনফরমেশন আমি পাইনি। টাঙ্গাইলের রাস্তায় গাড়ির ধীরগতি আছে।’ নিউজটি যখন পড়লাম তখন আমি সহ কমপক্ষে ৮-১০ হাজার মানুষ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুরে সাড়ে চার ঘন্টা যাবত একই স্থানে বসে আছি। তারও প্রায় ঘন্টা দুয়েক পর ঐ স্থান থেকে যানবাহন চলতে শুরু করে। আমি অন্তত সেখানে কাউকে ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে দেখিনি। পরবর্তিতে এলেঙ্গা নামক স্থানে পুনরায় সাড়ে পাচ ঘন্টা একই স্থানে ঈদ আনন্দ উপভোগ করে ৩ ঘন্টার পথ সাড়ে ২২ ঘন্টায় পার হয়ে ঈদ আনন্দ ভ্রমণ শেষ করি। এবার  জবান দাগানোর পালা। ১১ তারিখ মি. কাদের সড়কে ভোগান্তির জন্য ক্ষমা চাইলেন। পরদিন জানালেন, “ঈদে যাঁরা বাড়ি গেছেন, তাঁদের কর্মস্থলে ফেরা ঈদযাত্রার মতোই স্বস্তিকর হবে।” তবে তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেন কেন? স্বস্তিকর ঈদ যাত্রার জন্য?

জবান দাগাতে পিছিয়ে পড়তে চাননি মাননীয় শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন। তিনি এবারের কোরবানি ঈদে চামড়ার দামের অস্বাভাবিক পতনের পেছনে বিরোধী দলের কারসাজি খুজে পেয়েছেন। যেখানে সারাদেশের প্রত্যেকটি মানুষ এ বছর চামড়ার অকল্পনীয় দর পতন এবং চামড়া নষ্টের বিষয়ে অবগত, সেখানে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র অবগত নন। হয়তো দেশের মানুষের সেবায় এতটাই নিবেদিত তিনি যে এই অতি সামান্য খবরটা রাখার ফুসরত পাননি। তবে তিনি এই খবরটি রেখেছেন যে সংবাদ মাধ্যম চামড়ার দাম নিয়ে অতিরঞ্জিত খবর প্রচার করছে। মন্ত্রণালয় সামলানোর পাশাপাশি জেমস বণ্ডের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি এই বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন যে চট্টগ্রামে ৩০ ট্রাক চামড়া বিএনপি কিনে ফেলে দিয়েছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জবান দাগানোর চেষ্টা করে বলেছিলেন, “সরকার মশার বিস্তার ঘটিয়ে মানুষ মারছে।” তাতে লাভ টা মশার হয়েছে নাকি মানুষের – তা স্পষ্ট নয়। একটা বিরতির পর বেশ কিছু তথ্য উপাত্ত নিয়ে সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আবারও এলেন সামনে। এবার তার বক্তব্য হচ্ছে, “আমেরিকা, সিংগাপুর, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এমনকি আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতেও ডেঙ্গু হচ্ছে। আমাদের দেশেও এই ডেঙ্গু হচ্ছে। ঘাবড়ানোর কিছু নেই।” ডেঙ্গুতে যতটা না ঘাবড়াচ্ছি, তার থেকে বেশি ঘাবরে যাচ্ছি আপনাদের কথা শুনে। কতগুলো প্রাণহানির পর আপনারা মহামারি বলবেন, কতগুলো প্রাণ গেলে জনগণের কথা ভেবে আপনারা ঘাবড়াবেন সেই হিসেব টা মেলাতে পারছি না। জবান দাগিয়ে বিরোধী মতকে দমন করা গেলেও মশা মারা যাবে না – সে বিষয়টি নিশ্চিত। তাই অনুরোধ, এবার একটু জনগণকে ক্ষমা করেন। আপনাদের জবানকে বিশ্রাম দিন। আপনাদের জবান দাগানো শোনার জন্য তো আমাদের বেচে থাকতে হবে। জনগণকে বাচার সুযোগটা করে দিন।

সাকিব আনোয়ার

লেখক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.