#অং_চুং_ফুং
চোখ কুতকুতে এই রিকসাওয়ালাটা প্রায় প্রতিদিনই আমাদের বাসার নিচে গাছতলায় রিকসায় বসে ঘুমায়।
কুতকুতে চোখের কারণে, ঘুমায় না জেগে থাকে বুঝা মুসকিল। তার চেহারা দেখে আমি ভাবতাম, সে কোন উপজাতি-টুপজাতি হবে। ইদানিংকালের হলে ধরে নিতাম রোহিঙ্গা।
দুই একদিনের কথা না, প্রায় দশবচ্ছর ধরে তাকে এইভাবে বসে থাকা দেখছি। কোনদিন তাকে রিকসা চালাতে দেখিনি। চালালে চালাতেও পারে, আমিতো আর সারাদিন তার সামনে বসে থাকিনা।
‘এই রিকসা যাবে’ বললেও সে কথা কয়না, নড়াচড়াও করেনা। এলাকার রিকসা অথচ যাবেনা! ড্যাম্ কেয়ার ভাব! মেজাজটা কেমন লাগে!
একদিন আমি আর আমার স্ত্রী ছোটমেয়েটাকে নিয়ে বের হয়েছি। শান্তিনগরে ডাক্তারের কাছে যাবো। বললাম, এই রিকসা, শান্তিনগর যাবে? কেয়ারই করলোনা! ড্যাম্ কেয়ার!
পরে শুনলাম, সে কানে শোনেনা, কথাও বলতে পারেনা। কালা-বোবা ভালোকথা, ঈশারাতো বুঝতে পারে! অবশ্য পরে আরও শুনলাম যে, সে নাকি দুরের খ্যাপ মারেনা। শুধু মহল্লার ভিতরের স্কুলের বাচ্চাদের আনা-নেওয়া করে। তাছাড়া তার গায়েও একছটাক শক্তি নাই। শক্তি অবশ্য দাঁড়িপাল্লায় সের-ছটাক দিয়ে মাপা যায়না। দূর্বল স্বাস্থের লোক দেখলে এমন কথা বলা হয়।
আবার কথায় আছেনা- ‘নাজাই মানষের বেজাই কাজ’। এইধরনের নাজাই লোকের রিকসায় চড়াও কিন্তু ঠিকনা, বিপদজনক। যেকোন মুহূর্তে এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে দিতে পারে। দ্রুতগতির যানবাহনের মধ্যে ঠিকমতো পাশ কাটাতে না পারলে বিরাট বিপদ।
মহল্লার সালাম ভাইকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম,
– সালাম ভাই, চাকমাইয়া ঐ রিকসায়ালার বাড়ী কই, নাম কী?
– কোন রিকসায়ালা?
– আরে ঐযে চায়নিজ, আমাদের বাসার নিচে গাছতলায় সারাদিন রিকসা লইয়া ঘুমায়?
– ঐ চাকমা হালাই? ওর আবার নামের কী? অং চুং ফুং কিছু একটা হইবো। বাড়ী জানি কই, মনে হয় ময়মনসিং। হালাইতো কথা কইতে পারেনা।
তারপর থেকে রিকসাওয়ালাটার জন্য একটু মায়া লাগে। তখন থেকে আমার ধারণা যে, সে ময়মনসিংহের আদিবাসী গারো টারো হবে।
তারপর দীর্ঘ দশ বছর কেটে গেছে। এখনো সে একইভাবে গাছতলায় রিকসা নিয়ে বসে থাকে। কিন্তু আমরা আর কখনও তার রিকসায় চড়ার চেষ্টা করিনা।
ইতিমধ্যে আমার ছোটমেয়েটা বড় হয়েছে। তাকে মহল্লার স্কুলেই ভর্তি করেছি। এখন রোজ সকালে আমার মেয়েকে লাল স্কুলড্রেস পরে গেট দিয়ে বের হওয়া দেখলেই, সে তার রিকসা নিয়ে ছুটে আসে।
নাজাই মানষের রিকসায় উঠা ঠিকনা জেনেও এখন মাঝে মাঝে তার রিকসায় উঠি।
একসময় আরও কয়েকজন রিকসাওয়ালা আমাদের দেখে ছুটে আসতো। এটা হলো, আলগা খাতির। অবশ্য রিকসাওয়ালাদের সাথে খাতির থাকা ভালো, জরুরী সময় কাজে লাগে। কিন্তু ‘রিকসা সম্পর্ক’ আমাদের বেশীদিন লাষ্টিং করেনা। আগে যারা ছিল, এখন তারা আমাদের দেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো মনঃপূত বকশিস্ না পেয়ে এখন তারা নিজেরাই ছুটে গেছে।
এখন নতুন করে চুং ফুং আমাদের পিছু নিয়েছে।
চুং ফুং আমাদের পিছু নেওয়ার দুইটা কারণ থাকতে পারে।
এক. আমার মেয়ের লাল স্কুলড্রেস
দুই. আসন্ন ঈদুল্ আযহা অর্থাৎ কুরবানি।
লাল স্কুলড্রেস সে চেনে। মহল্লার স্কুল, সুতরাং তার উপযোগী খ্যাপ। পাশাপাশি ঈদের বকশিস্ তো তার পাওনা, হক্।
ঈদের কয়দিন বাকি থাকতে আসতে যেতে মহল্লার বেশ কয়েকজন লোক আমাকে সালাম দেয়। যদিও আমার চেহারা-সূরোত দেখে কারও সালাম দেয়ার কথানা। কারণ, আমার চেহারাপাতির সাথে সাথে মুখে কোন দাঁড়ি-মোচও নাই, মাকুন্দা। আমি নিশ্চিত যে, চুং ফুং ঈদের বকশিস্ চাইবে। কুরবানির দিন মাংশ নিতে আসবে। কারণ এর আগেও তাকে দু’একবার মাংশ নিতে দেখেছি।
কিন্তু সে এখন পর্যন্ত কোন বকশিস্ চাইলোনা। আমি জানি যে সে বোবা, কথা বলেনা। বকশিস্ চাইতেতো আর কথা বলা লাগেনা। রিকসাভাড়া নেওয়ার পর হাতটা পেতে রাখলেইতো বুঝা যায়। সেও চায়নি, আমারও মনে নাই। প্রতিদিনই দেখা হয়, মনে থাকেনা। কিন্তু ঈদেরদিন আর তাকে খুঁজে পেলামনা। বেটা মাংশ নিতেও এলোনা। হয়তো ঈদ করতে দেশে চলে গেছে। কিন্তু দেশ-গ্রাম থেকে গরীব-গুরপো অনেকেইতো ঈদের আগে আগে ঢাকা শহরে আসে কুরবানির মাংশ নিতে। চুং ফুং মাংশ ছাড়াই বাড়ী চলে গেল কেন কে জানে!
ঈদের ছুটি শুরু হলে সবখানেই কিছুটা শুন্য লাগে। যানজটের অচল নগরীতে তখন ক’দিনের জন্য কী যেন নাই নাই মনে হয়। ঢাকা কেমন যেন ফাকা ফাকা লাগে। প্রিয় মানুষটা দুরে চলে গেলে যেমন করে ফাকা লাগে। সবকিছুই থাকে, তবুও মনে হয় কোথাও কেউ নেই, কিছু নেই। মানেন আর না মানেন, চুং ফুং এর মতো একজন তূচ্ছ লোক চলে গেলেও কিন্তু একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়। ঈদের ছুটিতে এখন কতভাগ লোক ঢাকা ছেড়ে বাড়ীতে যায় সঠিকভাবে জানা দরকার।
সবার ছুটিছাটা শেষ হয়েছে। আবার সেই ছোটাছুটি। ঢাকা আবার সেই আগের ঢাকা। মেয়ের স্কুল, আমার অফিস প্রতিদিনের রুটিন। যেতে আসতে আশেপাশে রোজই চোখ বুলিয়ে যাই কিন্তু চুং ফুংকে কোথাও দেখিনা। কাউকে জিজ্ঞেসও করিনা। জিজ্ঞেস করলে লোকে নানান কথা জানতে চাইবে, ‘চুং ফুংকে খোঁজেন কিল্লাই’। বকশিসটাও দিলামনা! বেটা কি মরে টরে গেল নাকি!
এদিকে আমার স্ত্রী তার ফ্রিজে জমানো আমাদের ভাগের কুরবানির মাংশ থেকে একপুটলা দিতে রাজী হয়েছে। কিন্তু চুং ফুংকেইতো এখন খুঁজে পাচ্ছিনা। দরকারের সময় সাধারণ একটা জিনিষও সহজে পাওয়া যায়না। যখন দরকার নাই তখন পায়ের কাছে গড়াগড়ি খায়। আসলে কাউকে কিছু দেওয়ার নিয়েত করলে, সাথে সাথে সেই নিয়েত আদায় করতে হয়। অবহেলায় আজ না কাল করতে করতে দেখা যায়, আসল লোকই গায়েব!
অবশেষে প্রায় একমাস পরে হঠাত চুং ফুংকে পাওয়া গেল। আমি দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি, অফিসের গাড়ি ধরতে হবে। দেখি চুং ফুং রিকসা ছাড়াই আগের সেই গাছতলায় বসে আছে। আমি তাকে ঈশারা দিতেই সে ছুটে এলো। আমি বোবা মানুষের সাথে ঈশারায় কোন কথা ভালোমত বুঝাতে পারিনা। চার আঙ্গুল দেখিয়ে মোটামুটি তাকে বুঝাতে চাইলাম,
‘আমার হাতে সময় নাই। তুমি চারতলায় যাও। তোমার মামি তোমাকে একপুটলা মাংশ দেবে’।
বেটা কী বুঝলো সেই জানে। হঠাত হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললো। আমি বাসায় ফোন দিয়ে জানিয়ে দিলাম, চুং ফুং যাচ্ছে।
ঘন্টা দু’এক পরে বাসায় ফোন করে জানতে চাইলাম, চুং ফুং মাংশ নিয়ে গেছে কিনা। আমার স্ত্রী বললো,
‘তুমি কি ওকে চারতলার কথা বলোনাই। সেতো প্রথমে নিচতলার দরজা নক্ করেছে। তারা কিছু জানেনা। তারপর দোতলায়, তারাও কিছুই জানেনা। এরপর তিনতলায়। কেউই জানেনা কে তাকে আসতে বলেছে। সেতো আর কথা কইতে পারেনা। সিঁড়ির মধ্যে হৈ চৈ শুনে আমি দরজা খুলে দেখি সে তিনতলার সিঁড়ির মধ্যে শুয়ে পড়ে কাঁন্নাকাটি করছে। আমি তাকে মাংশ দিয়ে বিদায় করে দিয়েছি। কিন্তু এখনো সে বাসায় যায়নি। মাংশের পুটলা পাশে রেখে সে গাছতলায় বসে কাঁদছে।
তারপরের ঘটনা আর জানিনা। চুং ফুং আবার গায়েব। আমার ধারণা, চুং ফুংয়ের ফ্যামিলি এখানে থাকেনা, দেশে থাকে। এখানে সে মেচে টেচে খায়। দেড় দুইকেজী মাংশ পেয়ে সে এখন পড়েছে মহাবিপদে। মাংশগুলি মেচে দিলে সবাই খেয়ে ফেলবে। তাই সে হয়তো অনেক ভেবেচিন্তে আবার ময়মনসিংহ চলে গেছে। বাড়ী যাওয়া পর্যন্ত সেই মাংশ পচে গেছে কিনা কে জানে।
এরপরের সপ্তাহে আমি একদিন সকাল সকাল অফিসে যাচ্ছি। অফিসের গাড়ী নাই। আবুল হোটেল থেকে বাস ধরতে হবে। চুং ফুং দেখি রিকসা নিয়ে গাছতলায় দাঁড়িয়ে আছে। ঈশারা দিতেই সে এগিয়ে এলো। তার রিকসায় চড়ে যাচ্ছি আর ভাবছি, সেদিনের ঘটনাটা জানা দরকার। কিন্তু রিকসা চালানো অবস্থাই সেতো আমার ঈশারা দেখতে পারবেনা। তাছাড়া নাজাই মানুষ, পিছন দিকে ঘাড় ঘুরালেই বিপদ ঘটবে। সেইজন্য আবুল হোটেলের সামনে রিকসা থেকে নেমে ঈশারায় নানান ভঙ্গীমা করে তাকে বলার চেষ্টা করছি,
‘সেদিন যে মাংশ নিয়ে গেলে, মাংশ পচে যায়নিতো? ঠিকমতো খেতে পারছিলেতো? তোমার বউ পুলাপাইন সবাই খেয়েছেতো?
অনেকক্ষণ ধরে সে আমার অঙ্গভঙ্গিমা দেখার পর হঠাত করে সে বলে উঠলো,
– মামা, আপনি কি বোবা? কথা কইতে পারেন না? আহারে!
প্রথমে আমার মনে হলো রাস্তার অন্যকোন লোক বোধহয় কথা বলছে। সে আবার আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
– মামা, সবসময় দেখি আপনি আমার লগে ঈশারায় কথা কন, আপনি কি কথা কইতে পারেননা?
আমি কী জবাব দেব কিছু ভেবে না পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
– তোমার বাড়ী কই? সে বললো,
– সোনারগাঁও।
– তোমার নাম কী?
সে বললো,
– আমার নাম মোহাম্মদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
– সালাউদ্দিন কাদের চৌ………….
এরপর আমি আর তাকে কিছুই বলতে পারলামনা। এবার আপনারাই বলুন, বেটাকে কী দিয়ে পিডান দরকার 😀

