দশম পর্ব
১৯৭৩-৭৪ সালের সেই সময়টাকে এখন ফিরে দেখলে মনে হয়, আমাদের রাজনৈতিক শিক্ষার দুটি বড় বিদ্যালয় ছিল—একটি বই, অন্যটি সিনেমা।
দিনে সভা-মিছিল, রাতে বই পড়া; আবার সুযোগ পেলেই রাজনৈতিক চলচ্চিত্র দেখা। আমাদের কাছে এগুলো ছিল শুধু বিনোদন নয়, রাজনৈতিক শিক্ষারই অংশ। আজকের প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, একটি সিনেমা দেখে আমরা কত রাত ধরে আলোচনা করেছি, একটি বই পড়ে কতদিন ধরে তর্ক করেছি।
সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্মিত বিপ্লবভিত্তিক চলচ্চিত্র বাংলাদেশে আমদানি হতো। অধিকাংশই ইংরেজি ভাষায় ডাব করা বা সাবটাইটেলযুক্ত।
আমরা এসব চলচ্চিত্রের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম।
কোন সিনেমা কোন হলে এসেছে, কে আগে খবর পেয়েছে—এসব নিয়েও আমাদের মধ্যে আলোচনা চলত।
“লিবারেশন”—প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব—ছিল আমাদের অত্যন্ত প্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত সেই বিশাল ক্যানভাসের সিনেমা শুধু যুদ্ধের গল্প বলত না; সংগঠন, নেতৃত্ব, আত্মত্যাগ এবং মানুষের অদম্য সংগ্রামের কথাও বলত।
তবে যে চলচ্চিত্রটি আমাদের মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল, তার নাম “ব্ল্যাক এঞ্জেল”।
বুলগেরিয়ায় নির্মিত সেই চলচ্চিত্র আমরা একবার নয়, অন্তত সাতবার দেখেছিলাম।
আজও মনে আছে, সিনেমা শেষ হওয়ার পর কেউ তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরত না।
হল থেকে বেরিয়ে আমরা দল বেঁধে হাঁটতে হাঁটতে ছবির প্রতিটি দৃশ্য নিয়ে আলোচনা করতাম।
আমাদের কাছে “ব্ল্যাক এঞ্জেল” শুধু একটি সিনেমা ছিল না; এটি ছিল বিপ্লবের কৌশল নিয়ে একটি রাজনৈতিক পাঠ।
ছবিটির মূল বার্তা আমরা এভাবেই বুঝেছিলাম—জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে শুধু গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে বিপ্লব সফল করা যায় না।
সশস্ত্র সংগ্রাম যদি মানুষের জীবন ও আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তার পরিণতি হয় বিপর্যয়।
এই উপলব্ধি আমাদের দীর্ঘ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সিনেমার গল্প থেকে আমরা বাস্তব রাজনীতির শিক্ষা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম।
আজ মনে হয়, তখন হয়তো আমাদের অনেক ব্যাখ্যাই ছিল আবেগনির্ভর, কিন্তু শেখার আগ্রহে কোনো ঘাটতি ছিল না।
আমাদের প্রজন্মের আরেকটি বড় অনুপ্রেরণা ছিল ভিয়েতনাম।
ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ যেন আমাদের নিজেদের সংগ্রামেরই সম্প্রসারণ বলে মনে হতো।
হো চি মিন তখন শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক নন; তিনি ছিলেন সংগ্রামের প্রতীক।
জেনারেল ভো নগুয়েন গিয়াপ ছিলেন কিংবদন্তির মতো এক নাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিলে তখন প্রায়ই ধ্বনিত হতো—
“ভিয়েতনামের বীর জনতা, কম্বোডিয়ার বীর জনতা—লও, লও লাল সালাম।”
সেই স্লোগান শুধু কণ্ঠে উচ্চারিত হতো না; আমাদের মনেও গভীর রেখাপাত করত।
আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল ভিয়েতনামের যুদ্ধ নিয়ে।
বিশেষ করে কীভাবে একটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল জাতি দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে—সেই প্রশ্ন আমাকে গভীরভাবে ভাবাত।
একদিন নিউমার্কেটের উল্টো দিকে বলাকা ভবনের নিচতলায় অবস্থিত বইপত্র বইয়ের দোকান থেকে আমি কিনলাম জেনারেল গিয়াপের “জনযুদ্ধে গণফৌজ” বই।
বইটি হাতে পাওয়ার আনন্দ আজও মনে আছে।
আমার রাজনৈতিক শিক্ষা এবং সামরিক কৌশল সম্পর্কে আগ্রহ—দুটোই যেন একসঙ্গে পূরণ হচ্ছিল।
এই বইয়ের দোকানটির সঙ্গে আমার পরিচয় আরও আগে।
১৯৭২ সালে ছাত্রলীগ বিভক্ত হওয়ার পর সাধারন সম্পাদক আ ফ ম মাহবুবুল হকের পরামর্শে আমি এখান থেকেই ডা. নিহাররঞ্জন রায়ের লেখা “ছোটদের অর্থনীতি” এবং “ছোটদের রাজনীতি” বই দুটি কিনেছিলাম।
রাজনৈতিক তত্ত্ব বোঝার প্রথম পাঠ হিসেবে তিনি এই বই দুটি পড়তে বলেছিলেন।
বইপত্র ছিল আমাদের কাছে শুধু একটি বইয়ের দোকান নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক কর্মীদের এক অনানুষ্ঠানিক মিলনকেন্দ্র।
দোকানের মালিক ছিলেন সালে আহমেদ।
আমরা সবাই তাঁকে “সালে ভাই” বলতাম।
শুনেছিলাম, তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) ছিলেন। সেই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ওই কলেজের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সময়কার কয়েকটি পত্রিকার কাটিং তিনি যত্ন করে ফ্রেমে বাঁধিয়ে দোকানের দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছিলেন।
সাদা পাঞ্জাবি, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, সামনে বইয়ের স্তূপ—এই ছিল সালে ভাইয়ের চিরচেনা রূপ।
তিনি শুধু বই বিক্রি করতেন না; বইয়ের খবরও রাখতেন।
নতুন কোনো রাজনৈতিক বই এলেই আমাদের জন্য আলাদা করে রেখে দিতেন।
বলাকা ভবনে ছাত্রলীগের অফিসে যাওয়ার পথে প্রায়ই তাঁর দোকানে ঢুঁ মারতাম।
কখনও বই কিনতাম, কখনও শুধু নতুন কী এসেছে তা দেখতে যেতাম।
পাকিস্তান আমল থেকেই বহু ছাত্রনেতা তাঁর দোকান থেকেই বই সংগ্রহ করতেন।
সেই ধারাবাহিকতা স্বাধীন বাংলাদেশেও অব্যাহত ছিল।
আমাদের আরেকটি প্রিয় ঠিকানা ছিল ঢাকা স্টেডিয়ামের দোতলায় অবস্থিত স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স।
দোকানটি ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের।
পরিপাটি, সুশৃঙ্খল এবং বইয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহে ভরা।
এখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আমদানি করা অসংখ্য বই পাওয়া যেত।
কার্ল মার্কসের রচনাবলি, “রাষ্ট্র ও বিপ্লব”, “কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার”, লেনিনের বিভিন্ন রচনা—সবই সেখানে সাজানো থাকত।
শুধু রাজনৈতিক বই নয়, রুশ সাহিত্যেরও সমৃদ্ধ ভাণ্ডার ছিল দোকানটিতে।
ম্যাক্সিম গোর্কি, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, লিও তলস্তয়, আন্তন চেখভ—এমন বহু লেখকের বই সেখানে পাওয়া যেত।
বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়ালে মনে হতো, যেন আরেকটি জগতে এসে পড়েছি।
আমরা বইয়ের মলাট দেখেই মুগ্ধ হয়ে যেতাম।
একদিন সন্ধ্যায় বই কিনতে গিয়ে একটি স্মরণীয় দৃশ্যের সাক্ষী হলাম।
দেখি, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ নিজেই বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে বই দেখছেন।
কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই।
কোনো বাড়তি নিরাপত্তার প্রদর্শন নেই।
তিনি ধীরে ধীরে একটি তাক থেকে আরেকটি তাকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, বই হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখছেন।
আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলাম।
আমাদের কাছে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন মেধাবী, সৎ এবং নিরহংকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার চোখে পড়ত না।
একজন মন্ত্রীকে বইয়ের দোকানে এত সাধারণভাবে বই খুঁজতে দেখার অভিজ্ঞতা আমার কাছে নতুন ছিল।
সেই সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি গুঞ্জনও শুনেছিলাম।
জাসদ গঠনের সময় নাকি তাঁকেও সেখানে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
কেন শেষ পর্যন্ত তিনি যোগ দেননি, তার প্রকৃত কারণ আজও আমার জানা নেই।
ইতিহাস হয়তো তার উত্তর কোনোদিন দেবে।
তবে তরুণ বয়সে আমরা নিজেদের মধ্যে প্রায়ই আলোচনা করতাম—যদি তিনি জাসদে যোগ দিতেন, তাহলে হয়তো সেই দলের নেতৃত্বের চিত্র অন্যরকম হতে পারত, আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসও হয়তো ভিন্ন পথে প্রবাহিত হতো।
এটি অবশ্যই আমাদের সময়ের কল্পনা ও আলোচনার বিষয় ছিল, ইতিহাসের নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়।
আজ এত বছর পরে ফিরে তাকিয়ে বুঝতে পারি, আমাদের প্রজন্ম শুধু রাজনীতি করেনি; আমরা নিজেদের তৈরি করারও চেষ্টা করেছি।
বই পড়ে, সিনেমা দেখে, তর্ক করে, মতের অমিল নিয়ে বিতর্ক করে আমরা বিশ্বাস করতাম—জ্ঞান ছাড়া বিপ্লব হয় না।
হয়তো আমাদের অনেক উপলব্ধিই ছিল অসম্পূর্ণ।
অনেক সিদ্ধান্তই ছিল আবেগে ভরা।
তবু সেই সময়ের একটি বড় শক্তি ছিল—শেখার অদম্য আগ্রহ।
রাজনীতি তখন কেবল ক্ষমতার প্রশ্ন ছিল না; ছিল চিন্তারও প্রশ্ন।
আর সেই কারণেই সিনেমা হল, বইয়ের দোকান, পাঠচক্র এবং ছাত্রলীগের অফিস—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল আমাদের আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে পাঠ্যবইয়ের বাইরে ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন একসঙ্গে শেখা হতো।
লেখক: হাবিব বাবুল
৭০ দশকের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অনুসারী ছাত্রলীগের সংগঠক

