“জলের শ্যাওলা”- লেখার শুরুতেই একটি কথা স্পষ্ট করেই লিখছি:
“ক্ষমতার চারপাশে গড়ে ওঠা বলয় এবং প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা প্রায় সময় শাসকের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করে”
না, এটা কোন বিখ্যাত ব্যক্তির বচন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের “রাজনীতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক দলগুলোর কর্ম” যতটুকু দেখেছি, পড়েছি, বুঝেছি এবং জেনেছি, সেই সব পর্যবেক্ষণের আলোকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কথাটি বলা মাত্র।
আসুন এবার একজন বিখ্যাত রাজনৈতিক চিন্তাবিধ ও দার্শনিকের একটি বিখ্যাত উক্তি পড়ি:
বিখ্যাত রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (Niccolò Machiavelli) তাঁর The Prince গ্রন্থে একটি বিখ্যাত উক্তি আছে:
“The first method for estimating the intelligence of a ruler is to look at the men he has around him.” (সরাসরি বইয়ের পাতা থেকে তুলে দিলাম)
বাংলা অর্থ: একজন শাসকের প্রজ্ঞা ও যোগ্যতা বোঝার প্রথম উপায় হলো, তাঁর চারপাশে কেমন মানুষ রয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করা।
একটি প্রশ্ন:
“বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে কি?” কেন এমন প্রশ্ন করছি?
আমার ক্ষুদ্র রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ বলছে:
তারেক জিয়া যেহেতু জীবনের ১৭ টা বছর (তাও আবার পূর্ণাঙ্গ বয়সে) বৃটেনের মতন গণতান্ত্রিক দেশে ছিলেন এবং নিশ্চই বৃটেনের রাজনীতি নজরে রাখতেন, বৃটেনের সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা নজরে রাখতেন, এবং বৃটেনের সমাজকে বসবাসের কল্যাণেই জেনেছেন এবং বুঝেছেন, সেই সূত্রেই লিখছি, নিশ্চয়ই একজন শাসক হিসেবে তারেক জিয়া ফ্যাসিবাদী হতে চাইবেন না এবং ফ্যাসিবাদ হতে তাঁর মন সায় দিবে না বলেই মনে করি। আবার বলি জীবনের পূর্ণাঙ্গ বয়সে বৃটেনে বসবাসের প্রভাব তারেক জিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে ফ্যাসিবাদ হতে দূরে রাখবে। এমনকি শাসক হিসেবে তারেক জিয়ার আচার- আচরণ বা বলা- চলা- ফেরা অথবা অন্ততপক্ষে বাহ্যিক প্রকাশ বর্তমান পর্যন্ত সেটার প্রমাণ রাখে।
তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার নিশ্চয়ই এখনও ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করেনি বটে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যক্তিগত সহনশীলতা বা বাহ্যিক আচরণ (যা তারেক জিয়ার মাঝে সচরাচর দেখা যাচ্ছে/ সেটাকেই আমি বাহ্যিক বলে উল্লেখ করছি) আর রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক দর্শন কি একই বিষয়? উত্তরটি হবে, নিশ্চয়ই না।
আমার রাজনৈতিক বুঝ ও পর্যবেক্ষণের দর্পণে দেশে এক ধরণের বড় ও জটিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতে দেখছি। আমি বিশ্বাস করি এবং বিশ্বাস রাখতে চাই, তারেক জিয়া হয়তো ব্যক্তিগতভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়তে চান, কিন্তু তাঁর চারপাশের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি (কতটা রাজনৈতিক? সেই প্রশ্ন করছি না) বা রাজনৈতিক শক্তি, সুবিধাভোগী গোষ্ঠী কিংবা আদর্শিকভাবে অসহিষ্ণু মহল তাঁকে সুস্থ রাজনৈতিক চিন্তাধারায় থাকতে দিবে না এবং ভিন্ন পথে পরিচালিত করতে পারে বলেই শঙ্কা করি।
একটি কথা নিশ্চয়ই সবাই আমার সাথে একমত হবেন যে, ছোট্ট ভূমির, ছোট্র এই দেশের ১৮ কোটি জনতাকে পরিচালনা করা মোটেও সহজ বিষয় নয়। এমন একটি দেশকে শান্তিতে রাখতে হলে সর্বপ্রথম যেটা হতেই হবে, তা হলো রাজনৈতিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য মোটাদাগে সহনশীলতা ও সমঝোতা (এমন কথা দেশের সকল পক্ষ বলেন বটে)। এমন একটি দেশে, দেশের এক সময়কার বৃহৎ রাজনৈতিক দল এবং যে দলটির নেতৃত্বে এই দেশটি যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে, তেমন একটি দলকে নিষিদ্ধ রেখে এবং নিশ্চিহ্ন করে দেবার ভাবনা যদি সরকার করে, তাহলে এই দেশে কেয়ামত পূর্বেও শান্তির মা আসিবে না, এটা নিশ্চিত লিখে রাখতে পারেন। আমি বেশ অবগত আছি যে, আমার এই বচন বহুজনের শতভাগ অপছন্দ হবে তবে ইহাই কঠিন সত্য।
লক্ষ্য করুন, উপরের প্যারাগ্রাফেই আমার লেখা বচনে আমি কিন্ত লিখিনি যে, তারেক জিয়া সেটা চান। উল্টো আমি স্পষ্টতই লিখছি, তারেক জিয়া এমনটা চান না। কেন? কারণস্বরূপ উপরেই বৃটেন এবং তারেক জিয়া নিয়ে কিছু উপসর্গ তুলে ধরেছি, যা সাধারণ ভাবনা থেকেই আসা। ঠিক সেখানেই প্রশ্ন উঠে তাহলে কেন এমন শঙ্কা করছি?
উত্তরটি এখানেও বেশ সহজ। ক্ষমতার চারপাশে গড়ে ওঠা বলয় এবং প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা।
স্বরণে রাখা ভাল যে, একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে, সেই রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনোই করা যায় না। তারেক জিয়ার ক্ষমতার চারপাশে গড়ে ওঠা বলয় এবং প্রভাবশালীরা নিশ্চিত তারেক জিয়াকে সেই আগুনের গোলাতেই ঠেলে দিচ্ছেন দিনকে দিন (আপন ভাবনা) এবং তেমনটাই প্রতিনিয়তই নানান ধরণের কর্ম থেকে বেশ অনুমেয় হয়।
সহজ বাংলায় বলি:
বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে স্পষ্টতই লিখতে হয় যে, আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়; বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তি। দলটির শাসনামলে গণতন্ত্র, নির্বাচন, মানবাধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলের অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে। যারা অপরাধ করেছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, আইনের আওতায় আনতে হবে। এগুলো সব ঠিক আছে এবং জনমানুষেরাও এগুলোর সমর্থক।
কিন্তু একটি দলের নেতৃত্বের অপরাধ এবং সেই দলের সমর্থক, কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের রাজনৈতিক অধিকার কখনোই এক বিষয় নয়।এটা রাজনৈতিক বিজ্ঞানের কথা। কোনো দলের অপরাধের বিচার করতে গিয়ে সেই দলের সমগ্র রাজনৈতিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করে দেশে কখনোই গণতান্ত্রিক সমাধান আসতে পারে না এবং ১৮ কোটির ছোট্ট ভূমির এ দেশেতো হবারই নয়। আবার লিখছি, লিখে রাখুন ওটা রাজনৈতিক সূত্রেই হবার নয়। এখানে ছোটো করে একটি কথা বলি, “একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মতাদর্শগতভাবে একমত না হয়েও তার সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকারকে স্বীকার করা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত কিন্ত”।
যা হোক, লেখা শুরু করেছিলাম ফ্যাসিবাদ শব্দ দিয়ে (যদিও আমি ফ্যাসিবাদ শব্দটি লিখি না/ বহুবার আমার বহু লেখায় সেই ব্যাখ্য করেছি, কেন?)। আসুন লেখার শেষে এসে উপরে কেন ফ্যাসিবাদের কথা উল্লেখ করেছি, সেটাই বলি:
ফ্যাসিবাদ কেবল একজন শাসকের ইচ্ছায় জন্ম নেয় না। ফ্যাসিবাদ বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের কোন রাষ্ট্রের সংবিধানের কারণে আসে না। মূলত কখনও কখনও রাষ্ট্রের শাসক না চাইলেও, রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনের চারপাশের প্রভাবশালীদের প্রভাব ও ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণেও রাষ্ট্র ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠে। তারেক জিয়া সেই বলয়েই ঘুরপাক খাচ্ছে বলেই দেখছি।
সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন ক্ষমতাসীন দলের কিছু মানুষ মনে করতে শুরু করেন, রাষ্ট্র মানেই তাঁদের দল, সরকার মানেই তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার এবং বিরোধী পক্ষের কোনো বৈধ অস্তিত্ব নেই। তারেক জিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা সেখানেই। তিনি কি তাঁর চারপাশের রাজনৈতিক চাপ ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতিকে অতিক্রম করতে পারবেন? নাকি একসময় নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে তাঁকেও সেই অসহিষ্ণু রাজনীতির ওপর নির্ভর করতে হবে?
তারেক জিয়াকে স্বরণে রাখা উচিত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সরকার অন্য সরকারের ভুলের বিচার করতে গিয়ে অনেক সময় নিজেই প্রতিহিংসার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে দলীয় প্রভাবের অধীন পড়েছে। এটাই স্বাধীন এই দেশের অভিজ্ঞতা। এই চক্র ভাঙার একটি সুবর্ণ সুযোগ তারেক জিয়ার হাতে কিন্ত এসেছে। তারেক জিয়া যদি কাজটি করতে অক্ষম না হোন, তাহলে লিখে রাখুন, আবার সরকার পরিবর্তন হবে, আবার ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তন হবে, কিন্তু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্র পরিবর্তন হবে না।
লেখার একান্তই শেষে লিখছি, জনাব তারেক জিয়া আপনাকে রাষ্ট্রের শাসক হিসেব স্বরণে রাখতেই হবে যে, “আজ যারা আপনাকে ক্ষমতায় দেখে স্বস্তি পাচ্ছেন এবং সুযোগ বুঝে ফয়দাও লুটছেন, তাঁদের সবাই নিশ্চিত গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে রাজনীতি করেন না এবং দেশের স্বার্থে জীবনবাজি রাখেন না।
ফ্যাসিবাদ (Fascism) কতটা ভয়ংকর, তা বোঝাতে ইতালীয় দার্শনিক ও চিন্তাবিদ উমবের্তো একো (Umberto Eco)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এখানে উল্লেখ করছি,
“ফ্যাসিবাদ কখনো পুরোনো পোশাকে ফিরে আসে না, বরং নতুন নতুন মুখোশ পরে ফিরে আসতে পারে, ফিরে আসতে পারে সবচেয়ে নিরীহ ছদ্মবেশে
জনাব তারেক জিয়া আপনি আপনার আশেপাশের প্রভাবে ফ্যাসিবাদের নতুন পোশাক পরিধান না করুন। সেটাই হবে যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন এই দিশটির জন্য মঙ্গলের।

বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

