ছাত্রলীগের বিভক্তি : মুজিববাদ বনাম বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র

১৯৭২ সালের জুলাই সম্মেলনের পূর্বাপর

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের শুরুতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছিল একটি ঐক্যবদ্ধ সংগঠন। সে সময় ছাত্রলীগের আদর্শিক ভিত্তি ছিল একটিই—মুজিববাদ। সংগঠনের নেতাকর্মীরা সর্বত্র উচ্চারণ করতেন, “বিশ্বে এলো নতুন বাদ—মুজিববাদ, মুজিববাদ।” তখনও প্রকাশ্যে কোনো বিভক্তির চিত্র দেখা যায়নি। কিন্তু অন্তর্গতভাবে আদর্শিক বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। একদিকে ছিল মুজিববাদ, অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারণা। এই মতপার্থক্যই ধীরে ধীরে সাংগঠনিক বিরোধে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়ে পড়ে।

বিভক্তির পর এক অংশের নেতৃত্বে ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, এম. এ. রশীদ, ইসমত কাদির গামাসহ অন্যান্য নেতারা। এই অংশটি “মুজিববাদী ছাত্রলীগ” নামে পরিচিতি লাভ করে। অপরদিকে রব-সিরাজপন্থী অংশের নেতৃত্বে ছিলেন আ স ম আব্দুর রব ও সিরাজুল আলম খান। তাঁদের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র।

দুই পক্ষই ১৯৭২ সালের ২১, ২২ ও ২৩ জুলাই পৃথকভাবে ছাত্রলীগের সম্মেলনের ঘোষণা দেয়। মুজিববাদী ছাত্রলীগের সম্মেলনের স্থান নির্ধারণ করা হয় রমনা রেসকোর্স ময়দানে এবং রব-সিরাজপন্থী ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল পল্টন ময়দানে।

সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর সর্বপ্রথম রব-সিরাজপন্থী ছাত্রলীগের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) তৎকালীন ভিপি জি. এম. মোর্শেদ এবং জিএস শাহ্‌ বোরহান উদ্দিন রোকন। সে সময় এই সমর্থন রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছিল।

সম্মেলনকে ঘিরে দুই পক্ষই ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করে। শেখ কামাল নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ঘুরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মুজিববাদী ছাত্রলীগের সঙ্গে থাকার আহ্বান জানান। আমাদের কয়েকজনকে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে বলেছিলেন—

“তোমরা না থাকলে আমাদের গুণ্ডাপাণ্ডা নিয়ে দল করতে হবে।”

এই কথার মধ্যেই সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, উদ্বেগ এবং সাংগঠনিক সংকটের প্রতিফলন ছিল।

অন্যদিকে রব-সিরাজপন্থী ছাত্রলীগের প্রতি সমর্থন ছিল অনেকটাই নীরব, কিন্তু ছিল বিস্তৃত ও গভীর। ঢাকা ছাড়াও সারা বাংলাদেশের বহু ছাত্রনেতা ও কর্মী প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা না বললেও তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন সম্মেলনের দিন।

আমি তখন জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। সম্মেলনের দিন তৎকালীন ভিপি সাইফুর রহমানের নেতৃত্বে জগন্নাথ কলেজ থেকে একটি বিশাল মিছিল বের হয়। সেই মিছিলের বৃহত্তর অংশ পল্টন ময়দানের সম্মেলনে যোগ দেয় এবং অপেক্ষাকৃত ছোট একটি অংশ রেসকোর্সের সম্মেলনের দিকে যায়। আমিও সেই মিছিলে উপস্থিত ছিলাম এবং পল্টনের সম্মেলনেই অংশগ্রহণ করি।

রমনা রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত মুজিববাদী ছাত্রলীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে পল্টন ময়দানে রব-সিরাজপন্থী ছাত্রলীগের সম্মেলনের উদ্বোধন করেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ স্বপন কুমার চৌধুরীর পিতা। এই দৃশ্য ছিল সে সময়ের ছাত্ররাজনীতির এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেখানে একই সংগঠন একই সময়ে দুটি পৃথক সম্মেলনের মাধ্যমে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেছিল।

এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এই ঘটনাটি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছিলেন ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক।

মুশতাক আমাকে বলেছিলেন, সিরাজুল আলম খান তাঁকে বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠিয়েছিলেন পল্টনের সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে। তিনি বঙ্গবন্ধুর হাতে আমন্ত্রণপত্র তুলে দিলে বঙ্গবন্ধু কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকেন। এরপর মুশতাকের হাতে পাঁচ হাজার টাকা সম্বলিত একটি খাম দিয়ে বলেন—

“তুইও থাকবি না।”

এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত স্নেহ, রাজনৈতিক অবস্থান এবং তৎকালীন সংকটময় পরিস্থিতির একটি মানবিক দিক ফুটে ওঠে।

এখানে রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক সম্পর্কে আরও একটি তথ্য উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে শেখ কামালের সহযোগিতায় ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধু পরিবারের সান্নিধ্যে ছিলেন। ছাত্রলীগের ইতিহাসে তিনিই সম্ভবত একমাত্র ছাত্রনেতা, যিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার চলাকালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

১৯৭২ সালের জুলাইয়ের সেই দ্বৈত সম্মেলন শুধু একটি ছাত্রসংগঠনের বিভক্তির ঘটনা ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক আদর্শ, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তাকে ঘিরে এক গভীর মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের প্রকাশ। সেই দ্বন্দ্বের অভিঘাত পরবর্তী ছাত্ররাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।

(চলবে…)

লেখক : হাবিব বাবুল
সত্তরের দশকের ছাত্রলীগের সংগঠক, বর্তমানে জার্মান প্রবাসী।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.