তবে সোমবার দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে মিছিলের সময় পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করলে সিজেপির নেতারা বিরোধী দলগুলোর আইনপ্রণেতাদের কাছে সরাসরি সমর্থনের আহ্বান জানান। এর পরদিনই বিরোধী নেতারা আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান। বিশেষ করে পুলিশের অভিযানে বহু শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পর।
তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ বিরোধী দলগুলোর জন্য তরুণ ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। একই সঙ্গে এতে সিজেপির আন্দোলনও আরও বিস্তৃত জাতীয় সমর্থন পেতে পারে। এ পর্যন্ত সিজেপি মূলত প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
সোমবার দিল্লিতে কয়েক হাজার নয়, দশ হাজারেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। পুলিশের কঠোর দমনপীড়নের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় সব বিরোধী দল আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। যদিও সিজেপি এ পর্যন্ত জানিয়েছে, তারা নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেবে না।
আন্দোলনের সামনে সুযোগ ও ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলগুলোর সমর্থন আন্দোলনের জন্য যেমন সম্পদ, সাংগঠনিক সহায়তা এবং জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দিতে পারে, তেমনি একটি ঝুঁকিও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মূল দাবি- প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি বৃহত্তর রাজনৈতিক এজেন্ডার আড়ালে চাপা পড়ে যেতে পারে।
তরুণদের ভোটে নজর বিরোধীদের
২০১৪ সালে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসার পর থেকে নরেন্দ্র মোদির কাছে একের পর এক নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে বিরোধীরা। ভারতের ১৪২ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না হওয়ায় এই তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৯ সালের এপ্রিলের মধ্যে হওয়ার কথা। তবে তার আগেই আগামী বছর গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবে নির্বাচন হবে।
‘সরকারবিরোধী জনমত স্পষ্ট’
দিল্লির সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজের অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার বলেন, আমার মনে হয়, অন্তত এই ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত তৈরি হয়েছে- এটা বিরোধীরা বুঝতে পেরেছে। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকলে সরকারের আরও কঠোর দমনপীড়নের সম্ভাবনা থাকবে। তাই বিরোধী দলগুলো এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে এবং আন্দোলনকারীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করবে। এদিকে সরকারপন্থী কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইতিমধ্যে অভিযোগ করেছে, বিরোধী দলগুলো রাজনৈতিক সুবিধা নিতে আন্দোলনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে।
রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার বিক্ষোভ
মঙ্গলবার রাতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন। তারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। পুলিশের হাতে আটক হওয়ার আগে রাহুল গান্ধী বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা মানে ভারতের প্রতিটি পরিবারের ওপর হামলা। প্রধানমন্ত্রী মোদি মনে করেন, কোনো জবাবদিহি বা পরিণতি ছাড়াই তিনি পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু এবার তা হবে না। ভারতের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ উপেক্ষা করা যাবে না। অন্যদিকে, মোদি এখনো প্রকাশ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে মন্ত্রিসভার এক সদস্য জানিয়েছেন, শাসক জোটের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াই বলেন, ভারতের তরুণদের সবচেয়ে বড় সমর্থক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তার মতে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবের আসন্ন নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক হিসাব কষছে।
‘এটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়’
সিজেপির এক মুখপাত্র বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক বিক্ষোভ নয়। এটি সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। বিরোধী দলগুলোর সমর্থনকে আমরা স্বাগত জানাই। তারাই আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছে। তবে আমরা এখানে কোনো রাজনৈতিক কর্মকা- হতে দেব না। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সন্দীপ শাস্ত্রী সতর্ক করে বলেন, যে কোনো আলোচিত আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর যোগ দেয়ার প্রবল প্রলোভন থাকে। কিন্তু তারা বেশি সক্রিয় হয়ে গেলে আন্দোলনের প্রকৃত উদ্যোক্তা ও মূল দাবিগুলোই শেষ পর্যন্ত আড়ালে চলে যেতে পারে।

