১৯৭২ এ ছাত্রলীগের বিভক্তি : নতুন দিগন্তের সূচনা

১৯৭২ সালের জুলাই মাস। স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স তখন মাত্র কয়েক মাস। চারদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ পুনর্গঠনের স্বপ্ন, মানুষের চোখে নতুন রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যাশা। কিন্তু সেই আশার ভেতরেই নীরবে জন্ম নিচ্ছিল রাজনৈতিক মতপার্থক্য, আদর্শিক বিভাজন এবং ক্ষমতার নতুন সমীকরণ। ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো—যে ছাত্রলীগ ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করে, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে বেগবান করে, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পক্ষে জনমত গড়ে তোলে এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার পতাকা হাতে নিয়ে সম্মুখসারিতে দাঁড়িয়েছিল, স্বাধীনতার পর সেই ছাত্রলীগই প্রথম বড় বিভক্তির মুখোমুখি হয়। আজও আমি মনে করি, সেটি ছিল শুধু একটি সংগঠনের ভাঙন নয়; স্বাধীন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বাঁকবদল।

জুলাই মাসের সেই পল্টন সম্মেলনের কথা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। সম্মেলনস্থলে ছিল উৎসবের আবহ, কিন্তু তার অন্তরালে জমে উঠেছিল আদর্শিক বিরোধের উত্তাপ। সম্মেলনে শরীফ নূরুল আম্বিয়া সভাপতি এবং এ.এফ.এম. মাহবুবুল হক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই নির্বাচন ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার আত্মপ্রকাশের ঘোষণা।

সম্মেলন শেষে বিশাল মিছিল পল্টন থেকে শহীদ মিনারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু হাইকোর্ট ও কার্জন হলের সামনে পৌঁছানোর পর মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায় রব-সিরাজপন্থী ছাত্রলীগ এবং মুজিববাদী ছাত্রলীগের কর্মীরা। মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা সংঘর্ষে রূপ নেয়। লাঠির আঘাতে আব্দুর রাজ্জাকের মাথা ফেটে যায়। পরে জানা যায়, জগন্নাথ কলেজের ছাত্রনেতা আব্দুল বারীর আঘাতেই তিনি আহত হয়েছিলেন। সেই সংঘর্ষে আ স ম আব্দুর রবও আঘাতপ্রাপ্ত হন। রক্ত ঝরেছিল, কিন্তু মিছিল থেমে যায়নি। সমস্ত উত্তেজনা ও সংঘর্ষ অতিক্রম করে মিছিল শেষ পর্যন্ত শহীদ মিনারে পৌঁছেছিল।

আজ মনে হয়, শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যাওয়া সেই মিছিল যেন ইতিহাসের এক প্রতীক। বাইরে আমরা একই পথে হাঁটছিলাম, কিন্তু অন্তরে অন্তরে আমাদের পথ ইতোমধ্যেই আলাদা হয়ে গিয়েছিল।

আজও একটি প্রশ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি চাইতেন, তাহলে কি ছাত্রলীগকে ঐক্যবদ্ধ রাখা সম্ভব ছিল না? আমার বিশ্বাস, তাঁর সেই রাজনৈতিক ও নৈতিক ক্ষমতা ছিল। কিন্তু তিনি কেন সেই উদ্যোগ নিলেন না, কিংবা কেন বিভক্তি রোধে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিলেন না, তার উত্তর আজও অজানা। হয়তো ইতিহাস একদিন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবে। কিন্তু আমাদের মতো কর্মীদের কাছে এটি ছিল এক গভীর বেদনার বিষয়।

ছাত্রলীগের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী অংশের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ঢাকার ৪২ নম্বর বলাকা ভবন। বাইরে থেকে ভবনটি ছিল সাধারণ; কিন্তু আমাদের কাছে সেটি ছিল এক রাজনৈতিক বিদ্যাপীঠ। সেখানে প্রতিদিন শুধু সাংগঠনিক বৈঠক হতো না, আদর্শ, দর্শন, সমাজ পরিবর্তন এবং বিপ্লব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলত।

বলাকা ভবনের ছাত্রলীগ অফিসের পাশেই ছিল একটি ছোট্ট দর্জির দোকান , নাম ছিল পাক ফ্যাশন দেশ স্বাধীন হওয়ার পাক বাদ দিয়ে বাংলাদেশ লেখা হয়েছিলো । সেই দোকানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেকেই জানতেন না। এখানেই বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকা সেলাই করা হয়েছিল। দোকানের মালিক মোহাম্মদ হোসেন—আমাদের সবার প্রিয় ‘মামা’—ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক মানুষ , তারা ছিলেন অবাঙালী বিহারী । তাঁর সহকারী ইব্রাহীমও একই রকম আপনজনের মতো ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য তাঁদের দোকানের দরজা সবসময় খোলা থাকত।

দোকানের ভেতরে ছিল সবুজ রঙের রেক্সিনে মোড়ানো একটি সোফা। সেই সোফায় প্রায়ই বসে থাকতেন মার্শাল মনি এবং আফতাব আহমেদ। মার্শাল মনি ছিলেন অবিভক্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। তাঁর সভাপতিত্বেই ১৯৭০ সালে স্বপন কুমার চৌধুরী উত্থাপিত “স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ”-এর প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। সেই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য আমরা তখন পুরোপুরি উপলব্ধি করতে না পারলেও পরবর্তী সময়ে বুঝেছি, এটি ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

আফতাব আহমেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি। তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী, যুক্তিনিষ্ঠ এবং অত্যন্ত সাদাসিধে একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করলে মনে হতো, রাজনীতি শুধু আবেগের বিষয় নয়; এর পেছনে রয়েছে চিন্তা, দর্শন ও গভীর অধ্যয়ন।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ৪২ নম্বর বলাকা ভবন যেন প্রাণ ফিরে পেত। দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাকর্মীদের পদচারণায় পুরো ভবন মুখর হয়ে উঠত। কেউ রাজনৈতিক রিপোর্ট দিচ্ছেন, কেউ ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করছেন, কেউ বা সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক প্রশ্ন নিয়ে তর্কে ব্যস্ত। আমাদের কাছে সেটিই ছিল এক অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিশ্ববিদ্যালয়।

অফিস কক্ষের দেয়ালে টাঙানো ছিল আয়নায় বাঁধানো একটি পোস্টার। তাতে লেখা ছিল কার্ল মার্ক্সের অমর উক্তি—“সর্বহারার শৃঙ্খল ছাড়া হারানোর কিছু নেই।” আজকের প্রজন্ম হয়তো এই একটি বাক্যের আবেগ বুঝতে পারবে না। কিন্তু আমাদের কাছে এটি ছিল এক ধরনের আহ্বান। মনে হতো, ইতিহাস আমাদের ডাকছে।

আমরা তখন মুজিববাদ থেকে মার্ক্সবাদের দিকে অগ্রসর হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। বাস্তবতার চেয়ে আদর্শই ছিল আমাদের কাছে বড়। কে কত দ্রুত ‘ডি-ক্লাস’ হতে পারবে, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত জীবনযাপনের সব চিহ্ন ত্যাগ করে শ্রমজীবী মানুষের জীবনের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে পারবে—এ নিয়েও নীরব প্রতিযোগিতা চলত। আজ ভাবলে মনে হয়, আমাদের মধ্যে আবেগ ছিল অনেক বেশি, বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল অনেক কম।

সন্ধ্যার আড্ডায় প্রায় সবার হাতেই দেখা যেত লেনিনের রাষ্ট্র ও বিপ্লব, কার্ল মার্ক্সের রচনাবলী, এঙ্গেলসের অ্যান্টি-ড্যুরিং কিংবা অন্যান্য মার্ক্সবাদী গ্রন্থ। আমরা মনোযোগ দিয়ে পড়তাম, আলোচনা করতাম, বিতর্ক করতাম। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, দু-একজন ব্যতিক্রম ছাড়া আমরা অধিকাংশই সেই জটিল দর্শনের গভীরতা পুরোপুরি বুঝতাম না। তবুও পড়তাম। কারণ বিশ্বাস করতাম, সমাজ বদলাতে হলে আগে নিজেকে বদলাতে হবে, আর নিজেকে বদলাতে হলে জানতে হবে।

সেই সময় রাজনীতি ছিল আদর্শের রাজনীতি। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা বা ক্ষমতা অর্জনের চিন্তা অন্তত আমাদের প্রজন্মের অধিকাংশের মধ্যে ছিল না। আমরা বিশ্বাস করতাম, শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়া সম্ভব, এবং সেই সংগ্রামে ছাত্রসমাজই হবে অগ্রদূত।

এর প্রমাণও আমরা পেয়েছিলাম। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্রলীগের ধারাবাহিক বিজয় প্রমাণ করেছিল যে যুবসমাজ আমাদের আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি মানুষের যে হতাশা ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল, তার বিকল্প শক্তি হিসেবে অনেক তরুণ এই ছাত্রলীগকে দেখতে শুরু করেছিলেন।

আজ, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, আমাদের অনেক সিদ্ধান্ত হয়তো অপরিণত ছিল, অনেক বিশ্লেষণ ছিল অসম্পূর্ণ। কিন্তু একটি বিষয়ে আমার কোনো সংশয় নেই—আমরা বিশ্বাস থেকে রাজনীতি করেছি, ব্যক্তিস্বার্থ থেকে নয়। ক্ষমতা নয়, আদর্শই ছিল আমাদের চালিকাশক্তি।

আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই—পল্টনের সেই সম্মেলন, হাইকোর্টের সামনে রক্তাক্ত সংঘর্ষ, শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে চলা মিছিল, ৪২ নম্বর বলাকা ভবনের ব্যস্ত সন্ধ্যা, মোহাম্মদ হোসেন মামার দর্জির দোকান, সবুজ রেক্সিনের সোফা, দেয়ালে ঝুলে থাকা মার্ক্সের সেই বিখ্যাত উক্তি এবং হাতে বই নিয়ে ভবিষ্যতের সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর একদল তরুণ।

সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে। মানুষ বদলেছে, রাজনীতি বদলেছে, রাষ্ট্রও বদলেছে। কিন্তু স্মৃতির ভাঁজে সেই সময় আজও অমলিন। ছাত্রলীগের বিভক্তির মধ্য দিয়ে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার ভেতরে যেমন ছিল সম্ভাবনার আলো, তেমনি ছিল ভবিষ্যতের সংঘাতের বীজও। আমরা তখন তা বুঝিনি। ইতিহাস পরে আমাদের সেই শিক্ষা দিয়েছে।

এই লেখা সেই ইতিহাসের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষীর স্মৃতির প্রথম পর্ব। এখানে যে ঘটনাগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো কেবল অতীতের স্মরণ নয়; বরং একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, বিশ্বাস, বিভ্রান্তি এবং আত্মত্যাগের দলিল।

হাবিব বাবুল
৭০ দশকের ছাত্রলীগের সংগঠক 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.