৬০/৭০ দশকের হিপ্পি আন্দোলন : “মেক লাভ নট ওয়ার ”

বিশ শতকের ষাট ও সত্তরের দশক পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিস্ফোরক সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো বিশ্ব তখন আবারও শীতল যুদ্ধ, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, বর্ণবৈষম্য, রাষ্ট্রীয় দমননীতি এবং দ্রুত বিস্তৃত ভোগবাদী পুঁজিবাদের মুখোমুখি। প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জয়গান চললেও মানুষের ভেতরে জমছিল গভীর এক শূন্যতা। সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ, রাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি এবং কৃত্রিম নাগরিক জীবনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে এক নতুন তরুণ প্রজন্ম। সেই প্রজন্মেরই এক বিস্ফোরিত সাংস্কৃতিক প্রকাশ ছিল “হিপ্পি আন্দোলন”।

হিপ্পি আন্দোলনকে কেবল অদ্ভুত পোশাক, লম্বা চুল, মাদকাসক্তি বা উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে বিচার করলে এর গভীর সামাজিক-রাজনৈতিক তাৎপর্য ধরা যায় না। এটি ছিল একই সঙ্গে এক ধরনের হতাশা, এক ধরনের আত্মঅন্বেষণ এবং একই সঙ্গে যুদ্ধ ও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ।

হিপ্পি আন্দোলনের শেকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় “বিট জেনারেশন”-এর কাছে। ১৯৫০-এর দশকে আমেরিকায় জ্যাক কেরুয়াক, অ্যালেন গিনসবার্গ, উইলিয়াম বারোজ, গ্রেগরি কর্সোদের মতো কবি-লেখকরা মূলধারার আমেরিকান জীবনের বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু করেন। তারা ভোগবাদ, কৃত্রিম নৈতিকতা, যুদ্ধবাদী রাষ্ট্রনীতি এবং যান্ত্রিক নাগরিক জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। গিনসবার্গের “Howl” কবিতা কিংবা কেরুয়াকের “On the Road” তরুণদের কাছে এক নতুন মুক্তির ভাষা হয়ে ওঠে।

এই বিট প্রজন্ম থেকেই পরে হিপ্পি সংস্কৃতির জন্ম। তবে হিপ্পিরা শুধু সাহিত্যিক বা শিল্পী ছিল না; তারা ছিল এক বৃহৎ সামাজিক গোষ্ঠী, যারা প্রচলিত জীবনের বাইরে অন্যরকম জীবন খুঁজতে চেয়েছিল। তাদের মূল দর্শন ছিল—অহিংসা, ভালোবাসা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া এবং রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রিত জীবন থেকে মুক্তি।

ষাটের দশকে আমেরিকা যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন লাখ লাখ তরুণ যুদ্ধের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। যুদ্ধের ভয়াবহতা টেলিভিশনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে যাচ্ছিল। মানুষ দেখছিল কীভাবে নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর বোমা পড়ছে, শিশুরা মারা যাচ্ছে। রাষ্ট্রের প্রচারণা আর বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। এই যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সাংস্কৃতিক মুখ হয়ে ওঠে হিপ্পি প্রজন্ম।

“Make Love, Not War”—এই স্লোগান কেবল একটি বাক্য ছিল না; এটি ছিল পুরো একটি প্রজন্মের দর্শন। তারা বিশ্বাস করত, রাষ্ট্র মানুষের নামে যুদ্ধ করে, কিন্তু সাধারণ মানুষ শান্তি চায়। সেই কারণেই ফুলকে তারা প্রতিবাদের প্রতীক বানিয়েছিল। “Flower Power” ধারণাটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ। বন্দুকের সামনে ফুল তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তারা যুদ্ধ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে এক প্রতীকী অবস্থান নিয়েছিল।

তবে হিপ্পি আন্দোলন কেবল যুদ্ধবিরোধী ছিল না; এটি ছিল পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধেও এক নীরব বিদ্রোহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়লেও সমাজ ক্রমশ ভোগবাদী হয়ে উঠছিল। বড় বাড়ি, গাড়ি, চাকরি, কর্পোরেট জীবন—এসবকেই সফলতার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছিল। কিন্তু তরুণদের একাংশ অনুভব করছিল, এই জীবন মানুষকে সুখী করছে না; বরং মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করছে।

হিপ্পিরা তাই ভোগবাদী জীবন প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারা ছোট ছোট কমিউনে বাস করত, যৌথ জীবনযাপনে বিশ্বাস করত, প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চাইত। অনেকে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যায়। তারা মনে করত, পুঁজিবাদ মানুষের সম্পর্ককেও পণ্যে পরিণত করেছে। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, শিল্প—সবকিছুই বাজারের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

এই জায়গা থেকেই হিপ্পি আন্দোলনের মধ্যে এক ধরনের হতাশাও কাজ করছিল। তারা রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারাচ্ছিল। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা তাদের কাছে ভণ্ড ও নিষ্ঠুর মনে হচ্ছিল। ফলে তারা বিকল্প জীবন খুঁজতে শুরু করে—ধ্যান, যোগ, বৌদ্ধধর্ম, ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা, সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতা ইত্যাদির মধ্যে।

ভারত, বিশেষত হিমালয়, বারাণসী, গোয়া এবং কলকাতা তখন হিপ্পিদের অন্যতম গন্তব্য হয়ে ওঠে। তারা পশ্চিমা ভোগবাদী সভ্যতার বাইরে অন্য এক জীবনদর্শন খুঁজতে চেয়েছিল। অনেকেই ভারতীয় দর্শন, বৌদ্ধধর্ম এবং সাধক সংস্কৃতির মধ্যে মুক্তির সম্ভাবনা দেখতে পান। অ্যালেন গিনসবার্গ ও পিটার অরলোভস্কির কলকাতায় দীর্ঘ সময় কাটানো তারই উদাহরণ।

কলকাতা তখন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতার শহর। একদিকে নকশাল আন্দোলন, অন্যদিকে হাংরি সাহিত্য আন্দোলন—এই দুইয়ের মধ্যে শহর যেন বিদ্রোহের এক উন্মুক্ত ক্ষেত্র। গিনসবার্গ কলকাতার সাহিত্যিক, কবি ও তরুণদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়,  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,  মলয় রায়চৌধুরীদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। কলকাতার ফুটপাত, চায়ের দোকান, সস্তা হোটেল—সবই তার কবিতার অংশ হয়ে ওঠে।

হিপ্পিদের জীবনযাত্রা নিয়ে সমাজে প্রচুর বিতর্ক ছিল। মাদক ব্যবহার, অবাধ যৌনতা, সামাজিক নিয়ম ভাঙা—এসব কারণে মূলধারার সমাজ তাদের বিপজ্জনক বলে মনে করত। বাস্তবেও হিপ্পি আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। অনেক সময় আন্দোলনটি রাজনৈতিক সংগঠনের বদলে ব্যক্তিগত মুক্তির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। ফলে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের বদলে এটি অনেক ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক প্রতীকে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

এছাড়া মাদকাসক্তি আন্দোলনের বড় একটি দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক তরুণ মনে করেছিল, সাইকেডেলিক ড্রাগের মাধ্যমে তারা নতুন চেতনার জগতে প্রবেশ করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তা অনেককে ধ্বংসের দিকেও ঠেলে দেয়। ফলে হিপ্পি আন্দোলনের ভেতরকার স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।

তবুও হিপ্পি আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। এই আন্দোলন পশ্চিমা সমাজে ব্যক্তি স্বাধীনতা, যৌন স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, পরিবেশ সচেতনতা, যুদ্ধবিরোধী রাজনীতি এবং বিকল্প সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরবর্তীকালে পরিবেশবাদী আন্দোলন, মানবাধিকার আন্দোলন কিংবা শান্তি আন্দোলনের মধ্যেও হিপ্পি দর্শনের প্রভাব দেখা যায়।

আজকের পৃথিবীতেও হিপ্পি আন্দোলনের প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তি ও ভোগবাদের বিস্তার মানুষের জীবনকে আরও দ্রুত ও প্রতিযোগিতামুখী করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষ আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত হলেও মানসিকভাবে আরও একা হয়ে পড়ছে। যুদ্ধ, বর্ণবাদ, ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ এখনও বিশ্ববাস্তবতার অংশ।

এই প্রেক্ষাপটে হিপ্পি আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সভ্যতার উন্নতি কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; মানুষের মানবিক বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা, স্বাধীনতা, শান্তি ও সহমর্মিতার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমাজ সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে না।

ষাট ও সত্তরের দশকের হিপ্পিরা হয়তো পৃথিবী বদলে দিতে পারেনি, কিন্তু তারা পৃথিবীকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল। তারা দেখিয়েছিল, রাষ্ট্র ও বাজারের তৈরি করা জীবনের বাইরে অন্যরকম জীবন কল্পনা করা সম্ভব। তাদের বিদ্রোহ কখনও হতাশা থেকে জন্ম নিয়েছিল, কখনও যুদ্ধবিরোধী চেতনা থেকে, কখনও পুঁজিবাদী সমাজের কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে ঘৃণা থেকে। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল মানুষকে আরও মানবিক করে তোলার আকাঙ্ক্ষা।

সেই কারণেই হিপ্পি আন্দোলন শুধুমাত্র একটি ফ্যাশন নয়; এটি ছিল এক প্রজন্মের অস্তিত্বসংকট, প্রতিবাদ এবং মুক্তির অনুসন্ধানের ইতিহাস।

হাবিব বাবুল , প্রধান সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.