বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত হতে পারে। এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, ইরানের হামলার পরিধি যতটা ব্যাপক বলে যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে অনেক বেশি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে, যার নাম দেয়া হয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে— সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, ইরাক, ওমান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামো হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নজরদারি সরঞ্জাম, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এবং রাডার স্থাপনাও রয়েছে।
অন্যদিকে পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তবে ইরানও তাদের হামলার কার্যকারিতা তুলে ধরতে চেষ্টা করছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্প্রতি দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন আর নিরাপদ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হামলায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কয়েকটি অত্যাধুনিক ‘টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ (থাড) ব্যাটারিতে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের কয়েকটি ঘাঁটিতে মোতায়েন থাকা এই ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সীমিত সংখ্যক থাড ব্যাটারি রয়েছে এবং এগুলো প্রতিস্থাপন করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। একটি পূর্ণাঙ্গ থাড ব্যবস্থা নির্মাণে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে অবস্থানরত কিছু নজরদারি ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং ক্যাম্প আরিফজানেও হামলার চিহ্ন পাওয়া গেছে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের সঙ্গে কথা বলা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের শুরুতে ইরান ব্যাপক সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেও পরে তারা আরও নির্দিষ্ট ও উচ্চমূল্যের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কৌশল গ্রহণ করে। এতে তুলনামূলক কম অস্ত্র ব্যবহার করেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো সম্ভব হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন স্থাপনাগুলোতে যে ধরনের ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে, তা থেকে বোঝা যায়, তেহরানের পাল্টা হামলা মার্কিন কর্মকর্তাদের আগের স্বীকারোক্তির চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত ও ব্যাপক ছিল।
এ বিষয়ে বিবিসি ভেরিফাইয়ের অনুসন্ধানের পক্ষ থেকে একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু ‘নিরাপত্তা জনিত কারণে’ তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক কেলি গ্রিকো বলেন, প্রথমদিকে ইরানের লক্ষ্য ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা। পরে তারা নির্দিষ্ট কৌশলগত স্থাপনায় হামলা কেন্দ্রীভূত করে, যা তাদের হামলাকে আরও কার্যকর করে তোলে।
এদিকে সংঘাতের আর্থিক প্রভাবও ব্যাপক। পেন্টাগনের একটি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র ব্যয় ইতোমধ্যে ২৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এর বড় অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম মেরামত ও প্রতিস্থাপনে ব্যয় হতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪২টি সামরিক বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এফ-১৫ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং এ-১০ আক্রমণকারী বিমান।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো নতুন করে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

