সাইপ্রাসের রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস কাকোরিসকে হাড্ডাহাড্ডি ভোটে পরাজিত করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের এই সময়ে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল এই কূটনৈতিক সংস্থার নেতৃত্ব দেবেন।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এক গোপন ব্যালট ভোটে খলিলুর রহমান ৯৯টি ভোট পান, যা তার প্রতিদ্বন্দ্বী কাকোরিসের চেয়ে ৮টি বেশি। নির্বাচনে মোট ১৯০টি ভোট পড়েছিল, যার মধ্যে কোনো ভোট বাতিল বা কেউ ভোটদানে বিরত ছিলেন না।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি প্রতি বছর জাতিসংঘের পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে আবর্তিত হয় এবং ৮১তম অধিবেশনের এই দায়িত্ব এসেছে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপের ভাগে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই পদে খলিলুর রহমান এক বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন।
তার এই সভাপতিত্বের মেয়াদটি জাতিসংঘের ক্যালেন্ডারের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে মিলে যাচ্ছে, তা হলো জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি নির্বাচন প্রক্রিয়া, যার মেয়াদ চলতি বছরের শেষে শেষ হতে যাচ্ছে।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হলে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন খলিলুর রহমান। এর আগে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেওয়া এই পেশাদার কূটনীতিক ইতিপূর্বে নিউইয়র্ক এবং জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সমবেত কূটনীতিকদের উদ্দেশে খলিলুর রহমান বলেন, ‘এমন এক সময়ে জাতিসংঘ তার নবম দশকে পদার্পণ করতে যাচ্ছে যখন একাধিক ফ্রন্টে আমাদের এই সংস্থার ওপর মানুষের আস্থা পরীক্ষা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সংস্থার সক্ষমতার ওপর জনগণের বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করতে চাইছে।’
বিদায়ী ইউএনজিএ সভাপতি ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক বহুপক্ষীয়তার প্রতি আস্থা কীভাবে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়ছে তা তুলে ধরে বলেন, জাতিসংঘ এখন কেবল প্রতিকূলতারই সম্মুখীন হচ্ছে না, বরং ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে, যেখানে ঐকমত্য অর্জন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে এবং জাতিসংঘের সনদের প্রতিরক্ষা একটি দৈনন্দিন প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘সাধারণ পরিষদের সভাপতির ভূমিকা এখন আর কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগত বিষয় নয়।’
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত সাধারণ পরিষদ হলো জাতিসংঘের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থা, যেখানে প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট রয়েছে। নিউইয়র্কে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের বার্ষিক সমাবেশই জাতিসংঘের একমাত্র ফোরাম যেখানে ছোট-বড় সব দেশের বিশ্বনেতারা বক্তব্য রাখতে পারেন। যদিও এর প্রস্তাবগুলো সাধারণত আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবুও এই সংস্থাটি নিরাপত্তা থেকে শুরু করে মানবাধিকারসহ প্রধান প্রধান বৈশ্বিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রধান ফোরাম হিসেবে কাজ করে এবং বৈশ্বিক জনমতের প্রতিফলন ঘটায়। এছাড়া নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশে মহাসচিব নিয়োগ, নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচন এবং জাতিসংঘের বাজেট অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও সাধারণ পরিষদ নিয়ে থাকে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর এই নতুন অধিবেশন শুরু হবে।
সূত্র: আলজাজিরা

