ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটাতে এবার চীনের দ্বারস্থ হতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেইজিং সফরকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে চীনের প্রভাব খাটানোর অনুরোধ করতে পারেন তিনি। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যে ধরনের সহযোগিতা আশা করছেন, বেইজিংয়ের কাছ থেকে তা পাওয়া মোটেও সহজ হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শি জিনপিং ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে কিছুটা ভূমিকা রাখলেও তেহরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ করবেন না। ইরানের জন্য চীন কেবল বড় তেল ক্রেতাই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলায় একটি কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি। বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল (চীনের বাড়ির আঙিনা) থেকে ওয়াশিংটনের মনোযোগ কিছুটা বিক্ষিপ্ত থাকায় বেইজিং একে পরোক্ষভাবে সুবিধাজনক মনে করছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবাহিত হয়, যার একটি বিশাল অংশ যায় চীনে। এই পথে অস্থিরতা তৈরি হলে চীনের অর্থনীতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে একদিকে কৌশলগত সুবিধা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি- এই দুই বিপরীত স্বার্থের বেড়াজালে শি জিনপিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানকে চাপে ফেলতে ট্রাম্পের হাতে বড় চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো ‘অস্ত্র’ থাকলেও তা প্রয়োগের ঝুঁকি অনেক। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস দাবি করেছেন, ট্রাম্পের হাতে এখন সব কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, বড় কোনো চীনা ব্যাংকের ওপর ব্যবস্থা নিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
ওবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রেট এরিকসন জানান, ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত চীনের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যদিও মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট দুটি চীনা ব্যাংককে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন, তবে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি ও নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর ভয় কাজ করছে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই।
চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বেইজিং যেকোনো ‘একতরফা নিষেধাজ্ঞার’ বিরোধী। তাদের মতে, অন্য দেশের ওপর দোষ না চাপিয়ে যুদ্ধ আবার শুরু হওয়া ঠেকানোই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিশ্লেষক এডওয়ার্ড ফিশম্যানের মতে, ওয়াশিংটন যদি ব্যাংক খাতে কোনো আঘাত হানে, তবে চীনও বসে থাকবে না। বেইজিংয়ের হাতে থাকা ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজের একচেটিয়া সরবরাহ বন্ধ করে দিলে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রযুক্তি খাত মুখ থুবড়ে পড়বে।
ট্রাম্প মঙ্গলবার সাংবাদিকদের কিছুটা ভিন্ন সুর শুনিয়ে বলেন, ইরানকে বোঝাতে চীনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। কিন্তু পর্দার আড়ালে পরিস্থিতি ভিন্ন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, তেহরানকে চাপে ফেলার ক্ষমতা বেইজিংয়ের হাতেই সবচেয়ে বেশি। কারণ ইরান তার অর্থনীতি সচল রাখতে চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা কুর্ট ক্যাম্পবেল জানান, চীন মধ্যপ্রাচ্যের এই ‘রাজনৈতিক চোরাবালিতে’ খুব বেশি জড়াতে চাইবে না।

