আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিয়ে গভীর সন্দেহ ও সতর্কতা প্রকাশ করেছে বিশ্বমাধ্যম। বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলো এই সাময়িক বিরতিকে স্থায়ী সমাধানের পথ হিসেবে নয়, বরং একটি স্বল্পস্থায়ী “বিরতি” হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এই সময়টুকু কৌশলগত পুনর্গঠন, রাজনৈতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ সংঘাতের প্রস্তুতির জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট মনে করে, যুদ্ধবিরতি কতদিন টিকে থাকবে সেটি মূল প্রশ্ন নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা দৃঢ় অবস্থান নেয়। তাদের মতে, ইরান যুদ্ধ চালিয়ে গেলে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে—এটি জেনেই আলোচনায় বসা উচিত। একই সঙ্গে পত্রিকাটি সতর্ক করে বলেছে, ইরান সময়ক্ষেপণের কৌশল নিতে পারে, যাতে তারা নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারে। তাই তাদের মন্তব্য—“খারাপ কোনো চুক্তির চেয়ে কোনো চুক্তি না হওয়াই ভালো।”
অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মনে করে, ইরান অতীতের মতোই আলোচনার ভান করে সময় নষ্ট করবে। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়া সপ্তাহ থেকে মাসে গড়াতে পারে। তারা আরও মন্তব্য করেছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের অসংগত বক্তব্য ও নীতির কারণে নিজেই একটি জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছেন। তার যুদ্ধসংক্রান্ত বক্তব্য বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং দেশের ভেতর ও বাইরে সমর্থন কমিয়ে দিয়েছে।
ইতালির কোরিয়েরে দেলা সেরা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পত্রিকাটি বলছে, তিনি বারবার নিজেকে বিজয়ী দাবি করলেও বাস্তবে পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সহজ মনে করা এই যুদ্ধ এখন বহু অজানা ও জটিল সমস্যার জন্ম দিয়েছে, যেখান থেকে বের হওয়া তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্পেনের এল পাইস যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও এটিকে “বাস্তব সমাধান থেকে অনেক দূরে” বলে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, হাজারো প্রাণহানি, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামোগত ধ্বংসের পর আবার আলোচনায় ফিরে আসা কোনো সাফল্য নয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য কূটনীতির আহ্বান জানিয়েছে এবং একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ দমননীতি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট যুদ্ধ বিশ্বকে এক ভয়াবহ তেল সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যার জন্য বিশ্ব প্রস্তুত ছিল না। যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হবে ঋণ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপ, যা আগে থেকেই দুর্বল বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই দুই সপ্তাহের সময়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে। চায়না ডেইলি একে “শান্তি নয়, বরং একটি সুযোগ” হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনায় এগোতে না পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। একই সুরে গ্লোবাল টাইমস সতর্ক করেছে যে, উভয় পক্ষই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে—ফলে সামান্য উসকানিতেই আবার সংঘর্ষ শুরু হতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশ্বমাধ্যমের অভিন্ন মূল্যায়ন হলো—এই যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং অনিশ্চিত। এটি হয়তো একটি প্রয়োজনীয় বিরতি, কিন্তু স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা নয়। সামনে যে আলোচনা আসছে, সেটিই নির্ধারণ করবে এই বিরতি ইতিহাসে শান্তির সূচনা হিসেবে থাকবে, নাকি আরও বড় সংঘাতের পূর্বাভাস হিসেবে চিহ্নিত হবে।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

