“জলের শ্যাওল”- অনেক প্রশ্নের উত্তর হয় না আবার অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেই কেননা ঘড়ির কাটা উত্তর দেয়। আবার এমনও প্রশ্ন আছে যার উত্তরের চেয়েও ফল দেখতে হয়। এই যে প্রশ্ন আর উত্তরের কথা লিখছি, সেটা দেশে হয়ে যাওয়া সাম্প্রতিক নির্বাচনকে ঘিরেই লিখছি। মোদ্দা কথা, দেশে একটি নির্বাচিত সরকারের অতীব প্রয়োজন ছিল এবং সেটা অবশেষে চলে আসছে। চলে আসছে লিখলাম কারণ শপথ এখনও হয়নি বলেই। যে নির্বাচন নিয়ে সংশয়, সন্দেহ, দ্বিধা, অবিশ্বাস, অনিশ্চয়তা বা ভয় ছিল অতঃপর নির্বাচনটি হয়ে গেছে। এটা অস্থির দেশটির জনমানুষের জন্য একটি প্রথম স্বস্তির খবর, এটা শতভাগ সঠিক নিশ্চয়ই। পাশাপাশি নির্বাচনকে ঘিরে একটি আশঙ্কার কথা বেশ ছড়িয়ে ছিল, সেটা হলো দেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি জামায়াত চলে আসতে পারে নানান কৌশলে এমন একটাও প্রচার বেশ ছিল বটে। জনমানুষের মনে সেই শঙ্কা ছিল না বললে মনে হয় অসত্য বলা হবে কেননা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে সেই উদহারণ তৈরী হয়েছিল যে।
বরাবরের মতন নির্বাচনের সময় যখন ঘণিয়ে এলো, বহু ভবিষ্যদ্বাণী বাজারে ঘুরে বেড়িয়েছে এবং যা স্বাভাবিকও ছিল নানান কারণে তবে নির্বাচন একটি হবেই, এমন ভবিষ্যদ্বাণী আমিসহ বহুজনেই লিখেছেন। সেটা আপাতত সমাধান হয়েছে। আসুন আপাতত সবাই লম্বা দমে শ্বাস নেই এবং ফেসবুকের নির্বাচন বা মিডিয়ার নির্বাচনকে দূরে ঠেলে দিয়ে ইউনূস সাহেবের কথিও উক্তি শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ (!) নির্বাচন হয়ে গেছে এবং সেখানেই আপাতত অবস্থান করি। এখানে একটি কথা উল্লেখ করে রাখি, বৈদেশ থেকে, বৈদেশিক বহু প্রতিষ্ঠান থেকে নির্বাচন পূর্ব সময়ে বহু বার্তা আসে, ওমুকটা হলে বা তমুক হলে, নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না বা হ্যান- ত্যান। তবে বাস্তবিক সত্য হলো, অবশেষে বৈদেশিক রাষ্ট্রগুলো তাদের আপন স্বার্থেই সকল নির্বাচিত সরকারকেই গ্রহণ করে নেয় এবং এবারও তার বিপরীত কিছুই হবার নয় সেটা ইতিমধ্যেই বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। ওই যে, ইনক্লুসিভ বা সকলের অংশগ্রহণ, ওগুলো আবার প্রশ্ন আকারে উঠবে যখন আবার নির্বাচন আসবে। তার পূর্বে নয়। মোদ্দা কথা সব রাষ্ট্র আগে নিজেদের স্বার্থ দেখে।
এই নির্বাচনের ফলাফল যা এসেছে, সেটা লিখতে গিয়ে আপাতত ভাল নির্বাচন, শুদ্ধ নির্বাচন কিংবা ইউনূস সাহেবের উক্তি শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ (!) নির্বাচন, এগুলোকে ভুলে থাকাটাই শ্রেয় অর্থাৎ আপাতত কল্যাণকর, হিতকর বা রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক, এভাবেই প্রথম ধাপে গ্রহণ হলে স্বস্তির। লক্ষ্য করলে দেখবেন যে, বিএনপি জয়ী হয়েছে এবং স্বাভাবিক কারণেই তাদের মাঝে আনন্দ ও স্বস্তি আছে। যে গোষ্ঠী হেরেছে তাদের কথা এখানে লিখছি না তবে বেশ লক্ষ্যণীয যে, দেশের এক বিরাট জনগোষ্ঠী দেশবিরোধী শক্তি জামাতের ক্ষমতায়ন হবার আগমন যে আটকিয়ে গেছে বা ধূলিসাৎ হয়েছে, সেখানে বেশি খুশি। এই জনগোষ্ঠীর সবাই কিন্ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নয়। বিভিন্ন ক্যাটাগরির আছে। একদল জনগোষ্ঠী হয়তোবা জামায়াত নামক রাজাকারের গোষ্ঠীকে কখনোই ক্ষমতায়ন হতে দেখতে চায় না নানান শঙ্কা থেকেই আবার আরেকদল আছে যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেরতো বটেই পাশাপাশি আবার সেই জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত জনগোষ্ঠী মূলত রাষ্ট্র ধর্ম দ্বারা আবৃত হোক, সেটা কখনোই চায় না এবং তাদের দ্বারা গণতন্ত্রের বিষয়ে বড় বাঁধা আসবে বলেই ধারণা করে এবং সে কারণেই সেই জনগোষ্ঠী মনে করে আপাতত দেশ বাঁচলো।
এই যে দেশ বাঁচলো লিখলাম, এখনও কি সত্যিই দেশ বেঁচে গেছে? উত্তরটি হলো একটি শঙ্কা কেটেছে বটে তবে বহুবিধ শঙ্কা রয়েই গেছে যে। কেন এবং কিভাবে?
স্মরণে রাখুন যে, গণভোট কিন্ত জুলাই সনদের উপর হয়েছে। যেখানে বিএনপির সাক্ষর আছে এবং যেভাবেই হোক গণভোট জয়যুক্ত হয়েছে। তাহলে অর্থ কী দাঁড়ায়? এখানে আরও একটু পরিষ্কার করা প্রয়োজন বোধ করছি। নির্বাচন পূর্ব বলা হয়েছিল যে, এই ভোট সংবিধান সংশোধন পরিষদ ভোট এবং সাংসদ ভোট। বিষয়টি এখানে উল্লেখ করে রাখলাম এবং স্মরণে রাখুন কারণ এখানেই বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বিষয় থাকবে যে। একবার ভাবুন যে, গণভোটটি মূলত কী বিষয়ে ছিল? মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। জুলাই সনদের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? নতুন সংবিধান। সহজভাবে ভাবুন বিষয়টি। নতুন সংবিধান মানে হলো সংবিধানের মূল নীতি থেকে সরে আসা। প্রশ্ন হলো বিএনপি কি সেই পথেই হাঁটবে? সেটা ভবিষ্যতে দেখা যাবে এবং সে কারণেই লিখেছি এখানেই বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রশ্ন উঠবৈ।
এখানে আরও স্পষ্ট একটি বিষয় বলে রাখি যে, যত গণভোট হোক আর পরিষদ গঠন হোক, সংবিধানের মূল নীতিতে হাত বসালেই ৭১, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, দেশের জন্মসূত্র ইত্যাদির প্রশ্ন উঠবেই উঠবে এবং দেশ আবার অশান্তির পথে এগুবে। তাহলে প্রশ্ন উঠবে বিএনপিতো জুলাই সনদে সাক্ষর করেছে এবং গণভোট জয়ী হয়েছে তাহলে বিএনপির করণীয় কী?
প্রথমত বিষয়টি লক্ষ্য করুন (উপরেই লিখেছি), এই নির্বাচন দুইটি বিষয়ের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। একটি সংবিধান সংশোধন পরিষদ অতঃপর ১৮০ দিন পরে একই পরিষদের সবাই সাংসদ। এই ১৮০ দিন নির্বাচনের পূর্বেই বাধ্যতামূলক করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকার।আপাতত থাক সে আলোচনা। তবে ভাল করে লক্ষ্য করার যে বিষয়, তা হলো নতুন সংবিধানের জন্য যা প্রয়োজন হয়, সেটা হতে হয় “গণপরিষদ” তবে এই নির্বাচনে স্পষ্টতই উল্লেখ আছে যে, “সংবিধান সংশোধন পরিষদ”। এই যে সংবিধান সংশোধন পরিষদ এই বিষয়টি বিএনপিকে শতবার মাথায় রেখে এগুতে হবে তবেই বিপদ কম আসবে এবং সংবিধানের মূলনীতিতে কোন সমঝোতার প্রয়োজন আসবে না। তাছাড়াও (যদি সঠিক স্মরণে আসে) সম্ভবত অষ্টম সংশোধনীর সময় দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে সংবিধানের মূলনীতির বিষয়ে একটি রায় ছিল। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের সংবিধানের মূলনীতিতে হাত বসালে আদালতেও বিষয়টি উঠে আসবে যে। তাছাড়াও বিএনপির কিছু সুবিধে আছে যে, নোট অফ ডিসেন্ট দেওয়া আছে। এক কথায় বলছি, এই গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপিকে কঠিন রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রকাশ দেখাতেই হবে এবং সেই সুযোগ আছে শতভাগ এবং বিএনপির আছে দুই তৃতীয়াংশের উপরে জয়।
এবার ছোটো করে দুই তৃতীয়াংশ ভোট ও স্বৈরাচার হবার সম্ভাবনার কথা লিখেই শেষ করব কেননা এমন কথা বাজারে বেশ প্রভাব ফেলছে যে। বিষয়টি বাস্তবিক অর্থে অনেক ব্যাখ্যার প্রয়োজন। তা না হলে চরম ভুল বোঝার সুযোগ থাকবে। কেন এ কথা বলছি? কারণ স্বৈরাচার হবার জন্য একমাত্র দুই তৃতীয়াংশ ভোটটাই কারণ হয়ে উঠে না। বহুবিধ কারণ আছে। আজকের আলোচনা সেই দিকে নিচ্ছি না তবে ভবিষ্যতে কখনও লেখার ইচ্ছে পোষণ করছি। আপাতত শুধুমাত্র এতটুকুই লিখছি, তিন’শ আসনে জয়ী হলেও একটি রাজনৈতিক দলকে জনমানুষের কল্যাণের কথা ভেবে রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। তবেই কোন দল স্বৈরাচার হয়ে উঠে না। বিএনপির উদ্দেশ্য বলবো, অল্পমাত্র ৫৪ বছরের বাংলাদেশের আন্দোলন- প্রতিবাদ- রাজপথ ইত্যাদির ইতিহাস দেখে দেশ পরিচালনার ভাবনা এখন থেকেই মাথায় নিন। এমনকি গত সরকারের শাসন আমলের ভুলগুলো মাথায় নিন তাহলেই সমস্যা কম হবে এবং স্বৈরাচার হয়ে উঠার সম্ভাবনার’ও মৃত্যু হবে। তাছাড়াও এই দেশটির জন্মসূত্রের ইতিহাসের ইতিহাস বারবার মাথায় নিয়েই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করুন। তাহলেই বিএনপির রাজনীতি আরও প্রসিদ্ধ হবে নিশ্চয়ই। শুভ কামনা বিএনপির জন্য তবে সবার আগে দেশের মঙ্গল কামনা থাকবে।

বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

