রক্ত ও জল একসাথে বইতে পারে না

“জলের শ্যাওলা”- উপরে যে বচন টি দেখছেন, ওটা আমার বচন নয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্করের। বার্তাটিতে পরিষ্কার বলা হয়েছে ‘সন্ত্রাসবাদ ও বন্ধুত্ব’ এক সাথে হতে পারে না। আমাদের প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার সম্মানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শোক বার্তা নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এসেছিলেন। লক্ষ্যণীয বিষয় যে, বেগম জিয়ার পুত্র তারেক জিয়ার সাথে দেখা করেছেন, রুদ্ধদার বৈঠক হয়েছে এবং নিজ হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তা তারেক জিয়ার নিকট হস্তান্তর করেছেন। এটা বেশ সম্মানের। তবে যে কোন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা উচ্চ পর্যায়ের, যে কোন উচ্চপর্যায়ের চেয়ারপার্সন, যে কোন উপসর্গ নিয়ে যে দেশেই যান না কেন, খুব স্বাভাবিক কারণেই সেই দেশের সরকার প্রধাণের সাথে সৌজন্যমূলক সাক্ষাত করবেন, এটাই কূটনীতিক নিয়ম নীতিতে সম্মান ও মূল্য প্রদর্শিত হয়ে থাকে।
যেখানে ভারত বাংলাদেশের বর্তমান যে সম্পর্ক চলছে, তেমন সম্পর্কের মাঝে ভারতের মতন বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে এসেছেন তবে দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ইউনূস সাহেবের সাথে কোন সৌজন্যমূলক সাক্ষাত করেননি। বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ (Significant) এবং এই লেখায় স্রেফ উল্লেখ করলাম। আরও একটু উল্লেখ করছি, এস জয়শঙ্কর তাদের দেশের সর্বোচ্চ বিরোধী দেশ পাকিস্তানের স্পিকারের সাথেও কুশল বিনিময় করেছেন তবে আমাদের দেশের সরকার প্রধানের সাথে দেখার সুযোগ বা ইচ্ছা প্রকাশ করেননি অথবা বলাই বাহুল্য যে, ইচ্ছাকৃত সাক্ষাত করেননি বা উপেক্ষা করেছে। অতঃপর আমরা লক্ষ্য করলাম যে, জামায়াতের আমির রয়টার্সের সাথে এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন যে, ভারতের সাথে জামায়াতের গোপন বৈঠক হয়েছিল। বিষয়টি একটি নতুন মাত্রা হিসেবে যোগ হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। জল মনে হচ্ছে বেশ ভালই ঘোলা।
এখানে বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ের বিশ্লেষণের বার্তাটি উল্লেখ করা যায়। বিবিসির বিশ্লেষণে স্পষ্টতই উঠে এসেছে যে, আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানের সাথে সাক্ষাত না করে ভারত মূলত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অতীতের তালিকায় রেখে দিল এবং ভবিষ্যত বাংলাদেশের স্থিতিশীল সরকারের প্রতিই ঈঙ্গিত রেখে গেলো। কূটনীতিক বিশ্লেষণে আরও স্পষ্ট হয় যে, এস জয়শঙ্কর স্রেফ শোক জানাতে এসেছিলেন, এমনটা নিশ্চয়ই নয় এবং এটা বুঝতে কোন রকেট সাইন্স বুঝার প্রয়োজন পড়ে না এবং ধারণা করছি, বিষয়টি দেশের কোন শিশুও সেটা বেশ অনুধাবন করবে। লক্ষ্য করুন, এই ডিসেম্বর মাসেই দুই দেশই দুই দেশের প্রতিনিধিত্বকারীদের সরকারের তরফ থেকে তলব করেছিল। এই বিষয়গুলো কিন্ত কূটনীতিতে অনেক ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়া করে।
এস জয়শঙ্করের শোকবার্তা ও দেশে ফিরে বার্তা বিষয়ে আসার পূর্বে বিএনপি ও বেগম জিয়া ও ভারত নিয়ে কিছু কথা উল্লেখ করতেই হয়। সাল ১২ তে বিরোধীদলের নেতা হিসেবে বেগম জিয়া ভারত সফরে গিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে বেগম জিয়ার ভারতে শেষ সফর ছিল সাল ৯২ তে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। সাল ১২ তে খালেদা জিয়া যখন ভারতে যান, সেই সময়ে ভারতের সরকার প্রধান ছিলেন মনমোহন সিং। বেগম জিয়াকে ভারত লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়েছিল। আমাদের দেশের প্রধান বিরোধীদলের নেতার প্রতি বিষয়টি ছিল অতি সম্মানের। লক্ষ্যণীয যে, সেই সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও ভারত সফর করেছেন কিংবা ভিন্ন সময়ে ভিন্ন কোন রাষ্ট্র প্রধান, প্রতিবার কিন্তু কোন প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী বা সর্বোচ্চ রাজ্যপ্রধানরা আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীদের সংবর্ধনা জানাতেন তবে বিরোধীদলের নেতা হিসেবে বেগম জিয়াকে ১২ সালে খোদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং নিজে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। পিছনের উপসর্গ ছিল ভবিষ্যতের বিএনপির সাথে ভারতের একটি সুন্দর ও সুচিন্তিত সম্পর্কের বিষয়টি মাথায় রেখেই।
লক্ষ্যণীয যে, বিরোধীদলের নেতা হিসাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে সেই সময়ে বেগম জিয়া নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে, সরকারে থাকলে বিএনপি ভারতের বিরুদ্ধে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে সন্ত্রাস করতে দেবে না। এরকম কাজে বাংলাদেশের ভূমি কখনোই কাউকে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। সেই সফরে খালেদা জিয়া আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন, নানামুখী সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা নিরসনে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আমি আন্তরিক ও দৃঢ়তার সঙ্গে একথা দিতে চাই- আমরা সরকারে থাকলে বাংলাদেশের মাটিতে কাউকে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো রকম তৎপরতা করতে দেব না।
কথাগুলো কেন নতুন করে উল্লেখ করছি? সংক্ষেপে যদি বলি, অতঃপর ভারতের সরকারের রাষ্ট্রপতি প্রণববাবুর আগমন ঘটে বাংলাদেশে। সেই সময়ে একটি বন্ধ বা হরতালকে গুরুত্ব দিয়ে বেগম জিয়া প্রণব মুখার্জির সাথে সাক্ষাতে অস্বীকৃতি জানায়। এটা ছিল ১২ সালে বেগম জিয়ার প্রতি ভারতের লাল গালিচার সংবর্ধনা বিপরীতে সরাসরি ভারতের প্রতি অসম্মান। সেই সময়ে বাজারে কথা উঠলো বেগম জিয়া পাকিস্তানের পরামর্শে জামায়াতের প্রভাবে ভারতের রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান জানাতে সক্ষম হননি। কথাটি ঢাকা দিল্লি সর্বত্রই প্রচার হলো এবং নতুন করে বিএনপির সাথে ভারতের যে নতুন সম্পর্ক গড়ার প্রচেষ্টা ভারতের পক্ষ থেকে এসেছিল, তা পুরোপুরিই শেষ হয়ে যায়, বিশ্বাস ভঙ্গ হয় অতঃপর ভারতের সাথে বিএনপির আর তেমন কোন সম্পর্ক গড়ে উঠেনি অবশেষে শোকবার্তার নামে ভবিষ্যতের সরকারের প্রতি এস জয়শঙ্করের আগমন বলা যায় অথবা ভবিষ্যতে একটি স্থিতিশীল সরকারের প্রতি ভারতের নিশ্চিত নির্দিষ্ট বার্তা বলেই অনুমান হয়। প্রশ্ন হলো প্রথাগত কোন কিছু ভারত জয় করলো কিনা? সেটা ভবিষ্যত বলে দেবে।
উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো বহুবিধ মাত্রা বহন করে এস জয়শঙ্করের দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। দুই ডিসেম্বর ভারতের মাদ্রাজের ইন্ডিয়ান অফ টেকনলজির এক অনুষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনারকালে উঠে আসে বাংলাদেশসহ ভারতের প্রতিবেশীদের সম্পর্কের বিষয়। একজন শিক্ষার্থী এক প্রশ্নে এস জয়শঙ্করকে বাংলাদেশের সফরের প্রসঙ্গ টেনে জানতে চান, সাম্প্রতিককালের অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে। এস জয়শঙ্কর বিষয়টি শুধুমাত্র বাংলাদেশের মধ্যেই রাখেননি বরং বৃহত্তর পরিসরে উত্তরটি প্রদান করেছেন। তবে আমাদের প্রাপ্য পানি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছিল, এস জয়শঙ্করের উত্তরের বিশেষ অংশ, “রক্ত ও পানি এক সাথে বইতে পারে না”।
লক্ষ্যণীয বিষয় হচ্ছে, কখন এস জয়শঙ্কর এমন উক্তিটি করলেন? যখন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের জন্য ভারতের মাটিতে চলছে দুই দেশের পানি বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকদের মধ্য বৈঠক। এক দিকে চলছে পানি চুক্তি নবায়নের বৈঠক, ঠিক সেই সময়ে এস জয়শঙ্করের এমন বার্তা, “রক্ত ও পানি এক সাথে বইতে পারে না”। তিনি সেই শিক্ষার্থীর সার্বিক প্রশ্নের উত্তরে ভারতের সকল পশ্চিমা অংশসহ সকল প্রতিবেশীদের নিয়েই আরও যোগ করেছেন, সন্ত্রাসবাদের বিষয়গুলো নিশ্চিত না হওয়া গেলে বা বন্ধ না হলে, পানি বন্টনের চুক্তিগুলোর মতন, মানবিক ও আইনি বিষয়গুলো ভারত স্থগিত রাখবে।
লক্ষ্যণীয যে, এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশে এসেছেন বটে তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানকে উপেক্ষা করে দিয়ে গেছেন এক বার্তা এবং দেশে ফিরে এমন বার্তা নিশ্চয়ই ভবিষ্যতের বাংলাদেশের সরকারের প্রতিই নির্দেশ করে। স্মরণে রাখা ভাল যে, কূটনীতি হলো সাধারণত উচ্চমার্গের সেন্স এবং সেটা বহুল অর্থেই মার্জিত ভাষায় প্রকাশ করা হয়। আরও লক্ষ্যণীয যে, কূটনীতিতে নীরবতা কিন্ত হাজারো শব্দের চেয়েও অনেক শক্তিশালী বিষয়। বাংলাদেশে এসে সরকার প্রধানকে উপেক্ষা বা সাক্ষতের বিষয়ে নীরবতা, বিষয়টি কিন্ত কূটনীতির শক্তিধর নীরবতা অংশ বলেই প্রতিয়মান হয়। এই এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি মূলত একপ্রকার শীতল আচরণ (One Kind of Cold shoulder) বলেই কূটনীতিতে প্রকাশ পায়। যদিও আমাদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, এস জয়শঙ্করের আগমনটি ভিন্নতর দেখার সুযোগ নেই তবে কূটনীতিতে প্রতিটি পদক্ষেপের একটি বিশদ অর্থ থেকেই যায়।
কথা প্রসঙ্গে লিখতেই হয়, গত দুদিন ধরে শুরু হয়েছে ক্রীড়ায় নতুন ক্রিয়া। চলছে নানাবিধ ক্রিয়া। বর্তমানে ভারত বাংলাদেশের শীতল সম্পর্কে ক্রীড়া এখন আবার নতুন মাত্রায় ক্রিয়া শুরু হলো। কোথায় গিয়ে যে এই ক্রিয়া শেষ হবে অথবা আবার নতুন কোন ক্রিয়া যোগ হবে, কেউ জানে না। অত্র অঞ্চলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই ক্রীড়ার ক্রিয়ায় শুরু হয়েছে আবার ধর্মের ক্রিয়া। এ যেন গরম তেলে জলের ছিঁটা। মোদ্দা কথা হলো, বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের সর্বত্রই চলছে যুদ্ধ আর অশান্তি। আমাদের অত্র অঞ্চলের ভৌগলিক কারণেই বাংলাদেশ যেন এখন বিশ্বের কাছে গরম জিলেপি। মচমচে সবাই হজম করার জন্য উদগ্রীব। এমন পরিস্থিতি অত্র অঞ্চলে অত্র অঞ্চলভিত্তিক শান্তি প্রয়োজন যেন বহির্বিশ্ব থেকে অত্র অঞ্চলে কেউ থাবা দিতে না পারে। অত্র অঞ্চলের বৃহৎ শক্তি ভারতকেই বিষয়টি গভীরতার সাথে সবার আগে ভাবা উচিত এবং পড়শীদের বেশি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন তবেই হয়তো একপ্রকার স্থিতিশীলতা অত্র অঞ্চলে আসতে পারে। তবে লেখার শেষে বলবো, ভারতকে শতবার ভাবা উচিত যতটা সহনশীলতার সাথে সম্ভব প্রতিবেশীদের সাথে নিয়ে অত্র অঞ্চলকে শান্ত রাখা যায় কেননা শরীর যত বড়, শীতল হাওয়া বা রোদ বা ঝড়- বৃষ্টি তত বেশিই লাগে কিন্ত। হে ভারত, তোমরাই কিন্ত সেই বৃহৎ যে।
বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.