মাদুরোর ‘ঘরেই’ ছিলেন বিশ্বাসঘাতক, সিআইএকে দিচ্ছিলেন সব তথ্য

ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে ঢুকে সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার স্ত্রীসহ তুলে নিয়ে গেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। দুর্গের মতো সুরক্ষিত বাসভবন থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে বন্দি করার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

এই অভিযান এত সহজে সফল হওয়ার পেছনে ছিল একজন বিশ্বাসঘাতক। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর কাছে নিয়মিত তথ্য পাচার করছিলেন। ফলে অভিযানের আগেই মাদুরোর অবস্থান, চলাফেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পায় যুক্তরাষ্ট্র।

রোববার (৪ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ নামের এই অভিযানে যৌথভাবে অংশ নেয় মার্কিন স্পেশাল ফোর্স, সিআইএ ও এফবিআই। কয়েক মাস ধরেই চলছিল অভিযানের প্রস্তুতি এবং নিয়মিত মহড়া দেওয়া হচ্ছিল।

সূত্র জানায়, মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজাত ইউনিট ডেল্টা ফোর্স মাদুরোর নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের আদলে একটি নকল কাঠামো তৈরি করে সেখানে অনুশীলন চালায়। কীভাবে সুরক্ষিত ও শক্তিশালী ভবনটিতে প্রবেশ করা হবে, তার প্রতিটি ধাপ ছিল পূর্বপরিকল্পিত।

গত আগস্ট থেকেই সিআইএর একটি ছোট দল ভেনেজুয়েলায় সক্রিয় ছিল। মাদুরোর দৈনন্দিন রুটিন, সময়সূচি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করছিল তারা। মাদুরোর ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি গোপনে সিআইএর হয়ে কাজ করছিলেন এবং অভিযান চলাকালে তার অবস্থান নিশ্চিত করতেও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন।

সব প্রস্তুতি শেষে চারদিন আগে অভিযানের অনুমোদন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পরামর্শে ভালো আবহাওয়ার অপেক্ষা করা হয়। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে চূড়ান্ত নির্দেশ দেন ট্রাম্প।

এরপর শুক্রবার গভীর রাতে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এই অভিযানে ২০টি ঘাঁটি থেকে ১৫০টির বেশি আকাশযান অংশ নেয়, যার মধ্যে ছিল এফ-৩৫, এফ-২২ এবং বি-১ বোমারু বিমান।

হামলার আড়ালে ভারী অস্ত্রসহ কারাকাসে প্রবেশ করে মার্কিন স্পেশাল ফোর্স। রাত ১টার দিকে তারা মাদুরোর আবাসিক কমপাউন্ডে পৌঁছালে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে একটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শেষ পর্যন্ত সেনা ও এফবিআই সদস্যরা ‘অত্যন্ত সুরক্ষিত দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত ভবনটিতে ঢুকে পড়েন। ভবনের ভেতরে ঢোকার পর মাদুরো ও তার স্ত্রী আত্মসমর্পণ করেন। অভিযানে কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত হলেও কেউ নিহত হননি।

ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ত্যাগ করার সময় মার্কিন বাহিনী একাধিক আত্মরক্ষামূলক সংঘর্ষে জড়ায়। ভোর ৩টা ২০ মিনিটে হেলিকপ্টারগুলো সমুদ্রের ওপর পৌঁছায় এবং তখনও মাদুরো ও তার স্ত্রী হেলিকপ্টারের ভেতরেই ছিলেন।

প্রায় সাত ঘণ্টা পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট দেন। সেখানে চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরা অবস্থায় ধূসর ট্রাউজার পরিহিত মাদুরোর একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘ইউএসএস আইও জিমা জাহাজে নিকোলাস মাদুরো।’

পুরো অভিযানটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লাইভ পর্যবেক্ষণ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলায় চালানো এই সামরিক অভিযানকে তিনি ‘টেলিভিশন শো’ দেখার মতো ‘চমকপ্রদ’ বলে বর্ণনা করেন।

একই সঙ্গে ট্রাম্প জানান, এখন ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই থাকবে এবং দেশটির বিশাল তেলের ভাণ্ডার ব্যবহার করে তা অন্যান্য দেশে বিক্রি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.