ফ্রাঙ্কফুর্টে গতকাল ছিল এমন এক রবিবার, যা সকাল থেকেই পুরো শহরকে জড়িয়ে রেখেছিল পরম মায়াবী বৃষ্টির পরশে। আকাশে মেঘের ভার, রাস্তায় টুপটাপ ঝরেঝরে বৃষ্টি, আর বাতাসে শীতের দাপট—সব মিলিয়ে দিনের শুরুটা যেন একটু অলস, একটু কুয়াশাচ্ছন্ন। কিন্তু সাহিত্যপ্রেমীদের মনে সে দিনটির গুরুত্ব ছিল ভিন্ন। কারণ রবি সন্ধ্যার পাঠচক্রের বিশেষ আয়োজন বসেছিল ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি প্রাণবন্ত হলে। সেই আয়োজনের আকর্ষণেই দুপুর থেকেই সাহিত্যনুরাগিরা , সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে, ছুটে আসতে শুরু করেন হলমুখী।
বৃষ্টিভেজা পথ, ছাতার ঘনঘটা আর কোটে-মাফলার জড়ানো মানুষদের আগমন দেখে বোঝা যাচ্ছিল—সাহিত্যের প্রতি টান কখনও আবহাওয়ার বাধায় থেমে থাকে না। যারা আসছিলেন, তাদের চোখেমুখে ছিল প্রত্যাশা, উচ্ছ্বাস এবং ভালোবাসায় ভরা ব্যস্ততা। যেন বৃষ্টি নয়, এই সাহিত্য-আড্ডাই দিনের আসল আবহাওয়া।
পাঠচক্রে প্রথমবার—বাচিকশিল্পী ও কবি-লেখক হ্যাপি উদ্দিন
এ দিনের পাঠচক্রের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বাচিকশিল্পী ও কবি-লেখক হ্যাপি উদ্দিন, যিনি প্রথমবারের মতো উপস্থিত হলেন এই সাহিত্য আয়োজনের মঞ্চে। তাঁর উপস্থিতিই দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে একটি আলাদা উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়। পরিচয়ের মুহূর্ত থেকেই তাঁর বিনয়ী আচরণ, মৃদু হাসি এবং কণ্ঠস্বরের নরম দৃঢ়তা সবাইকে আপ্লুত করে। পরে মঞ্চে উঠে তিনি যে আবৃত্তি পরিবেশন করেন—তা ছিল নিখুঁত উচ্চারণ, মাধুর্য এবং আবেগের এক অনবদ্য মিশেল। প্রতিটি শব্দ যেন দর্শকদের হৃদয়ে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
গানের আসর—মুগ্ধতার সুরে ভেসে ওঠে হলঘর
সাহিত্যিক পাঠের পাশাপাশি এদিন ছিল সুরেরও এক বিহ্বলতা। গান পরিবেশন করেন—
রিয়েল আনোয়ার,
আতিকুর রহমান সবুজ,
বাবুল তালুকদার,
আব্দুল মান্নান খান।
প্রতিটি কণ্ঠ ছিল একেকটি আলাদা রঙের অনুভূতি—কখনও বিষণ্ন, কখনও প্রাণচঞ্চল, কখনও ভীষণ আবেগঘন। তাদের গানে বর্ষার সোঁদা গন্ধ যেন আরও গভীর হয়ে উঠছিল। শ্রোতারা পুরোপুরি মগ্ন হয়ে শুনছিলেন, কেউ চোখ বুজে, কেউবা মৃদু দোলায় দুলতে দুলতে।
আবৃত্তির ঝরনাধারা—হল জুড়ে শব্দের অলংকার
গানের পর আবৃত্তির পালা আসে, আর তখন যেন পুরো হলভর্তি মানুষ এক স্নিগ্ধ নীরবতায় ডুবে যায়। আবৃত্তি করেন—
হ্যাপি উদ্দিন,
বিলকিস সুলতানা বকুল,
বাবুল তালুকদার,
সৈয়দ আহসান।
প্রতিটি আবৃত্তিই ছিল আলাদা ছন্দ, ভিন্ন স্বরলহরী। কেউ গভীর ভাবনায় ডুবিয়ে দেয়, কেউ মুগ্ধতার রেশ রেখে যায়। বিলকিস সুলতানা বকুলের কণ্ঠে ছিল অপরূপ কোমলতা, আর সৈয়দ আহসানের কণ্ঠে দৃঢ়তা ও শক্তির অনুরণন। আবৃত্তির এই অংশটি ছিল যেন সাহিত্য সন্ধ্যার সবচেয়ে স্থির অথচ সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলোর একটি।
জার্মান সাহিত্য থেকে অনুবাদ—হাবিব বাবুলের লেখায় এক অনন্য ভ্রমণ
এই দিনের আরেক উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল জার্মান সাহিত্য থেকে হাবিব বাবুলের অনূদিত সাহিত্য ভ্রমণের পাঠ। পাঠ করেন নুরল আকন্দ খোকন। তাঁর কণ্ঠে অনুবাদিত লেখাগুলো শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল—আমরাই যেন জার্মান সাহিত্যের নীরব অরণ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছি, শব্দের স্রোতে ডুবে যাচ্ছি। তিনি পাঠচক্রের শুরুতেই যে স্বাগত বক্তব্য রেখেছিলেন, তাতে যেমন ছিল আন্তরিকতা, তেমনি ছিল আয়োজনের সৌন্দর্য বর্ণনার সূক্ষ্মতা।
বৃষ্টির দিনে ভুনা খিচুরি—স্বাদের উষ্ণতায় হৃদয় ভরা সন্ধ্যা
আয়োজনের শেষে জুটল বৃষ্টি দিনের উপযোগী এক অসাধারণ খাবারের আয়োজন। আতিকুর রহমান সবুজের উদ্যোগে প্রস্তুত করা ভুনা খিচুরি, আর সঙ্গে তমজিদুল ইসলামের রায়তা—এই সংমিশ্রণ যেন ছিল এক বিরল পরিতৃপ্তি। হলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মসলার গন্ধ, গরম খিচুরির ধোয়া, আর মানুষের খেতে খেতে হাসির শব্দ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আপন অনুভূতি তৈরি করেছিল।
তার সঙ্গে ছিল অনবরত চা ও কফি, যা বর্ষার দিনের শীত কাটিয়ে আনন্দকে আরও দীর্ঘ করেছে। অনেকে খেতে খেতে গল্প করেছেন, কেউ ছবি তুলেছেন, কেউ আবার গান আর আবৃত্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। খাবারের টেবিল যেন হয়ে উঠেছিল আরেকটি ক্ষুদ্র পাঠচক্র।
একটি স্মরণীয় দিন
দিনের শেষে যখন সবাই বাড়ি ফিরছিলেন, তখন বাইরে বৃষ্টি হয়তো একটু থেমে থেমে পড়ছিল, কিন্তু মানুষের মন ছিল ভীষণ উজ্জ্বল ও উষ্ণ। এমন একটি দিন, যেখানে সাহিত্য, গান, আবৃত্তি, বন্ধুতা, হাসি, খাবার—সবকিছু মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অসাধারণ স্মৃতি।
এ যেন কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়—বিদেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের হৃদয়ে বাংলা সংস্কৃতির পুনর্চেতনা। স্মৃতি থেকে যাবে দীর্ঘদিন, হয়তো আবার কোনো বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় মনে পড়বে—ফ্রাঙ্কফুর্টের সেই রবি সন্ধ্যার পাঠচক্র, যেখানে মানুষ জড়ো হয়েছিল শুধু ভালোবাসা, কাব্য আর সংগীতের টানে।
ফটো ক্রেডিট : তামজিদুল ইসলাম , ফ্রাঙ্কফুর্ট ।

